মঙ্গলবার । ২৩শে জুন, ২০২৬ । ৯ই আষাঢ়, ১৪৩৩

শিশুশ্রম শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক সংকটও

আল শাহারিয়া

সকালের মিষ্টি রোদে একদল শিশু যখন হাসিমুখে স্কুলে যায়, ঠিক তখনই অন্য একটি শিশু হয়ত কোনো চায়ের দোকানে ধোঁয়ায় চোখ কচলাচ্ছে। এই দৃশ্য আমাদের ভীষণ চেনা। এক কাপ চা হাতে নিয়ে আমরা হয়ত অর্থনীতি বা রাজনীতি নিয়ে তুমুল আড্ডা জুড়ে দিই। অথচ যে ছোট হাতটি চা এগিয়ে দিল, তার দিকে নজর দেওয়ার সময় আমাদের নেই। আমরা ধরে নিয়েছি দারিদ্র্যের কারণেই শিশুটি কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই সহজ সমীকরণটি আমাদের নাগরিক বিবেককে চমৎকারভাবে শান্ত রাখে। কিন্তু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে অনুধাবন করা যায়, শিশুশ্রম কেবল দারিদ্র্যের উপজাত নয়। এটি আসলে আমাদের সামগ্রিক সমাজের এক ভয়াবহ নৈতিক স্খলন।

দারিদ্র্য নিঃসন্দেহে শিশুশ্রমের একটি বড় কারণ। অভাবের তাড়নায় অনেক বাবা মা সন্তানদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হন। কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতাকে পুঁজি করে যারা ফায়দা লুটছেন, তাদের কথা কী আমরা ভেবেছি? প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের বদলে শিশুকে কাজে রাখলে মালিকপক্ষের অনেক সুবিধা থাকে। তাদের খুব সামান্য মজুরি দিলেই চলে এবং তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে জানে না। সস্তা শ্রমের প্রতি সমাজের এক শ্রেণির মানুষের এই দুর্নিবার লোভকে কোনোভাবেই শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা বলা চলে না। মানুষের চরম অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পকেট ভারী করার প্রবণতা আমাদের মানবিকতার ভিত্তিমূল ধরে টান দেয়।

লেদ মেশিনের তীক্ষè শব্দ কিংবা মোটর গ্যারেজের কালচে গ্রিজের মধ্যে অনেক শিশু তাদের সোনালি দিনগুলো পার করে দিচ্ছে। একজন মালিক যখন নিজের সন্তানকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্কুলে পাঠান আর ঠিক একই বয়সের অন্য একটি শিশুকে তার কারখানার বিষাক্ত পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করেন, তখন সেখানে অর্থনীতির চেয়ে নৈতিকতার মৃত্যুটিই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমাদের নিজেদের দায়ও কিন্তু কম নয়। শহরের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ঘরের কাজের জন্য গ্রাম থেকে ছোট ছোট মেয়েদের নিয়ে আসেন। নিজেদের আদরের সন্তানের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে এমন একজনকে, যার নিজেরই এখন মায়ের উষ্ণ কোল প্রয়োজন। অবচেতনভাবেই আমরা মেনে নিয়েছি যে কিছু মানুষের জন্মই হয়েছে শুধু অন্যের সেবা করার জন্য। এই প্রবল বৈষম্যমূলক চিন্তা আমাদের নৈতিক দেউলিয়াত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া কিংবা ভারী বোঝা টানার কারণে এই শিশুরা খুব অল্প বয়সেই নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাদের কাছ থেকে শৈশবের সরলতা নির্মমভাবে কেড়ে নেয়। আকাশপাতাল বৈষম্য তাদের ভেতরে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও তীব্র হতাশার জন্ম দেয়। কখনো কখনো এই ক্ষোভ তাদের অপরাধ জগতের দিকে ঠেলে দেয়। আমরা তখন সমাজপতি সেজে তাদের বখাটে বলে গালি দিই। কিন্তু একবারও ভেবে দেখি না যে এই সমাজই তাদের অপরাধী হওয়ার বীজ বপন করে দিয়েছিল।

শিশুশ্রম বন্ধ করার জন্য দেশে আইনের ছড়াছড়ি। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদে আমরা অনেক আগেই স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু আইন প্রয়োগের জন্য যে অটুট নৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তার চরম অভাব রয়েছে আমাদের। শিশুশ্রমকে যখন সামাজিকভাবে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে দেওয়া হয়, তখন শুধু পুলিশ বা প্রশাসন দিয়ে তা বন্ধ করা সম্ভব হয় না। প্রাপ্তবয়স্কদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা গেলে কোনো অভিভাবক সন্তানকে শ্রমে পাঠাবেন না। একটি সমাজ ঠিক কতটা সভ্য তা নির্ভর করে তারা তাদের সবচেয়ে দুর্বল অংশকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে তার ওপর। শিশুশ্রমের অবসান কোনো দয়া নয়, এটি প্রতিটি শিশুর জন্মগত অধিকার। চায়ের দোকানে বা বাসাবাড়িতে কাজ করা শিশুটির চোখের দিকে তাকিয়ে আমাদের ভাবতে শিখতে হবে, এই জায়গায় আমার নিজের সন্তান থাকলে আমি কী করতাম। এই প্রশ্ন যেদিন আমাদের বিবেককে তীব্রভাবে দংশন করবে, সেদিনই আমরা শিশুশ্রমের মতো আদিম কলঙ্ক থেকে সত্যিকারের মুক্তি পাব।

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন