স্মৃতিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান

শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন

কাজী মোতাহার রহমান

সরকারি চাকরিতে ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’ নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে ঢাবি’র রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নেন কোটা আন্দোলনকারীরা। ১৫ জুলাই দুপুর সোয়া ১২টা নাগাদ তারা অবস্থান নেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মোঃ মাহিন বলেন, আজকে আমাদের আন্দোলন শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। সেই সঙ্গে অতি দ্রুত সংসদে আইন তুলে কোটা সংস্কার পাস করতে হবে। কোটা সংস্কার ও শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে আয়োজিত সমাবেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়। এসময় তারা শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রত্যাহারের স্লোগান দিতে থাকে। শিক্ষার্থীদের ‘কোটা না মেধা, মেধা, মেধা’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘এসো ভাই এসো বোন, গড়ে তুলি আন্দোলন’, ‘ঢাবি ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘শিক্ষার্থীরা ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘তুমি নও আমিও নই, রাজাকার রাজাকার’, ‘কে রাজাকার কে রাজাকার, তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’ সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে শোনা যায়।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হল থেকে বের হয়ে আসেন। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাপ ছড়ান তারা। ‘রাজাকারের নাতিরা সব পাবে, মুক্তিযোদ্ধার নাতি পুতিরা কিছুই পাবে না’ শেখ হাসিনার চীন সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কোটাবিরোধী সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এ অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল গেটে আটকে রাখা শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন আসিফ মাহমুদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তপ্ত এ পরিস্থিতির ঢেউ লাগে দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা হল থেকে বের হয়ে অবস্থান নেন রাজপথে। কোটাবিরোধী বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বিভিন্ন ক্যাম্পাস। চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের এক দফা দাবি হল, সব গ্রেডে সব ধরনের অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে নূন্যতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে কোটা পদ্ধতিতে সংশোধন আনা।

শিক্ষার্থীদের ওপর হিংস্র হামলার অভিযোগ ফখরুলের : শিক্ষার্থীদের রাজপথের উত্তাল আন্দোলনে সরকার বেসামাল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১৫ জুলাই দেওয়া বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। এতে বলা হয়, বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থা সংস্কারের যৌক্তিক দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ওপর সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সশস্ত্র হামলা চালিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদেরকে নৃশংসভাবে আহত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান বিএনপি মহাসচিব।

তিনি বলেন, ক্ষমতা হারানোর ভয়েই এ হিংস্র হামলা। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিকে রক্তাক্ত পন্থায় দমনের যে দৃশ্য দেশবাসী অবলোকন করল, তা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আরেকটি হিংস্র অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে সংযোজিত হবে। এদের হাতে জনগণ, রাষ্ট্র, সমাজ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব কখনও নিরাপদ নয়। আজ পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা যৌথভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৈশাচিক হামলা চালিয়ে অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে আহত করে। কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়-স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের রাজপথের উত্তাল আন্দোলনে সরকার বেসামাল হয়ে পড়েছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, কোটা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ডামি আওয়ামী সরকার ক্রমাগত প্রতারণা করে যাচ্ছে। কারণ জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য।

বিএফইউজের উদ্বেগ : কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে। ১৫ জুলাই বিকেলে সংবাদ মাধ্যমে ইউনিয়নের পাঠানো সংবাদ বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। যৌথভাবে বিবৃতি পাঠান বিএফইউজের সভাপতি ওমর ফারুক ও মহাসচিব দীপ আজাদ।

বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের সচেতন সবমহলের মতো সাংবাদিক সমাজও মনে করে, কোটা পদ্ধতির একটি যৌক্তিক সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। এ দাবিতে যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন তাদের সঙ্গে সাংবাদিক সমাজের ভিন্নমত নেই। সাংবাদিক হিসেবে গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ শেষে আমাদের মন্তব্য হচ্ছে যে, কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার করার দাবিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ যৌক্তিক বিষয়টিকে পূর্ণতা দিতে আন্দোলনকারী, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ওবায়দুল কাদেরের হুমকি : আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, “১৪ জুলাই ক্যাম্পাসে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ হয়েছে, তার জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগ প্রস্তুত।” ১৫ জুলাই সোমবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, “ছাত্রদের বিষয় ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু তারা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখিয়েছে। আমরা দেখি, কারা রাজনৈতিকভাবে প্রকাশ্যে আসে। আমরাও মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।”

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, “কোটা সংস্কারের চলমান আন্দোলন নিয়ে আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা একই মতামত ব্যক্ত করেছেন। যে বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন, সে বিষয় নিয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলা সমীচীন নয়।”

ওবায়দুল কাদের বলেন, “১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কাল রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় আলবদর-রাজাকারদের সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বিচার হত্যা করে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কীভাবে নিজেদের রাজাকার বলে স্লোগান দেয়?”

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মোবাইলে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ : ছাত্র বিক্ষোভের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন এলাকায় রবিবার মধ্য রাতে ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে ওই এলাকায় মোবাইলে ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যাচ্ছিল না। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের অবমাননা করা হয় উল্লেখ করে ১৪ জুলাই রাত ১০টার পর বিভিন্ন হলে মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাঁরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে এসে বিক্ষোভ করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মধ্যরাত থেকে তাঁরা মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন না। অনেকে মুঠোফোনে সরাসরি কলও দিতে পারছেন না।

ছাত্রলীগের তিন নেতার পদত্যাগ : কোটা সংস্কার আন্দোলনে সমর্থন এবং আন্দোলনকারীদের অবমাননা প্রতিবাদে ছাত্রলীগ থেকে তিন নেতা পদত্যাগ করেন। তারা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ শাখার গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন সম্পাদক মাছুম শাহরিয়ার, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট শাখার মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা বিষয়ক উপ-সম্পাদক রাতুল আহামেদ শ্রাবণ এবং আইন অনুষদ শাখার গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক আশিকুর রহমান জিম। তাঁরা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেয়।

মধ্য রাতে ১২ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ জুলাই মধ্যরাতে বিক্ষোভ করেন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের অবমাননা করা হয় দাবি করে এ বিক্ষোভ হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শের-এ-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা নানা স্লোগানে মুখর করে তোলে ক্যাম্পাস।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের পাঁচ হলের তালা ভেঙে ছাত্রীরা এবং ছেলেদের সব হল থেকে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হন। রাত ১২টার দিকে সেখানে তারা সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদী সমাবেশ করেন। এরপর পরিস্থিতি শান্ত হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি চাই না। শান্তিপূর্ণ অবস্থা চাই। আমরা সুশৃঙ্খলভাবে নিজেদের হলে যাব।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন