শনিবার । ৬ই জুন, ২০২৬ । ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

হারিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমের নদী

গৌরাঙ্গ নন্দী

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এক সময়ে জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অসংখ্য নদ-নদী। এসব নদ-নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের সভ্যতা, নদীতে ঘিরেই বিকশিত হয়েছিল এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা। একদিন যে নদী দিয়ে চলাচল করতো লঞ্চ, কার্গো, জাহাজ সেই নদীর বুক জুড়ে এখন ধু-ধু বালুচর। অবৈধ দখলদাররা ইতোমধ্যে দখল করে নিয়েছে সেই সব চর। এখনো যে নদীগুলো আজও জীবিত রয়েছে সেগুলোকেও কৌশলে মেরে ফেলছে এক শ্রেণীর ভূমি দস্যুরা।

যে নদীগুলো বেঁচে থেকেও আজ মৃত্যুর পথে তারই একটি ভৈরব নদ। এটি কুষ্টিয়া, যশোর ও নড়াইলের মধ্য দিয়ে খুলনা অভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে। এ নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার এক সময়ে ভৈরব নদ খরস্রোতা ছিল। কিন্তু ভৈরব নদীর উজান থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিচ্ছিন্ন করায় যশোর ঝিনাইদহ অংশে পলি পড়ে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেছে। এই শুকিয়ে যাওয়া অংশ অবৈধ দখলদাররা গ্রাস করে নিয়েছে। যে অংশে সামান্য পানি রয়েছে সে অংশে বাঁধ বা বাঁশের পাটা দিয়ে পুকুর সাদৃশ্য করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। যশোরের বাজার এলাকায় প্রভাবশালী মহল প্রশাসনের নাকের ডগায় ভৈরবের পাড় ভরাট করে স্থায়ী স্থাপনা গড়ে তুলে ভবিষ্যতে ভৈরবকে প্রবাহমান করার পথ চিরতরে বন্ধ করে দিচ্ছে। অপরদিকে নওয়াপাড়া ও খুলনায় ভৈরবের যে অংশ আজও জীবিত রয়েছে সে অংশের দুই পাড়ে প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে দখল প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। নওয়াপাড়া এলাকায় নদীর দু’কুলের প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকা ইতোমধ্যে দখল হয়ে গেছে। নওয়াপাড়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদের উপর গড়ে উঠেছে বড় বড় বিল্ডিং গোডাউনসহ নানা প্রতিষ্ঠান। দখল প্রক্রিয়া এমন বিস্তার লাভ করেছে যে বড় বড় বিল্ডিং নদীর মাঝখান দিয়ে গড়ে উঠেছে। ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে ভৈরব। নওয়াপাড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম জুট মিল জে জে আই কার্পেটিং বেঙ্গল টেক্সটাইল, নওয়াপাড়া জুট মিল এস এফ চামড়ার মিলসহ শতাধিক বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া রয়েছে দেশের সর্ববৃহত্তম সারের মোকাম। এ কারণে নওয়াপাড়ায় প্রতিদিন পণ্যবাহী কার্গো ও বার্জ যাতায়াত করে। কিন্তু নদীর অবস্থা এমন হয়েছে জোয়ারের সময় ছাড়া ঘাটে পন্যবাহী বার্জ ও কার্গো ভিড়তে পারে না।

অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালী মহল ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তার সহায়তায় নওয়াপাড়ার একাধিক ঘাট তৈরী করে ইজারা দিয়ে অর্থ আদায় করছে। এরফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এদিকে ভৈরব নদ এর মজুদ খালী থেকে রূপসা নদীর লবণচরা পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ কিলোমিটার (দুই পাড়) এলাকায় প্রায় সহস্্রাধিক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে প্রায় শতাধিক বড় বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের জমির বাইরে এখন নদীর জমি দখলের প্রতিযোগিতায় মেতেছে। ফলে ভৈরব হারাচ্ছে তার চিরচেনা রূপ। এ অবস্থায় ভৈরব নদের পাশে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা অবিলম্বে উচ্ছেদ করে নদের নব্যতা ফিরিয়ে না আনলে শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর খুলনা ও নওয়াপাড়ার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। কর্মহীন হয়ে পড়বে হাজার হাজার শ্রমিক।

ভৈরবের মত কপোতাক্ষ নদের নেই আজ ঢেউয়ের মাতলামী। নেই তার আপন মহিমা। কিছু স্বার্থন্বেষী মহল নদীর দুই পাড় দখল শুরু করেছে। আর এ দখল প্রক্রিয়া দিন দিন শুধু বাড়ছে। দখলবাজরা প্রথমে নদীর কিছু অংশ বালির বস্তা ফেলে বাধ ডোর করছে। এবং পর্যায়ক্রমে বালির বস্তা ফেলে বাঁধ তৈরি করছে এবং পর্যায়ক্রমে এ বাঁধ নদীর ভিতর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এতে নদীর প্রস্ততা সংকীর্ণ হয়ে আসছে। ২০০৩-২০০৫ সালের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৬ কোটি টাকা কপোতাক্ষ নদে দু’দফা ড্রেজিং করে কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং সীমাহীন দুর্নীতির কারণে কপোতাক্ষ নদের নাব্যতা ফিরে আসেনি। যদিও প্রমত্তা কপোতাক্ষ নদকে বাঁিচয়ে তুলতে স্থানীয় কিছু সংগঠন ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়েছে। বর্তমানে বিপুল টাকা ব্যয়ে কপোতাক্ষ নদকে প্রবাহমান করার চেষ্টা চলছে।

যেন নদী গুলো মরে গেছে তারই একটি কাজীবাছা ও ময়ুর নদী। একসময় খুলনা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত কাজীবাছা ও ময়ুর নদী খুলনার সৌন্দর্যকে অনেক গুন বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু অবৈধ দখল ও সিটি কর্পোরেশনের অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে আজ এ নদী দুটোই আধুনিক ও দুষণ-মুক্ত খুলনা নগরী গড়ার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ময়ূর নদে সিটি কর্পোরেশন লিনিয়ার পার্ক নির্মানের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছে। কিন্তু ময়ূর নদের পাড়ে লিনিয়ার পার্ক গড়ে তোলা হলেও শহরের প্রতিদিনকার বর্জ্যে নদীটি ভরাট হচ্ছে। তাছাড়া কচুঁড়িপানায় নদীতে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে আছে। অপরদিকে গল¬ামারীতে ময়ূর নদীর উপর যে ব্রীজটি নির্মিত হচ্ছে তা একেবারেই পানির ওপরে। বৃষ্টির সময়ে ব্রীজের রেলিংয়ে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে।

শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশ দিয়ে জলমা ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে রায়েরমহল এলাকা পর্যন্ত নদী দুটি প্রবাহিত। এর দৈর্ঘ্য ৯ কিলোমিটার। এর কিছু অংশ কাজীবাছা কিছু অংশ ময়ূর এবং কিছু অংশ স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে হাতিয়া নামে পরিচিত। ১৯৮২ সালে খুলনা শহর রক্ষা বাঁধ নির্মণের পর থেকে নদীটির কিছু অংশ মৃত এবং বাকী টুকু বন্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। আর এ সুযোগে যে যেভাবে পারছে দখল করে নিচ্ছে। দখল তালিকার সবার আগে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। বর্তমানে দখলবাজরা এ নদীতে মাছ ও ধান চাষ, বসতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এদিকে এ নদীর সাথে সংযুক্ত রয়েছে সিটি কর্পোরেশনের ১২টি ড্রেন ও ৪টি খাল। এ খাল ও ড্রেনগুলো দিয়ে মহানগরীর সমস্ত বর্জ্য এসে পড়ছে এ নদীর পানিতে। এ কারণে বিষিয়ে উঠছে খুলনার পরিবেশ, দীর্ঘদিন ধরে খুলনার সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা নদী দুটো বাঁচানোর জন্য নদী দুটো থেকে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নগরীর সকল বর্জ্য ফেলা বন্ধ করার জন্য আন্দোলন করে আসলেও তাদের দাবি আজও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

এক কালের প্রমত্তা ভদ্রানদী তার নব্যতা হারিয়ে আজ ভূমি দস্যুদের কবলে পড়েছে। ডুমুরিয়ার তিন দিকে অবস্থিত দীর্ঘ প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় প্রভাবশালীমহল দখল নিয়ে ভোগ করে যাচ্ছে। তাদের এ কাজে সহায়তা করছে ভূমি অফিসের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। দখলবাজদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাইন বোর্ড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। দখলকৃত জমিতে দখলবাজ তৈরী করছে পাকা ভবন, স মিল, রাইস মিলসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। যদিও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সালতা ও ভদ্রা নদী দুটি খননের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর প্রেরণ করেছে।

মৃত নদীর আর একটি মুক্তেশ্বরী নদী আজ ক্ষীনকায়া। এটি যে কোন কালে নদী ছিল তা বোঝারই উপায় নেই। এর এক পাড় ঘেষে তৈরী হয়েছে নতুন নতুন জনপদ। অপরদিকে যেখানে পানি আছে সেখানে চলছে মাছ চাষ। আর আবাদি জমি বানানো। সরকার যাদের লিজ দিয়েছে তারা জনগণের দুর্দশাও কথা চিন্তা না করে ডিবি বাধ দিয়ে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবল চাপে ঐ এলাকার জনপদগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। এতে ফসলহানি ঘটছে কোটি কোটি টাকার। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে মানুষের জীবন যাপন।

মুক্তেশ্বরী ও ইছামতির মত শ্রী নদী ও আজ মৃত। এর বুকে জেগে ওঠা চরগুলো দখল করে নিচ্ছে প্রভাবশালী মহল, নদীকে বানিয়ে ফেলেছে আবাদী জমি। অন্যান্য নদীর মত টেকা নদী ও পায়নি অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে মুক্তি। এর দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে বসতি। আর জেড়ে উঠা চরে চলছে চাষাবাদ। আবার কোথাও কোথাও পাটা ফেলে চলছে মাছ চাষ। ভবদহের জলাবদ্ধতার নিরসনের জন্য শ্রীনদী ও হরিপুর নদীর কিছু অংশের খনন কাজ হয়েছে এলাকাবাসী ভবদহের জলাবদ্ধতার স্থায়ীভাবে নিরসনের জন্য শ্রী নদী, হরিহর নদীর সকল অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ এবং খনন করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

কপোতাক্ষ, ভৈরব, রূপসা, কাজীবাছা ও ময়ুর নদসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় জনগণ, সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা নদীগুলো থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ নিয়মিত ড্রেজিং এবং নদী শাসন বন্ধের জন্য আন্দোলন করেছেন। কিন্তু কোন সরকারই এ সমস্ত আন্দোলনের প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়নি। যে কারণে এ অঞ্চলের নদীগুলো একে একে মরে যাচ্ছে। আর সেই নদীগুলোর ওপর হামলে পড়ছে অবৈধ দখলদাররা।

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন