সোমবার । ৮ই জুন, ২০২৬ । ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

জঙ্গল সলিমপুর : প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

আবদুল কাদের খান

‘বন্ধু তোমার ছাড়ো উদ্বেগ!
সুতীক্ষ্ম করো চিত্ত,
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি,
বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।’

দুর্বৃত্তদের ভণ্ডামির কাহিনি লিখতে গিয়ে, কবি কিশোর সুকান্ত ভট্টাচার্যের শরণাপন্ন হতে হলো। গা’ ছমছম করা কাহিনি! এবার কেঁপে উঠলো হিমালয় থেকে সুন্দরবন।

না, সুন্দরবনের বনদস্যুদের কথা আমি বলছি না। আমার নিশানা চট্টগ্রামের শহরতলীতেই অবস্থান, নিবিড় বন আর পাহাড়ে ঘেরা, কুখ্যাত সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুর। জঙ্গল সলিমপুরের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী ঘটনায় দেশের সচেতন নাগরিকরা আতঙ্কিত। ‘দেশের মধ্যে যেন আরেক দেশ!’ ওরা এতই বেপরোয়া যে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদ্য নির্মিত অস্থায়ী ক্যাম্প। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে যেন কোনোভাবে কোনো অভিযান চালাতে না পারে তার জন্য পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও কালভার্ট ওরা কেটে ফেলেছে। পক্ষকাল আগের ঘটনা। গত ২৪ শে মে রোববার গভীর রাতে চট্টগ্রামের আতঙ্ক কুখ্যাত জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে অতর্কিতভাবে দুঃসাহসিক এ হামলা ঘটানোর পর প্রশ্ন উঠেছে – শান্তি প্রতিষ্ঠার সমস্ত আকাক্সক্ষা পদদলিত করে ভয়ংকর জঙ্গল সলিমপুরে কুখ্যাত সন্ত্রাসী- বেআইনি অস্ত্রধারীরা যা করেছে, তাতে মনে হয়েছে, একি বাংলাদেশে হঠাৎ সহিংস বেআইনি বেপরোয়া আক্রমণের হোতা, এরা কারা? রাষ্ট্রের যৌথ বাহিনীর দৃষ্টিতে জঙ্গল সলিমপুর আর কতদূর?

সমগ্র দেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ এই খবর শোনার পর সবার চোখ কপালে উঠেছে! দেশে নির্বাচিত সরকার থাকতে পাহাড়ি এলাকায়, সীতাকুণ্ডে এ আবার কোন সরকার? ব্যাপারটি এতই ভয়াবহ যে রাষ্ট্রীয় যৌথ বাহিনীকে কোনো পরোয়া না করে, তাদের ক্যাম্পে নগ্নভাবে দুঃসাহসিক কুৎসিত হামলা চালালো, ভারী আধুনিক অস্ত্র নিক্ষেপ করলো, এরা কারা, কাদের ইশারায় এরা পরিচালিত?

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং ওয়াকিফহাল মহল বলছেন, মাত্র আড়াই মাস আগে প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি ন্যক্কারজনক ভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া এ নারকীয় ভয়াবহ দুঃসাহসিক হামলা সারাদেশের মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল চট্টগ্রাম শহরে অবস্থানরত জঙ্গল সলিমপুর এখন দুর্বৃত্তদের অভয় অরণ্য। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চেয়েও এরা কত হিংস্র, কত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই কুখ্যাত অপরাধীদের রয়েছে নিজস্ব আইন, নিজস্ব সংবিধান! কোনোপ্রকার রাষ্ট্রীয় শাসন না মানার ব্যাপারে তারা ভীষণ বেপরোয়া, ভীষণ স্বেচ্ছাচারী!

ওই অঞ্চলে জঅই- ৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “সলিমপুরের সন্ত্রাসী বাহিনীর ইয়াসিন গ্রুপের সন্ত্রাসী সদস্যরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে তাদের উদ্দেশ্য এবং শক্তিমত্তা জাহির করতে চেয়েছিল! ক্যাম্পের অকুতোভয় সদস্যরা সাহসিকতার সাথে অত্যন্ত দুঃসাহসীভাবে উদ্ভূত নাজুক পরিস্থিতি অত্যন্ত সক্ষমতার সাথে মোকাবিলা করেছে। বেপরোয়াভাবে ইট পাটকেল এবং ককটেল বিস্ফোরণে কয়েকজন সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন। ওই রাতের হামলায় জঙ্গলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা দলবদ্ধভাবে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে, বিশেষ করে এলএমজি সদৃশ অস্ত্র, দেশে তৈরি নানা ধরনের অস্ত্র, রাইফেল ও বিপুল পরিমাণ ককটেল ব্যবহার করেছে।”

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাসুদ আলম একটা বাস্তব কথা বলেছেন। তাঁর মতে, “জঙ্গল সলিমপুরে যে অস্থায়ী নতুন ক্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছিল, সেটিই ছিল ওই অঞ্চলের সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলাকারীদের মূল টার্গেট! সেখানে যাতে স্থায়ীভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবস্থান নিতে না পারে সে উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়! এবং একযোগে সন্ত্রাসীরা তাদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে। বর্তমানে সেখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রশাসনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।”

ওই অঞ্চলের প্রশাসন ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের মতে, জঙ্গল সলিমপুর ও আলিনগর এলাকার পাহাড় খেকো এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্মূলে কয়েক সপ্তাহ ধরে যৌথ বাহিনীর বিশেষ দল সেখানে অবস্থান করছিল। জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি অস্থায়ী ক্যাম নির্মাণ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যখন তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করছিল, সেটাই ওদের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়! তাই গত ২৪ শে মে রবিবার ভোররাতে আকস্মিক দলবদ্ধভাবে ২০০ থেকে ৩০০ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কোনো কিছু পরোয়া না করে প্রশাসনের অস্থায়ী ক্যাম্পটি সহসা ঘিরে ফেলে। তারা তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র সহ বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হয়।

পাহাড়ের উপরের দিক থেকে আক্রমণকারী সন্ত্রাসীরা প্রথমে বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং এর পর পরই ক্যাম্প লক্ষ্য করে বেপরোয়াভাবে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ শুরু করে। ক্যাম্পে প্রহরারত সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক হয়ে পাল্টা মোকাবেলা করে এবং গুলি চালান। শুরু হয় উভয় পক্ষের তুমুল বন্দুকযুদ্ধ। ক্যাম্প হামলার কাজে সন্ত্রাসীরা এলএমজি, রাইফেল সহ বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে। দুই পক্ষের মধ্যে কয়েকশ’ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। বেপরোয়া গোলাগুলির মধ্যে সন্ত্রাসীরা তাদের সাথে আনা বুলডোজার দিয়ে সদ্য নির্মিত ক্যাম্পটি মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দেয়! ভোর পাঁচটার দিকে সকালের আলো ফুটবার আগে অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছালে ওরা টিকতে না পেরে অবশেষে গহিন জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করে। পরে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করে প্রশাসন এবং যৌথ বাহিনী। ওরা ২৫ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কামাল হোসেন নামে র‌্যাবে কর্মরত একজন কর্মকর্তা জানান, “সন্ত্রাসীরা রাস্তা কালভার্ট কেটে, বিপুল সংখ্যক ককটেল নিক্ষেপ করে, এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে ভেবেছিল পার পেয়ে যাবে, কিন্তু আমরা ওদের গোপন কৌশলের চেয়েও দারুণ কৌশলী ছিলাম তা ওরা বুঝতে পারেনি।”

চট্টগ্রাম নগর এর মধ্যে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আরেকটি সন্ত্রাসের অভয় অরণ্য গড়ে উঠেছে, চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য হিসেবে জঙ্গল সলিমপুর স্বীকৃতি পেলেও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার তিন হাজার এক শ’ একর পাহাড়ি এলাকা জুড়ে জঙ্গল অঞ্চলে এই নিষিদ্ধ অপরাধ রাজ্যের অবস্থান! দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল ছোট-বড় ২০টি সন্ত্রাসী বাহিনী। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এসব বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছে যেসব কুখ্যাত সন্ত্রাসী লিডাররা, ওরা হচ্ছে : ইয়াসিন মিয়া, কাজী মশিউর রহমান, লাল বাদশা, গোলাম ফারুক, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেকসহ অন্যান্যরা। ২০২৪ সালের আগস্টে ফটো পরিবর্তনের পর এই অপরাধ সাম্রাজ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড এলাকার বিএনপি নেতা রোকনউদ্দিন মেম্বার। তিনিও একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে তার প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন! এ কারণে অনেক সময় প্রশাসন কথা বলতে থেমে যায়! বর্তমানে রোকন বাহিনীর সাথে কাজী মশিউর, কাজী সাদেক ও গোলাম গফুর বাহিনীর মোর্চা গড়ে উঠেছে। জঙ্গল সলিমপুরে কুখ্যাত সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো পুরো এলাকাকে বিভিন্ন ব্লকে বিভক্ত করে এ অপরাধ রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেখানে বসবাসরত প্রতিটি বাসিন্দাকে অপরাধী চক্রের দেওয়া বিশেষ পরিচয়পত্র বহন করতে হয়! যা ঐ এলাকায় ‘প্রবেশের পাশ’ হিসেবে গণ্য হয়। ভেবে দেখুন নির্বাচিত সরকারের মধ্যে সন্ত্রাসী দুর্বৃত্ত চক্র আরেকটি সরকার বেআইনিভাবে কীভাবে চালু রেখেছে! সন্ত্রাসীদের আক্রান্ত এই এলাকায় জমি জায়গা বেচাকেনা, ঘরবাড়ি তৈরি, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা জিয়াফত (মেজবান) করতে হলেও নিতে হয় জঙ্গলের এসব রাজাদের বিশেষ অনুমতি! এমন কি প্রতিদিন সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট এলাকায় বসে সন্ত্রাসীদের ‘বিচার আদালত’। সেখানে ওই এলাকার বাসিন্দাদের নানা কথিত অপরাধের বিচার করা হয়! অভিযোগ রয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশপথে সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র পাহারা মোতায়েন থাকে। এলাকায় অভিযানে গিয়ে বারবার এইসব ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হতে হয়েছে আইন প্রয়োগ সংস্থা ও প্রশাসনের। এ কারণে ২০২৪ সালে আগস্ট বিপ্লবের পূর্বে তৎকালীন হাসিনা সরকার আমলে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দুর্বৃত্ত দমনের নামে অভিযানে নেমে ইঁদুর বিড়াল খেলার মত ওই অঞ্চলে লোক দেখানো ভাবে অভিযানের নামে ‘আই ওয়াশ’ করে তৎকালীন সরকার জনগণকে খুশি করত। তবে গত মার্চ মাসে নির্বাচিত সরকারের অধীনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে ওই এলাকায় সরাসরি অভিযানে নাজুক অবস্থা কেটে গিয়ে সরকার ও প্রশাসনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যথেষ্ট সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড সন্ত্রাসী বনভূমির দিকে তাকিয়ে আমরা আশা করব পাহাড়ি জনপদ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে বসবাসরত মানুষ সন্ত্রাসমুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে পাবে। শান্তিপূর্ণ এলাকার মুখ দেখবে। প্রশাসনের অব্যাহত সাঁড়াশি অভিযান এবং ঘন ঘন মনিটরিং এর মাধ্যমে এই ধরনের কালব্যাধি নিরাময় সম্ভব। রাষ্ট্রের মধ্যে বেআইনি সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য সম্পর্কে আমরা যা বললাম সরকার ও প্রশাসন বিষয়টি ভালোভাবে ভেবে দেখবেন। তাহলে ওই এলাকায় চিরস্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে। যতদিন কর্তৃত্ব, সন্ত্রাস এবং স্বঘোষিত বেআইনি রাজা, সাম্রাজ্য ওই অঞ্চলে থাকবে, ততদিন ওই অঞ্চলের জনগণের শান্তির প্রত্যাশা হবে সুদূর পরাহত। আর যদি সরকারের নেক নজর থাকে, তাহলে তা অতি অচিরেই সত্যিই একটি সুখী ও সম্পন্ন জনপদে পরিণত হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন