কোটা সংস্কারের এক দফা দাবি ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে খুলনার শিববাড়ি মোড়ে অবরোধ করে বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ১৮ জুলাই সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। অবরোধের কারণে শিববাড়ি মোড়ে খুলনা-যশোর মহাসড়ক, শিববাড়ি থেকে সোনাডাঙ্গা, ময়লাপোতা, রূপসা সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা ‘কোটা দিয়ে বৈষম্য নয়, বৈষম্যমুক্ত দেশ চাই’, ‘আমার সোনার বাংলায় কোটা প্রথার ঠাই নাই’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘দফা এক দাবি এক, কোটা নট কাম ব্যাক‘, ‘শিক্ষার্থীদের কিছু হলে জ¦লবে আগুন ঘরে ঘরে’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’, ‘আঠারোর হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ ইত্যাদি স্লোগানে সড়ক পথ প্রকম্পিত করে তোলে। কমপ্লিট শাটডাউনে খুলনায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে ছিল পুলিশ। শিববাড়ি মোড়ে পুলিশের সাঁজোয়া যান ছিল।
কোটা আন্দোলনকারীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখার আহ্বান : কোটা আন্দোলনকারীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখার আহ্বান জানান খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক। খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে কোটাবিরোধী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনি এ আহ্বান জানান। মানববন্ধনে খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ হারুনুর রশীদ মুঠো ফোনে মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করেন।
আহতদের সহযোগিতা করতে গিয়ে প্রাণ হারান মুগ্ধ : উত্তরায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে আহত হয় অনেকে। সেদিন আহতদের যারা হাসপাতালে পৌঁছে দেন, তাদেরই একজন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এমবিএর শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। সঙ্গে ছিল বন্ধু নাইমুর রহমান আশিক। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ একটি গুলি এসে লাগে মুগ্ধর কপালে। তাৎক্ষণিকভাবে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। কারও বিপদ দেখলেই সহযোগিতার জন্য ছুটে যেতেন তিনি। ব্যতিক্রম হয়নি কোটা সংস্কার আন্দোলনেও। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সংবাদ পেয়ে ১৮ জুলাই দুপুরে বন্ধু আশিককে সঙ্গে নিয়ে ছুটেছিলেন তাদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে। আহতদের হাসপাতালে নেওয়া এবং আন্দোলনরতদের পানি ও খাবার বিতরণ করেন।
সেদিনকার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণনা করেছেন মুগ্ধর বন্ধু নাইমুর রহমান আশিক। তিনি লেখেন, আমরা ইষ্টি কুটুমের মুখোমুখি হয়ে রোড ডিভাইডারের ওপর বসলাম একটু বিশ্রামের জন্য। প্রথমে জাকির এরপর মুগ্ধ আর সব শেষে আমি। হঠাৎ সবাই আমির কমপ্লেক্স আর রাজউক কমার্সিয়ালের দিক থেকে দৌড়ে আসছে। আমরা দেখলাম! কিছুটা ধীর গতিতেই উঠব ভাবলাম। ২-৩ সেকেন্ড পর মুগ্ধর পায়ের ওপরে হাত রেখে বললাম চল দৌড় দেই। আমার বন্ধু শেষবারের মতো আমাকে বলল, চল। জাকির উঠে দৌড় দিল আগে, তারপর আমিও উঠে দৌড় দিলাম ৩-৪ কদম যাওয়ার পর আমার সামনেই জাকিরকে দেখছি দৌড়াচ্ছে। কিন্তু আমার পাশে মুগ্ধ নেই। থেমে গেলাম, পেছন ঘুরে তাকাতেই দেখি আমার বন্ধু ওই বসা অবস্থা থেকেই মাটিতে পড়ছে, চোখ দুটো বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, হাতে সেই অবশিষ্ট বিস্কুট আর পানির বোতলের পলিথিন, কপালে গুলির স্পষ্ট চিহ্ন। আমি চিৎকার করলাম, জাকির মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
আশিক আরও উল্লেখ করেন, সামনের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলাম অসংখ্য পুলিশ অস্ত্র হাতে এদিকে আসছে। আমি দৌড়ে তাঁর কাছে গিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম, পারছিলাম না। পাশেই একজন সাহস করে আসল। দু’জন মিলে কোলে তুললাম মুগ্ধকে। একটু আগেই মুগ্ধ আমার সঙ্গে মানুষকে হাসপাতালে নিচ্ছিল। এখন আমি নিজেই ওকে কোলে তুলে নিয়ে যাচ্ছি। ইমার্জেন্সিতে নিয়ে বেডে রেখে এক কোনায় মাটিতে বসে পড়লাম ওই রুমেই। কিছুক্ষণ পর ঝাপসা চোখে দেখলাম মুগ্ধর আইডি কার্ড হাতে ডাক্তার আমাকে বলছে “আপনার কী হয়?” বললাম আমার ভাই। আমাকে বলল পালস খুঁজে পাচ্ছি না, আপনি একটু রিল্যাক্স হয়ে বাসায় ফোন দেন। আমি স্নিগ্ধকে কল করলাম সঙ্গে সঙ্গে।
মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। তিনি লেখেন, ‘আমার ভাই রাজনীতির বিপক্ষে তবে সে মানুষের অধিকারের পক্ষে ছিল। এমনকি যখন সে গুলিবিদ্ধ হয় তখনো তার হাতে ছিল ওয়াটার কেস। গুলিটি তার কপালে ছোট গর্ত তৈরি করে ডান কানের নিচে বড় গর্ত করে বেরিয়ে যায়। সে আসলেই একটি রতœ ছিল।’ তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে মুগ্ধই মায়ের সবচেয়ে বেশি যতœ নিত। যখন যা প্রয়োজন হত সবকিছু করত। সে প্রায়ই বলত, জীবনটা বড় হওয়া দরকার, লম্বা নয়। হ্যাঁ সে সত্যিই এটা সঠিক প্রমাণ করেছে। মুগ্ধ বিইউপিতে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (এমবিএ) অর্জনের জন্য ভর্তি হয়েছিল চলতি বছরের মার্চে। এর আগে গত বছরই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
খুলনায় মুগ্ধর রুমমেট ছিলেন রবিউল আলম ভূঁইয়া। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, মুগ্ধ ছিল বন্ধুত্ব পরায়ণ। খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশতে পারত। এমন কেউ নেই যে মুগ্ধর কাছে সহযোগিতা চেয়ে পায়নি। সে শুধু চেয়েছিল শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিতে পাশে থাকতে। অথচ ফিরল শুধু তার মরদেহ।
মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর জন্ম ১৯৯৮ সালের ৯ অক্টোবর। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেছেন উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে ২০২৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর গত মার্চে ভর্তি হন বিইউপিতে। তিন ভাইয়ের মধ্যে মুগ্ধ ও স্নিগ্ধ ছিলেন যমজ। বড় ভাই সরকারি চাকরিজীবী। মুগ্ধ নিজের খরচ চালাতেন ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে। কখনও কখনও পরিবারকেও সহযোগিতা করতেন। স্কাউটিংয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এ জন্য ‘ন্যাশনাল সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’ জিতেছিলেন তিনি।
তাঁর বন্ধু মেধা বলেন, “মুগ্ধ আমাদের জন্য ছিল একটা সাহসের নাম। বিশেষ করে খুলনা থেকে ঢাকা যাওয়ার পর আমার কাছে মুগ্ধ ছিল একটা ভরসার নাম। আমি জানতাম যে কোনো প্রয়োজনে শুধু একবার ডাকলেই তাকে পাশে পাব। অথচ আমাদের সেই সাহসকে এভাবে হারাতে হলো। আমরা মুগ্ধর মৃত্যুকে কোনো মুখরোচক গল্পে পরিণত করতে চাই না। দেশের একজন মেধাবী সন্তানের মৃত্যুর বিচার হোক।”
ঢাকায় শহিদ দেবহাটার আসিফ
১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংঘাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন আসিফ হাসান। নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ১৮ জুলাই গ্রামের বাড়ি দেবহাটায় আসার কথা ছিল মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। এর মধ্যে ঢাকাতে কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে সেই আন্দোলনে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। এরপর আর তার আর ফেরা হয়নি বাড়িতে।
খুলনা গেজেট/এএজে

