শিশু-কিশোরের আত্মহত্যার প্রবণতা ও প্রতিকার

কামরুল ইসলাম

সম্প্রতি ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কয়েকটি শিশু-কিশোরের আত্মহত্যা আমাকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে। আমি তাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছি এবং এইসব আত্মহত্যার পিছনের কথা জানতে চেষ্টা করেছি। প্রতিটি ঘটনার পিছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ জানতে পেরেছি। সেইসব কারণসমূহ আলাদা আলাদাভাবে বর্ণনা করে সন্তানহারা পরিবারের কষ্ট না বাড়িয়ে আমার পর্যবেক্ষণের কিছু তথ্য এখানে উপস্থাপন করলাম। আমার ক্ষুদ্র মতামত ও পরামর্শ পড়ে যদি একটি পরিবার ও সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি সামান্য উপকৃত হয়, তবেই আমি সার্থক। তার আগে আত্মহত্যার মাধ্যমে সদ্য অকালে ঝরে যাওয়া আসমানী (১০), স্বপ্নীল (১০), পূজা (১৫), অনামিকা (১৮), ও হৃদয় (১৮) দের আত্মার শান্তি কামনা করি।

শিশু-কিশোরদের আত্মহত্যা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জটিল বিষয়। এটি সাধারণত একটি মাত্র কারণের জন্য ঘটে না; বরং দীর্ঘদিনের মানসিক কষ্ট, পারিবারিক সমস্যা, বুলিং, অবহেলা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা অন্য নানা চাপ একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই দোষারোপের পরিবর্তে বোঝাপড়া, সহমর্মিতা এবং সময়মতো সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

আমার মতে, এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—

১. শিশুর কথা মন দিয়ে শুনতে হবে

অনেক শিশু তাদের কষ্ট সরাসরি বলতে পারে না। আচরণ, পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা অতিরিক্ত রাগের মাধ্যমে তারা সংকেত দিতে পারে। এসব পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

২. ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে

শিশুরা শুধু ভালো ফল নয়, নিঃশর্ত ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা চায়। বারবার তুলনা, অপমান বা অতিরিক্ত চাপ তাদের আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ করতে হবে

বুলিং, অপমান এবং সহিংসতা রোধে বিদ্যালয়ের স্পষ্ট নীতি থাকা উচিত। শিক্ষকরা যেন এমন পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে কথা বলতে পারে।

৪. মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে

মানসিক কষ্টও শারীরিক অসুস্থতার মতোই গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা দরকার।

৫. ডিজিটাল জীবনের প্রতি নজর দিতে হবে

সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ এবং অনুপযুক্ত অনলাইন কনটেন্ট শিশুদের মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত নজরদারি ও খোলামেলা আলোচনা বজায় রাখা।

৬. পরিবার, স্কুল ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে

একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে শুধু পরিবার বা শুধু বিদ্যালয় যথেষ্ট নয়। তিন পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টাই সবচেয়ে কার্যকর।

৭. পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো– মায়ের আচরণ, মায়ের দৈনন্দিন জীবন, মায়ের চলাফেরা। কোন কারণে মায়ের উপর শিশুর আস্থা হারিয়ে গেলে তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

উপসংহার : প্রতিটি শিশুকে এমন অনুভূতি দিতে হবে যে সে মূল্যবান, তার কথা শোনার মানুষ আছে এবং কঠিন সময়ে সে একা নয়। যত্নশীল পরিবার, সহানুভূতিশীল শিক্ষক, নিরাপদ বিদ্যালয় এবং সচেতন সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে শিশুদের মানসিক সুস্থতা রক্ষা করা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

যদি কোনো শিশুর মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর হতাশা, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বা জীবন নিয়ে নিরাশার মতো লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্য, বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। সময়মতো সহায়তা অনেক সংকট প্রতিরোধ করতে পারে।

আন্দুলিয়া
২০ জুলাই, ২০২৬

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন