ঈদ প্রত্যেক মুসলিমের জীবনে একটি বিশেষ ধর্মীয় উৎসব, যা সারা দেশজুড়ে সকলের হৃদয়ে আনন্দ ও ঐক্যের বার্তা বয়ে আনে। ঈদ উদ্যাপন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি মানবতার ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতার প্রতীক। পথশিশুদের কাছে ঈদ যেন হতাশার না হয়, সত্যিকারের অর্থে ঈদের আনন্দ প্রকাশ পায়।
ঈদ আসলে সবচেয়ে বেশী আনন্দ করে শিশুরাই। পথশিশুদের ঈদ আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায় যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের ঈদের খুশি সাধারণ শিশুদের চেয়ে একদম আলাদা এবং অনেক বেশি কষ্টের ও প্রত্যাশার। পথশিশুদের কাছে ঈদ উৎসবের চেয়েও কঠিন বাস্তবতায় বেঁচে থাকার লড়াই।
পথশিশুদের কাছে ঈদ মানেই কেবল নতুন পোশাক বা উন্নত খাবার নয়, বরং দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াইয়ের বাইরে একটু স্বস্তি ও আনন্দের নিশ্বাস। পরিবারহীন বা সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের জন্য ঈদ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের বিত্তবান ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের পাশে দাঁড়ায় এবং তাদের মুখে হাসি ফোটানোর উদ্যোগ নেয়।
সাধারণ শিশুদের মতো পথশিশুদের নতুন জামা, জুতো এবং ঈদের উপহার পাওয়ার ইচ্ছা থাকে। ঈদের দিন সাধারণ শিশুদের মতো নতুন জামা, ভালো খাবার বা সালামি তাদের ভাগ্যে জোটে না। সাধারণ শিশুদের মতো পথশিশুদের কোনো ছুটির দিন থাকে না। ঈদ এলে তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না, বরং অন্যান্য দিনের মতোই বেঁচে থাকার জন্য তাদের সংগ্রাম করতে হয়। নতুন পোশাক, মিষ্টি-সেমাই বা স্বজনদের সাথে সময় কাটানো তাদের জন্য একপ্রকার স্বপ্নের মতোই। তবে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী ও সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের মাঝে নতুন জামা ও খাবার বিতরণ করে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে সমাজের অনেক মানুষ ও সংগঠন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শিশুদের পছন্দ অনুযায়ী নতুন জামা কিনে দেয়। ঈদের দিন বিভিন্ন এলাকায় পথশিশুদের জন্য উন্নত খাবার যেমন; বিরিয়ানি, পোলাও বা মিষ্টির আয়োজন করা হয়। নতুন পোশাকের সাথে শিশুদের খেলনা এবং ঈদের সালামি হিসেবে ছোট অঙ্কের টাকাও দেওয়া হয়। নতুন জামা পাওয়ার আনন্দ তাদের কাছে সবচেয়ে বড় উপহার। ঈদের দিন পেটপুরে পোলাও-মাংস খাওয়া তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পরিবারের অভাব বা অনুপস্থিতি তাদের ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দেয়।
পথশিশুদের কাছে ঈদ কোনো উৎসব নয়, বরং এটি তাদের নিত্যদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের আরেকটি কঠিন দিন। নতুন পোশাক, মিষ্টি সেমাই বা পরিবারের সান্নিধ্যের পরিবর্তে তাদের দিন কাটে ফুটপাতে বা ডাস্টবিনে খাবার খুঁজে, ফুল বিক্রি করে বা অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করে।
পথশিশু, বাড়ি নেই, ঘর নেই; পরিবার নেই, পরিচয় হিন নিঃসঙ্গ জীবনে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই। পরিবারের অভাব-অনটন, ভাঙন বা অন্য কোনো কারণে ঘরছাড়া এসব শিশুর ঠিকানা হয় রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল বা পার্কের বেঞ্চ। কোনো নির্দিষ্ট আয়ের উৎস না থাকায় প্রতিটি মুহূর্তই তাদের জন্য টিকে থাকার যুদ্ধ। বাংলাদেশে রাস্তার পথশিশুদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই, আর তাদের সংখ্যা স্পষ্ট করা প্রায় অসম্ভব, যা বছরে বাড়ছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত চিলড্রেন লিভিং ইন স্ট্রিট সিচুয়েশন ইন বাংলাদেশ ২০২৪ শীর্ষক ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে দেশে নূন্যতম ৩৪ লাখ পথশিশু আছে বলে উল্লেখ করা হয়। ইউনিসেফের জরিপে দেখা যায়, ৯১ শতাংশ পথশিশু কাজ করে। ২০ দশমিক ৯ শতাংশ পথশিশু বর্জ্য সংগ্রহের কাজ করে। পথশিশুদের ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ভিক্ষাবৃত্তি ও ভিক্ষায় সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, ধোয়ামোছা ও হকার হিসেবেও কাজ করে।
পথশিশুদের ঈদের আনন্দের অংশীদার হতে বিত্তবানরা কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন। আপনার সাধ্যমতো নতুন বা পরিষ্কার পুরোনো পোশাক সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে বিতরণ করতে পারেন। ঈদের দিন কিছু প্যাকেট খাবার কিনে পথশিশুদের হাতে তুলে দিতে পারেন। কোনো নির্ভরযোগ্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে আয়োজিত ঈদ আনন্দ উৎসবে আর্থিক বা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে সহায়তা করতে পারেন।
পথশিশুদের জন্য ঈদের আনন্দ সাধারণত অন্য দশটা শিশুর মতো সহজ বা স্বাভাবিক হয় না, তবে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করা হয়। আমাদের সামান্য সহানুভূতি এবং একটুখানি ভাগাভাগি পথশিশুর ঈদকে চিরস্মরণীয় করে তুলতে পারে। পথশিশুদের ঈদের দিনটিকে একটু রঙিন ও আনন্দময় করে তুলতে আমাদের সকলেরই এগিয়ে আসা উচিত।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

