আমি কোনো শিক্ষাবিদ নই, বা কোনো শিশু মনোবিজ্ঞানী নই। তবে ছয় মাস যাবৎ সোনামুখ স্মার্ট একাডেমি নামে একটি স্কুল পরিচালনা করে আসছি। সেই সুবাদে আমি প্রায় দেড়শো শিশুর মনোজগতে প্রবেশ করেছি, তাদের দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে ওতপ্রোত ভাবে মিশেছি, অভিভাবকদের সাথে প্রায়শই কথা বলি। সবকিছু মিলে আমার বিশেষ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমার লব্ধ অভিজ্ঞতা এখানে শেয়ার করছি। হয়ত অনেকে মনে করতে পারেন, এসব কথা সবাই জানে। তবুও সবাইকে আবার মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য লিখছি।
বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর সবখানেই অসংখ্য মেধাবী শিশুর জন্ম হচ্ছে। তারা প্রশ্ন করতে জানে, নতুন কিছু ভাবতে জানে, স্বপ্ন দেখতে জানে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল সম্ভাবনার একটি বড় অংশ সঠিক পরিচর্যা, দিকনির্দেশনা ও সহায়ক পরিবেশের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। যে শিশুটি একদিন বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, গবেষক, উদ্যোক্তা কিংবা দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হতে পারত, সে অনেক সময় অকালেই প্রতিযোগিতার চাপ, অবহেলা অথবা ভুল শিক্ষাব্যবস্থার শিকার হয়ে নিজের সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলে।
এ জন্য শুধু একটি পক্ষকে দায়ী করলে চলবে না। সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং অভিভাবক সবারই কিছু না কিছু দায় রয়েছে।
প্রথমত, আমাদের সমাজ এখনও পরীক্ষার নম্বরকেই মেধার একমাত্র মানদ- হিসেবে বিবেচনা করে। একটি শিশু যদি গণিতে শতভাগ নম্বর পায়, তাকে মেধাবী বলা হয়। কিন্তু যে শিশু অসাধারণ ছবি আঁকে, গান গায়, যন্ত্র তৈরি করে বা নেতৃত্ব দিতে পারে, তার প্রতিভা অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। ফলে শিশুর স্বাভাবিক সৃজনশীলতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছোটবেলায় প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় খুব সফল ছিলেন না। কিন্তু তাদের বিশেষ প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ ছিল বলেই তারা বিশ্বকে বদলে দিতে পেরেছেন।
দ্বিতীয়ত, আমাদের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বেড়াজালে আটকে আছে। শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার চেয়ে মুখস্থ উত্তর বলাকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়। একজন ছাত্র যদি বইয়ের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো প্রশ্ন করে, অনেক সময় তাকে উৎসাহিত না করে নিরুৎসাহিত করা হয়। ফলে তার অনুসন্ধিৎসু মন ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে। অথচ শিক্ষা হওয়া উচিত চিন্তা করার, যুক্তি খোঁজার এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রক্রিয়া।
তৃতীয়ত, শিক্ষকদের একটি অংশ অনিচ্ছাকৃতভাবেই অনেক মেধাবী শিশুর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেন। সব শিক্ষক নন, তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় দুর্বল ফলাফল করা ছাত্রদের প্রতি নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়। ‘তুমি কিছুই পারবে না’, ‘তোমার দ্বারা হবে না’ এ ধরনের কথাগুলো একটি শিশুর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। ইতিহাস বলে, বহু সফল মানুষ তাদের জীবনের শুরুতে শিক্ষক বা সমাজের অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছিলেন। একজন শিক্ষক যদি একটি শিশুর সম্ভাবনা চিনতে পারেন, তবে তিনি তার জীবন বদলে দিতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের জীবনের একটি ক্ষোভের কথা তুলে ধরলামঃ
‘স্কুল আমাকে ব্যর্থ করেছিল, আর আমিও স্কুলকে ব্যর্থ করেছিলাম। স্কুল আমাকে বিরক্ত করতো। শিক্ষকরা পুলিশ সার্জেন্টের মতো আচরণ করতেন। যা জানতে আমার আগ্রহ ছিল, সেই বিষয়গুলো শিখতে চেয়েছিলাম; কিন্তু শিক্ষকরা চেয়েছিলেন আমি যেন শুধু পরীক্ষায় পাশ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। যে বিষয়টি আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করতাম, তা হলো প্রতিযোগিতামূলক বিষয় – বিশেষ করে ক্রীড়া। এ কারণে আমি শিক্ষকদের বিরাগভাজন হয়ে পড়ি। এমনকি আমাকে কয়েকবার স্কুল ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এটা ছিল মিউনিখের একটা ক্যাথলিক স্কুল। আমি অনুভব করলাম শিক্ষকরা আমার জ্ঞানপিপাসা দমন করছেন। তাদের কাছে উচ্চ গ্রেডই সফলতার মানদ-। এমন শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষক কীভাবে একজন জ্ঞানপিপাসু ছাত্র বা ছাত্রীকে বুঝবেন? ১২ বছর বয়স থেকে শিক্ষকদের কর্তৃত্ব নিয়ে আমি সন্দেহ করতে শুরু করি এবং তাদের প্রতি অবিশ্বাস জন্মায়।” আলবার্ট আইনস্টাইন।
চতুর্থত, অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশাও শিশুদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বাবা-মা সন্তানের স্বপ্ন নয়, নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন। শিশু গান ভালোবাসে, কিন্তু তাকে জোর করে ডাক্তার বানানোর প্রস্তুতি দেওয়া হয়। কেউ খেলাধুলায় দক্ষ, কিন্তু তাকে সারাদিন কোচিং ও প্রাইভেটের চাপে রাখা হয়। ফলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অপব্যবহারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। অনেক শিশু মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে। এর পেছনেও পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। শিশুকে প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা নয়, বরং প্রযুক্তির সৃজনশীল ও শিক্ষামূলক ব্যবহার শেখানো প্রয়োজন। গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিশুর কথা ভাবুন। সে হয়ত রাতের অন্ধকারে কুপির আলোয় পড়াশোনা করছে। তার মধ্যে রয়েছে অসাধারণ সম্ভাবনা। কিন্তু আর্থিক সংকট, শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তাকে সামনে এগোতে দেয় না। আবার শহরের অনেক শিশুর সব সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপের কারণে তার সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। দুটি ঘটনাই আমাদের ব্যর্থতার প্রতীক।
একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার মানবসম্পদ। আর মানবসম্পদের ভিত্তি হলো শিশু। আজ আমরা যদি শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার পরিবেশ তৈরি করতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে জাতি হিসেবে আমাদের মূল্য দিতে হবে। প্রয়োজন শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা, মানবিক শিক্ষক, সচেতন অভিভাবক এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ।
বাংলাদেশের শিশুরা মেধাবী এ কথা শুধু আবেগ নয়, বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান মেলা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিযোগিতা কিংবা বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তারা বারবার সেই প্রমাণ দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছি? যদি না দিই, তবে হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি প্রতিভার দায় আমাদের সবার।
শিশুরা জন্মগতভাবে সম্ভাবনার প্রদীপ নিয়ে পৃথিবীতে আসে। সেই প্রদীপকে জ¦ালিয়ে রাখার দায়িত্ব পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের। আমরা যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, তাহলে শুধু একজন শিশুই নয়, পুরো জাতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
খুলনা গেজেট/এএজে

