স্মৃতিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান

খুলনার দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি

কাজী মোতাহার রহমান

মিশরীয় শব্দ গ্রাফিকারের বহুবচন হল গ্রাফিতি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রাফিতি অঙ্কন বেআইনি কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হলেও বিপ্লবীরা যুগে যুগে অন্যায়, অবিচার, অপশাসন, দুর্নীতি তথা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে দেয়ালে উন্মুক্ত ক্যানভাসকে বেছে নেয়। গ্রাফিতি শতভাগ এক শিল্প। এটা বিদ্রোহের প্রতীক এবং সৃজনশীলতার এক চমৎকার নতুন ধরন। সারা বিশ্বে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যম হিসেবে গ্রাফিতি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যখন সমাজে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচারের বিস্তার ঘটেছে, বাক্ স্বাধীনতার দানবীয় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে তখনই গ্রাফিতির মাধ্যমে নীরব বিদ্রোহ প্রদর্শিত হয়েছে।

স্বৈরশাসক জেঃ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান করতে গ্রাফিতি হয়ে উঠেছিল ভিন্নমত প্রকাশের বিকল্প মাধ্যম। নুর হোসেন নিজের বুকে পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে হয়ে উঠেছিল জীবন্ত গ্রাফিতির এক অনন্য কিংবদন্তি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅব্যুত্থানেও বিপ্লবীরা আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশের শৈল্পিক মাধ্যম হিসেবে গ্রাফিতি কেই বেছে নেয়।

এবারের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল নানা ধরনের অনন্য ও অভূতপূর্ব।

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রতিবাদের অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রাফিতি সংযুক্ত হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষার্থীরা গ্রাফিতির ব্যবহার বাড়ায়।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে বিভিন্ন দেয়ালে শিক্ষার্থীরা ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’, ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগান সম্বলিত গ্রাফিতি এঁকে আন্দোলনকারীরা তাদের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে।

শহিদদের রক্তে কেনা দেশটা কারও বাপের না শিরোনামের গ্রাফিতি যেন ছিল একনায়কের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরোধের দীপ্ত শপথ। ‘হামার ব্যাটাক মারলু কানে’, ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমি সাঈদ’, ‘আসছে ফাগুন আমরা হব দ্বিগুণ’, ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইদের ফিরিয়ে দে’ কালজয়ী গ্রাফিতি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ছড়িয়ে দেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

খুলনা নগরীর পিটিআই, জিলা স্কুল, টিএন্ডটি ভবন, স্টেশন রোড, রেলওয়ে স্টেশনের দেওয়াল, কেডিএ এভিনিউ, খুবি, বিএল কলেজ, কুয়েট, সরকারি কমার্স কলেজ, সিটি কলেজ, মুহসীন কলেজ, পাইওনিয়ার কলেজ, জয় বাংলা কলেজ, ইকবালনগর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ, খুলনা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, রেলিগেট, ফুলবাড়ীগেট, সেন্ট জোসেফস্ হাইস্কুল, হাজী মালেক কলেজ, খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয়, আলিয়া কামিল মাদ্রাসা, সরকারি করোনেশন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও খুলনা সিটি ল’ কলেজের দেওয়ালে গ্রাফিতি শোভা পায়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাইসাইকেল যোগে রূপসা থেকে ফুলবাড়ীগেট পর্যন্ত আনুমানিক দু’হাজার গ্রাফিতি ক্যামেরায় বন্দী করেন পূর্ব বানিয়াখামারের বাসিন্দা কবি সৈয়দ আলী হাকীম। তিনি আঞ্চলিক তথ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে ১৭শ’ গ্রাফিতি পাঠান।

খুলনা নগরীতে গ্রাফিতি আঁকায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা হচ্ছেন : গাজী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী দিশা, অর্পন, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাকিব, সোহান, নিবিড়, আসিফ, নিশাত, ইমন, সাদিয়া, অনিকা, রাজিয়া, তৃষা, তুর্ণা, রিচি, স্বর্ণা, রাফিন, ইফতি, আনিকা, তানজিম, রায়হান, আসিফ, সিয়াম, লাবিব, আমিনুল, সামিউল, সামির, আলিফ, মিম, মাহি, নাহিন, হাওয়া, মৌ, নিশি, লাবিবা, ইরফান ফয়সাল, লিওন, জামিল, নিহা, আয়শা, সামিহা, ইসহান, খুলনা কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের ইয়ানা আরাফাত রোজা, নাঈসা, জারা, নাইমা বিনতে কাদির, ফাহিম, অর্ণব মন্ডল শুভ, ইমরান, মোঃ রাকিব খান, তাহসিন, দীপ্ত, তানভীর, মীম, অমিত, ফাইজা, নুসরাত, অর্পিতা, নেহা, রাইতা, সুরাইয়া, সায়মা, সামিরা, রাফা, ফারহান, শামিমা, আরিফুল, সিয়াম, রিফাত, বুশরা, মাহেক, দিশা, সেতু, মৌ, তুবা, তন্নী, হিরামনি, হুজাইমা, তাসফিয়া, অনিকা, মিম, লোবা, মাসুমা, তাসফিয়া, তাহমিদ, নুপুর, আজমি, ছাবরিনা, তামিমা, বিথি, ফাতিমা, নুসরাত, সারা, নাজিফা, আঁখি, ঝুমুর, অর্পা, বহ্নি, জুলি, ফাতিমা, মাবসুমা, ঐশি, ফারিয়া, অনু, নিলুফা, নূর জাহান, অর্পিতা, মৌসুমী, নওরিন, তামান্না, প্রেমা, প্রমি, ইশরা, সামিয়া, সুমু, ফারদিনা, নমিরা, ফুয়াদ, আন্নি, রিমি, জয়, ব্রতী, ইসমাত, ইসরাত, দিবস, সামিহা, নোভা, মিঠু, জান্নাত, রিয়া, তাসফিয়া, তুরাগ, সিয়াদ, তাসনিম, সজিদ, বিজয়, রাদিয়া, মাহিমা, রিচি, সাদমান, সোনালি, সেতু, রোজা, রত্না, নিশান, জিসান, মেহেদী, মাহিন, নূপুর, সৈকত, প্রতীক, গালিব, মারদিয়া, তানহা, ফাহিম, টুকটুকি, নওশীন, নাইমা, তাসফিয়া, রাতুল, ফারহানা, শ্রাবণ, পুষ্প, মাহি, জেবা, মুরসালিনা, এনামুল, মোহনা, সুমাইয়া, ফোজিয়া, ইলমা ও সেঁজুতি, বটিয়াঘাটা সরকারি কলেজের নাহলা ওয়ামিয়া নেওয়াজ সীন, শায়লা ওয়াসি নেওয়াজ নীন, নেভী এ্যাংকরেজ স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী দিনা, সাদ, নাহিয়ান, নবনীতা, অহন, রুকাইয়া, রেদওয়ান, মাহির, আনিসা, সোহান, সাফিন, রনীত, অথৈ, সারা, মীম, সিক্ত, ফাতিন, রাহী, মার্সিয়া, সাইমুন, হৃদি, রাহি, সায়কা, আসনা, আজমাইন, রাজ, সান, আনুশা, মুহিন, আফনাফ, জাহীন, মৌমি, জায়েদ, ইবতেশাম, আফ্রিদি, রুদ্রা, নাফিজ, আলবাব, স্বীকৃতি ও নাজিফ।

রং মশাল : সাংস্কৃতিক সংগঠন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংস্কৃতিক দিকটাকে সমর্থন জানায়। ২০ জুলাই সান্ধ্য আইন জারি হলে এ সংগঠনের পক্ষ থেকে খুলনা নগরীর দেয়ালে গ্রাফিতি শুরু হয়। ৫ আগস্টের পরেও এ কর্মসূচি চলে।

এ রং মশালে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা হচ্ছেন : ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন এন্ড টেকনোলজী সায়েন্সের ওয়াহিদ অনি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সারা আফরোজ আনদী, ঢাকা আর্ট কলেজের অন্তু, হাবিপ্রবি’র মেহেরীন মারিয়া, নর্দানের তাজরিয়ান মনির, গোপালগঞ্জ বশেমুরবিপ্রবি’র ফজলে রাব্বি, জয় বাংলা কলেজের সৈয়দ তানভীর, দৌলতপুর কলেজের হামি, এমএম সিটি কলেজের গাজী মুনতাসির রহমান, সম্প্রীতি আহমেদ দিয়া, সামিহা রহমান, মালিহা রহমান ও সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এম লাবিবুর রহমান।

খুলনার গণগ্রন্থাগারের দেয়ালে বাংলার ঐতিহ্য : খুলনা বিভাগীয় গণগ্রন্থাগার। এ প্রতিষ্ঠানের আঙিনা জুড়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বই মেলা। দুপুর থেকে মধ্যরাত অবধি চলে বই বিকিকিনি। বই মেলার বড় আকর্ষণ গ্রন্থাগারের দেয়ালে বাংলার ঐতিহ্যের গ্রাফিতি। এতে স্থান পায় অবিরাম বাংলার মুখ। এটি রুপ দেন ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় তরুণরা। বাংলার রুপ, রস ও মুখের এ গ্রাফিতির দর্শক সব বয়সী নারী-পুরুষ (খুলনা গেজেট ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৫)।

প্রতি বছরের ন্যায় এ ২০২৫ সালেও বই মেলার আয়োজন হয়। জেলা প্রশাসন এর আয়োজক। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরতে তরুণদের গ্রাফিতির আয়োজন। ২৬ জানুয়ারি থেকে দেয়ালে রঙের তুলি হাতে তুলে নেন ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষার্থী এইচ আর অন্তু, স্থানীয় শিক্ষার্থী নাফিজা, কনিজল, সোহাগ, আরমান ও অনিক হাওলাদার।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন