মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় মাঝরাতে বিশ্বকাপের উদ্বোধন হবে। এবারের আসরের অধিকাংশ ম্যাচ বাংলাদেশ সময় গভীর রাত ও ভোরবেলায়। রাত জেগে বিশ্বকাপ উপভোগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশের ফুটবলপ্রেমীরা। আর বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই শিল্পনগরী খুলনায় এক অন্যরকম জোয়ার। চার বছর পর পর আসা এই বিশ্বমঞ্চকে ঘিরে খুলনাবাসীর উন্মাদনা ও আবেগ সবসময়ই থাকে তুঙ্গে। প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে পুরো নগরী এখন উৎসবের রঙে রঙিন। আগামী এক মাস ফুটবলপ্রেমীরা বুঁদ হয়ে থাকবেন এক জাদুকরী উন্মাদনায়। ব্যানার, ফেস্টুন আর প্রিয় দলের জার্সিতে ছেঁয়ে গেছে চারপাশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চলছে ভক্তদের চেনা দ্বৈরথ। সব মিলিয়ে ফুটবল রোমাঞ্চের এক চরম বহিঃপ্রকাশ দেখছে বিশ্ব। এবারের বিশ্বকাপে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে এআই। নিজের ছবি দিয়ে প্রিয় দল ও খেলোয়াড়ের সঙ্গে যুক্ত করে ফেসবুক, এক্স (টুইটার) ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করছে ফুটবল প্রেমীরা।
শহরে ছেয়ে গেছে পতাকা : খুলনা মহানগরীর অলিগলি, বহুতল ভবনের ছাদ, বাড়ির বারান্দা থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান-সবখানেই শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। বিশেষ করে প্রিয় দলের বিশাল আকৃতির পতাকা টানানোর একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে সমর্থকদের মধ্যে। মোড়ে মোড়ে পতাকার এই মেলা পুরো শহরকে এক উৎসবমুখর আমেজ এনে দিয়েছে।
নগরীর খালিশপুর বিআইডিসি রোডের বাসিন্দা শাহনেওয়াজ বলেন, চার বছর পর ফের বিশ্ব উন্মাদনায় মেতে উঠেছে সবাই। বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলপ্রেমী। ফুটবল মানেই উন্মাদনা। প্রিয় দলের পতাকা টাঙিয়ে সেই উন্মাদনার নতুন মার্তা যুক্ত করা হয়। আমিও প্রিয় দল আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙিয়েছি বাসার ছাদে।
জার্সি বিক্রির ধুম : খুলনার স্পোর্টস শপ, জলিল মার্কেট এবং বিভিন্ন বিপণি বিতানগুলোতে এখন ফুটবলপ্রেমীদের উপচে পড়া ভিড়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো প্রিয় দলের লোগো আর পছন্দের খেলোয়াড়ের নাম সংবলিত জার্সি কেনার জন্য তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সব বয়সীরা ভিড় করছেন। শুধু বড় শোরুমই নয়, ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানগুলোতেও দেদারসে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন সাইজের জার্সি।
খুলনার খেলাধুলা মার্কেটের সামনের সড়কে ফুটপাতে ভ্যানের উপর বিভিন্ন দেশের জার্সি বিক্রি করছে অনেকেই। সেখানে জার্সি কিনতে আসা মনিরুল ইসলাম বলেন, আর মাত্র কয়েকঘন্টা পরেই বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হচ্ছে। আমার পরিবারের সবাই ব্রাজিলের সমর্থক। ছেলে বায়না ধরেছে জার্সি কিনে দিতে হবে। এ জন্য মার্কেটে এসেছি জার্সি কিনতে। দেখছি, ভালো মান ও দামে পর্তা পরলে কিনব।
হেঁটে হেঁটে পতাকা বিক্রির ধুম : বিশ্বকাপের এই জোয়ারে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য হলো ভ্রাম্যমাণ পতাকা বিক্রেতারা। কাঁধে বা লম্বা বাঁশে বিভিন্ন দেশের ছোট-বড় পতাকা, মাথায় ও হাতে ব্যান্ডের পসরা সাজিয়ে বিক্রেতারা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে হেঁটে পতাকা বিক্রি করছেন। নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড়, শিববাড়ী মোড়, রূপসা ঘাট, কিংবা সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালের মতো জনাকীর্ণ এলাকায় এই মৌসুমী বিক্রেতাদের হাঁকডাক এখন প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে।
নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড়ে রাইসুল নামে এক পতাকা বিক্রিতা বাঁশের মাথায় এবং হাতে বিভিন্ন দেশের জার্সি নিয়ে বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, সারা বছর অন্যান্য মালামাল বিক্রি করি। তবে ক্রিকেট বা ফুটবল বিশ^কাপ আসলে জার্সি, পতাকা ভালো বিক্রি হয়। তবে ফুটবল বিশ্বকাপের সময় বিভিন্ন দলের পতাকা বিক্রি বেশি হয়।
পাড়া-মহল্লায় মিনি স্টেডিয়াম : ভার্চুয়াল দুনিয়ার উন্মাদনা যখন বাস্তবে রূপ নেয়, তখন তার সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজনে। পাড়ার মোড়ে, ক্লাবে বা বড় কোনো মাঠে প্রজেক্টর এবং সাদা পর্দা খাটিয়ে খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। দলমত নির্বিশেষে সবাই একসাথে বসে খেলা দেখে, যা সামাজিক সৌহার্দ্য আরও বাড়িয়ে দেয়। খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রিয় দলের খেলার হলে প্রজেক্টরের মাধ্যমে খেলা দেখার ব্যবস্থা করছেন তারা।
ফুটবলপ্রেমী হাসানুজ্জামান বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নগর ও গ্রামের অলি-গলিতে বড় পর্দায় খেলা দেখতে নগরীর জলিল টাওয়ারে প্রোজেক্টর কেনার জন্য মানুষের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করেছি। এসব প্রজেক্টর কিনে নিয়ে তারা প্রিয় দলের খেলা বড় পর্দায় দেখে উদযাপন করবেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উন্মাদনা : ফুটবল বিশ্বকাপ আসলেই উন্মাদনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান ও পাড়া-মহল্লায় আছড়ে পড়ে। শুরু হওয়ার আগেই তার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফেসবুক, এক্স (টুইটার) কিংবা ইনস্টাগ্রাম যেন একেকটি ভার্চুয়াল স্টেডিয়ামে পরিণত হয়। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে ছবি পোস্ট করা, প্রতিপক্ষ দলকে নিয়ে মজার মজার ট্রল আর যুক্তি-তর্কের ঝড় ওঠে টাইমলাইনে। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দ্বন্দ্বটা ভার্চুয়াল হলেও এর তীব্রতা থাকে রিয়ালিস্টিক। সমর্থকেরা নিজেদের প্রোফাইল ছবিতে প্রিয় দলের ফ্রেম যোগ করেন। কভার ফটোতে শোভা পায় মেসি, রোনালদো ও নেইমারসহ বিভিন্ন তারকা ফুটবলারের ছবি। ম্যাচের সেরা মুহূর্ত, নান্দনিক গোল কিংবা প্রিয় খেলোয়াড়ের ড্রিবলিংয়ের ক্লিপস দিয়ে তৈরি হচ্ছে টিকটক ও ফেসবুক রিলস, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
এদিকে বিশ্বকাপ ফুটবল আসলেই যেন খুলনাজুড়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দলের সমর্থক গোষ্ঠীর প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন বেড়ে যায়। গেল কয়েকদিন খুলনার বিভিন্ন ক্লাব ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এই প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করেছে। গত মঙ্গলবার খুলনার পেশাজীবী সংবাদকর্মীর ব্যানারে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া গত ৭ জুন খালিশপুর মুজগুন্নি মাঠে, ৬ জুন টাউন ক্লাবের আয়োজনে খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে, ৫ জুন আজিজুল মেমোরিয়াল ক্লাবের আয়োজনে দৌলতপুর দেয়ানা স্কুল মাঠ সহ খুলনার বিভিন্ন মাঠে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

