বাংলাদেশ এক নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে দেশ অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বর্তমানে প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটির কাছাকাছি। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ এবং উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
এখন প্রশ্ন হলো : আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য এবং করণীয় কী?
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের অভাব নয়; বরং দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন, জবাবদিহিতা, পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের ঘাটতি। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, ফ্লাইওভার বা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের সমান সুযোগ পায়।
উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে। আমরা প্রায়ই উন্নয়নকে দৃশ্যমান অবকাঠামোর মাধ্যমে বিচার করি। কিন্তু উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার সাফল্যের মূল ভিত্তি শুধু অবকাঠামো নয়; বরং দক্ষ জনগোষ্ঠী, সঠিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসন। বাংলাদেশেরও এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর সময় এসেছে। উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে রাখতে হবে। একজন দক্ষ শিক্ষক, সৎ চিকিৎসক, দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা, প্রশিক্ষিত নির্মাণশ্রমিক, আধুনিক কৃষক, দক্ষ প্রযুক্তিবিদ কিংবা পরিচ্ছন্নতা কর্মী প্রত্যেকেই জাতীয় উন্নয়নের সমান অংশীদার। উন্নত রাষ্ট্রে কোনো কাজই ছোট নয়, ছোট হতে পারে কেবল দায়িত্বহীনতা।
রাজনৈতিক সচেতনতা শিক্ষার বিকল্প নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সচেতনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, শিক্ষাজীবনের প্রধান উদ্দেশ্য যেন জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতা অর্জন হয়। তরুণদের উচিত হবে এমনভাবে নিজেদের প্রস্তুত করা, যাতে তারা ভবিষ্যতে দক্ষ পেশাজীবী, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের নেতৃত্ব দিতে পারে। যে জাতি জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে থাকে, সেই জাতিই অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেয়।
প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের সমাজে এখনও অনেক মানুষ ব্যক্তিগত পরিচয় বা প্রভাবের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজেন। বাস্তবতার কারণে অনেক সময় এমনটা ঘটে। কিন্তু একটি আধুনিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার পেতে কোনো সুপারিশের প্রয়োজন অনুভব করবেন না। বিদ্যালয় তার দায়িত্ব পালন করবে, হাসপাতাল সেবা দেবে, স্থানীয় সরকার নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করবে, প্রশাসন আইন অনুযায়ী কাজ করবে এবং বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ থাকবে। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই হবে নাগরিক আস্থার কেন্দ্রবিন্দু।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা। বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা যেমন : গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আধুনিক কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা বিস্তার আরও বেশি জরুরি। দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়। আজ দেশের প্রয়োজন আধুনিক নির্মাণশ্রমিক; দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বার; হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা কর্মী; কৃষি প্রযুক্তিবিদ; খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ; পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতের প্রশিক্ষিত জনবল; গার্মেন্টস ও উৎপাদন শিল্পের প্রযুক্তিবিদ; তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষ কর্মী। প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় যদি অন্তত একটি আধুনিক টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা যায়, যা স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তবে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের কর্মসংস্থানের চিত্র বদলে যেতে পারে। তাছাড়াও স্কুল বা কলেজ বা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে যাওয়া ছাত্র/ছাত্রীদেরকে আধুনিক কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা অথবা ছোট বা বড়ো ব্যবসায়িক পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
ঢাকা-কেন্দ্রিক উন্নয়নের বাইরে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের বড় অংশ এখনও রাজধানীকেন্দ্রিক। অথচ দেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কৃষি, কোথাও মৎস্য, কোথাও পর্যটন, কোথাও হস্তশিল্প, কোথাও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। রাজশাহী হতে পারে কৃষি-প্রযুক্তির কেন্দ্র, খুলনা সামুদ্রিক অর্থনীতির এবং সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটনের কেন্দ্র, সিলেট আন্তর্জাতিক পর্যটনের, চট্টগ্রাম লজিস্টিকস ও সমুদ্রবাণিজ্যের, বগুড়া কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবনের এবং বরিশাল জলভিত্তিক পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র। এই বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে রাজধানীর ওপর চাপ কমাবে এবং সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হবে মানুষের আস্থা অর্জন। বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে প্রযুক্তির সফলতা তখনই নিশ্চিত হবে, যখন নাগরিক বিশ্বাস করবেন যে প্রতিটি সেবা স্বচ্ছ, ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক। অনলাইন সেবা এমন হতে হবে, যাতে প্রকৃত সেবাগ্রহীতা সহজে সেবা পান এবং অনিয়ম বা অপব্যবহারের সুযোগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। প্রযুক্তি মানুষের দুর্ভোগ কমানোর জন্য; নতুন দুর্ভোগ সৃষ্টির জন্য নয়।
পর্যটন অবহেলিত অথচ সম্ভাবনাময় খাত। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, পাহাড়, সমুদ্র, বন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্বমানের পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। অথচ এই খাত এখনও সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। নিরাপদ যোগাযোগ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, মানসম্মত আবাসন, প্রশিক্ষিত গাইড এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার মাধ্যমে পর্যটনকে দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতে পরিণত করা সম্ভব।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু আইন করলেই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সংস্কৃতি। একজন নাগরিক যখন মনে করবেন, সরকারি অর্থের অপচয় মানে তাঁর নিজের অর্থের অপচয়, তখনই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতা শুধু প্রশাসনের নয়; পুরো সমাজের মূল্যবোধ হওয়া উচিত।
দেশপ্রেমের নতুন সংজ্ঞা। দেশপ্রেম শুধু আবেগ নয়; এটি একটি দৈনন্দিন দায়িত্ব। নিজের কাজ সততার সঙ্গে করা, সময়মতো কর প্রদান, আইন মেনে চলা, পরিবেশ রক্ষা করা, সরকারি সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে করা, দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এসবই প্রকৃত দেশপ্রেমের অংশ। আজ আমাদের প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় সংস্কৃতি, যেখানে প্রত্যেকে বলবে “আমি দেশের কাছ থেকে কী পেলাম” এর আগে “আমি দেশের জন্য কী করলাম?”
একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়তে দশটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন :
১. সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ।
২. প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
৩. ঢাকা-কেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন।
৪. কৃষি, শিল্প, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
৫. পর্যটনকে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তোলা।
৬. ডিজিটাল সেবায় স্বচ্ছতা ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৭. পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৮. দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি।
৯. নৈতিকতা, সততা ও নাগরিক দায়িত্বকে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করা।
১০. রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
পরিশেষে, বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। আমাদের রয়েছে পরিশ্রমী মানুষ, তরুণ জনসংখ্যা, উর্বর ভূমি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি করার ক্ষমতা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। এখন প্রয়োজন একটি নতুন জাতীয় চেতনা যেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে; প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতার, নেতৃত্ব হবে সততার এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যাবে দেশের প্রতিটি গ্রাম, শহর ও মানুষের কাছে। বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার কাজ কোনো একক সরকার, কোনো রাজনৈতিক দল বা কোনো একজন নেতার পক্ষে সম্ভব নয়। এটি সম্ভব তখনই, যখন রাষ্ট্র, সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি সাধারণ নাগরিক সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবেন। আমরা যদি জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারি, দক্ষতাকে মর্যাদা দিই, সুশাসনকে প্রতিষ্ঠিত করি এবং প্রত্যেকে নিজের কাজকে ইবাদত ও দেশসেবার অংশ হিসেবে বিবেচনা করি, তবে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল একটি স্লোগান হয়ে থাকবে না; সেটি একদিন বাস্তবে রূপ নেবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক, বায়োটেকনোলজী এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
খুলনা গেজেট/এএজে

