শুক্রবার । ২৬শে জুন, ২০২৬ । ১২ই আষাঢ়, ১৪৩৩

ট্যুরিস্ট ভিসা ফিরল : বদলাচ্ছে কী ঢাকা-দিল্লি সমীকরণ?

নিয়াজ মাহমুদ

দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে অনেক সময় একটি ছোট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা তেমনই একটি ঘটনা। দীর্ঘ বিরতির পর আগামী ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য আবারও পর্যটন ভিসা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকায় নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে রয়েছেন এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি কেবল একটি কনস্যুলার সিদ্ধান্ত, নাকি এর ভেতরে রয়েছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বার্তা?

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ঘনিষ্ঠ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জ্বালানি সংযোগ প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের সম্পর্ক ছিল ইতিবাচক। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কে দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকার সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগে এক ধরনের অস্বস্তি দেখা দেয়। পারস্পরিক সন্দেহ, সীমান্তে উত্তেজনা, কূটনৈতিক শীতলতা এবং রাজনৈতিক বার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে সেই দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়।

এই প্রেক্ষাপটে দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকা আগমন নিছক আরেকজন রাষ্ট্রদূতের নিয়োগ নয়। তিনি পেশাদার কূটনীতিক নন, বরং ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদ। কংগ্রেস, জনতা দল, তৃণমূল কংগ্রেস এবং শেষ পর্যন্ত বিজেপি— ভারতের রাজনীতির নানা পর্যায়ে সক্রিয় থেকেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে তার ধারণা রয়েছে। ফলে তাকে বাংলাদেশে পাঠানো যে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, তা নিয়ে খুব বেশি সন্দেহের অবকাশ নেই।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভারত সরকার তাকে কেবিনেট মন্ত্রীর সমমর্যাদা দিয়েছে। যদিও এটি মূলত প্রোটোকল-সংক্রান্ত মর্যাদা, তবুও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করার উপায় নেই। অতীতে বিশেষ গুরুত্বসম্পন্ন কূটনৈতিক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ দেখা গেছে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা বিরল। দিল্লি স্পষ্টতই বার্তা দিতে চায় যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে তারা উচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এই কারণেই ভিসা চালুর ঘোষণাকে শুধু পর্যটন বা জনসাধারণের সুবিধার বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়বে না।

ভারতের পর্যটন ভিসা বাংলাদেশিদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা কিংবা ভ্রমণ— বিভিন্ন কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি ভারতে যাতায়াত করেন। ভিসা সীমিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেমন বেড়েছিল, তেমনি দুই দেশের জনগণের মধ্যকার স্বাভাবিক যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।

ফলে ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণাকে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচকভাবে দেখবেন। কারণ কূটনৈতিক টানাপড়েনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ নাগরিকরাই হন। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধ থাকলেও জনগণের যোগাযোগ সচল রাখা সব সময়ই সম্পর্ক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

তবে ঘোষণার সময়টিই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন চীন সফরে, তখনই দিল্লির এই পদক্ষেপ কি কাকতালীয়? নাকি এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত হিসাব?

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্য, সংযোগ ব্যবস্থা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কারণে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তির আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে চীন গত এক দশকে বাংলাদেশে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।

ভারত স্বাভাবিকভাবেই চায় না যে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে কোনো একক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ুক। একইভাবে বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে শীতলতা তৈরি হওয়ার ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভারতে উদ্বেগ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

সেই বাস্তবতায় ভিসা চালুর সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘সফট ডিপ্লোমেসি’ বা নরম কূটনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ সম্পর্কের রাজনৈতিক জটিলতা সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে না কমিয়ে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়িয়ে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা।

এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সীমান্তে পুশইন ইস্যু, কূটনৈতিক অসন্তোষ, কিছু বাংলাদেশি কর্মকর্তার ভারত সফর নিয়ে জটিলতা—এসব ঘটনা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছিল। ফলে দিল্লি হয়ত উপলব্ধি করেছে যে সম্পর্ককে পুরোপুরি প্রশাসনিক স্তরে আটকে রাখলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে পাঠানোর সিদ্ধান্তও সেই উপলব্ধিরই প্রতিফলন হতে পারে। কারণ পেশাদার কূটনীতিকরা সাধারণত নীতির বাস্তবায়ন করেন, কিন্তু অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা অনেক সময় রাজনৈতিক সংকেত পাঠাতে এবং অচলাবস্থা ভাঙতে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে এটাও মনে রাখা জরুরি যে, একটি ভিসা সিদ্ধান্ত দিয়ে দুই দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না।

তিস্তা চুক্তি এখনও অমীমাংসিত। সীমান্তে প্রাণহানির প্রশ্ন এখনও বিদ্যমান। বাণিজ্য বৈষম্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রার মতপার্থক্য রয়েছে। এসব জটিল প্রশ্নের সমাধান ছাড়া সম্পর্কের পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে— এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

কিন্তু কূটনীতিতে প্রতীকী পদক্ষেপের গুরুত্বও কম নয়। অনেক সময় বড় সমঝোতার পথ তৈরি হয় ছোট ছোট আস্থাবর্ধক উদ্যোগের মাধ্যমে। ভিসা পুনরায় চালু হওয়া তেমন একটি আস্থার বার্তা হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও এই মুহূর্তে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ।

 




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন