খুলনায় মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সোয়া চার ঘন্টার বৃষ্টিতে ডুবেছে শিল্পনগরী খুলনা। বিশেষ করে নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রায় হাটু সমান পানিতে তলিয়ে যায়। শুধু সড়কেই নয়, বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করে। এতে ভোগান্তিতে পড়ে রিকশা, মাহিন্দ্রা, সিএনজি, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল চালক ও পথচারীরা।
এদিন বিকেল থেকে নগরীর আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। বিকাল ৫ টা ৪৫ মিনিট থেকে শুরু হয় বৃষ্টি, ধীরে ধীরে মুষলধারে রূপ নেয়। চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। বৃষ্টিতে খুলনা পাওয়ার হাউজ মোড়, রূপসা, লবণচরা, খানজাহান আলী রোড, আহসান আহমেদ রোড, গল্লামারী, সোনাডাঙ্গা, শিববাড়ী, নিরালা, টুটপাড়া, মজিদ সরণি, দৌলতপুর ও খালিশপুরের বিভিন্ন সড়ক, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হাটু সমান পানিতে তলিয়ে যায়। বরাবরের মত সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধ সৃষ্টি হয় নগরীর রয়েল মোড় এলাকায়। এইসব এলাকায় হাঁটু সমান পানিতে চলাচল করতে দেখা যায় সাধারণ মানুষকে। জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় গণপরিবহণ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও যাত্রীরা। পথচারীদের কেউ ছাতা হাতে, আবার কাউকে বৃষ্টিতে ভিজেই গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।
স্থানীয়রা জানান, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যত্রযত্র রাস্তা খুড়ে কাজ করাসহ নানা কারণে খুলনায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। খুলনাবাসী এই জলাবদ্ধতা নামক অভিশাপ থেকে মুক্তি চায়।
নগরীর মুড়িপট্টি এলাকার নূর মোহাম্মদ বলেন, সারাদিনই ভ্যাপসা গরমে কেটেছে। গরমের কারণে বাইরে বের হয়ে কাজকর্ম করতে বেশ কষ্ট হয়েছে। আসরের পর থেকে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিরতিহীনভাবে বৃষ্টি নামায় সাহেবের কবরখানার মোড়ে প্রায় ঘণ্টাখানিক অপেক্ষা করতে হয়। পরে হাটু সমান নোঙরা পানি পেরিয়ে অফিসে যেতে হয়েছে।
নগরীর শিববাড়ি এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, গরমের পর বৃষ্টিতে পরিবেশ ঠান্ডা হলেও সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
চাল মিল মালিক সাগর বলেন, বৃষ্টিতে মিলের ভেতরে পানি প্রবেশ করেছে। এতে অনেক ক্ষতি হয়েছে। সঙ্গে দূর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মো. মিজানুর রহমান বলেন, বুধবার বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিট থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত টানা বৃষ্টি হয়। এ সময়ে ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি খুলনায় চলতি বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত।
সুজন খুলনার সম্পাদক এ্যাড. কুদরত-ই-খুদা বলেন, খুলনা নগরীর তিন দিকে নদী। ফলে জলাবদ্ধতা থাকার কথা নয়। নগরীর পানি ড্রেনের ঢাল দিয়ে নদীতে চলে যাওয়ার কথা। অথচ অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ওপেন ড্রেনে ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা বাঁধা, রাস্তা খুড়ে নির্মাণ সামগ্রীতে ড্রেন ভরাট থাকা এবং ড্রেনের প্রশস্ততা কোথাও বেশি আবার কোথাও সরু থাকায় এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে নগরবাসীর দুর্ভোগ থেকেই যাচ্ছে। এটি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের তদারকি করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। অথচ সেটি হচ্ছে না। এই অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে মাস্টারপ্ল্যান করে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা প্রয়োজন। যাতে নগরীর পানি নদীতে নেমে যেতে পারে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, মূলত শহরের পানি রূপসা নদীতে নামতো। সেটি নামছে না। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ড্রেনের কাজ সময়মতো শেষ না করা, রূপসার পাম্প হাউজ বন্ধ, স্লুইচ গেটগুলো অকেজো থাকায় নগরীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া জোয়ারের সময় এক ঘন্টার বৃষ্টিতেই নগরীর রাস্তাগুলো ডুবে যাচ্ছে। ড্রেন আগে যেভাবে ছিল, সেভাবে নেই। ড্রেনগুলোর বেড উঁচু করে ফেলায় বাড়িগুলো নিচু হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তা ও বাড়ির মধ্যে পানি প্রবেশ করছে। মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা তিন মাসে কাজ করার চেষ্টা করছি। রূপসা থেকে আমি নিজেই ঘুরে ঘুরে দেখছি জলাবদ্ধতার অবস্থা। খানজাহান আলী রোড, আহসান আহমেদ রোড, টুটপাড়া ও রয়েল মোড়ে বেশি জলাবদ্ধতা হচ্ছে। আমরা ড্রেনের সব বাঁধগুলো খুলে দেব। বড় ড্রেনগুলো আটকে রেখে কাজ করলে পানি নিস্কাশন হবে না। এ জন্য বর্ষা মৌসুমে কোনো ধরনের ড্রেনের কাজ করতে দেওয়া হবে না।
খুলনা গেজেট/এনএম

