ছোটবেলায় আমরা একটা গল্প পড়তাম। এক ছিল রাখাল বালক। সে বনের ধারে গরু চরাত। মাঝে মাঝে খুব একঘেয়ে লাগত। তাই বিনোদনের জন্য সে চিৎকার দিত—
“বাঘ এসেছে! বাঘ এসেছে!”
গ্রামবাসী দা, কুড়াল, লাঠি নিয়ে দৌড়ে আসত। এসে দেখত—বাঘ নেই, রাখাল আছে। আর রাখাল হাসছে।
আজকের ভাষায় একে বলা যায়—“সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর”।
কয়েক দিন পর সে আবারও চিৎকার দিল।
গ্রামবাসী আবারও ছুটে এল।
আবারও বাঘ নেই।
আবারও হাসি আছে।
তখনো গ্রামের মানুষ ফেসবুক ব্যবহার শিখেনি, তাই তারা “আনফলো” করতেও পারেনি।
অবশেষে একদিন সত্যি সত্যি বাঘ এল। রাখাল প্রাণপণে চিৎকার করল।
কিন্তু কেউ এল না।
কারণ জনগণেরও একটা সীমা আছে।
প্রতিদিন “ব্রেকিং নিউজ” শুনতে শুনতে একসময় মানুষ সত্যিকারের বিপদকেও বিজ্ঞাপন ভেবে নেয়।
বাঘ এসে রাখালকে খেয়ে ফেলল।
গল্পের উপদেশ ছিল—
“সদা সত্য কথা বলিবে।”
কিন্তু আধুনিক পৃথিবী গল্পটার নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে।
একদল বলল, রাখাল বালক আসলে পৃথিবীর প্রথম গল্পকার। কারণ সে বাস্তবে না থাকা একটা বাঘ সৃষ্টি করেছিল। অর্থাৎ সে ছিল সৃজনশীল। আজ বেঁচে থাকলে হয়তো সাহিত্য পুরস্কারও পেত।
আরেক দল বলল, এই গল্প শিশুদের ভুল শিক্ষা দেয়। কারণ ছেলেটা যত দিন মিথ্যা বলেছে, সবাই তার পাশে দাঁড়িয়েছে। যেদিন সত্য বলেছে, সেদিন কেউ আসেনি।
অর্থাৎ বাস্তব শিক্ষা হলো—
“মিথ্যা বলো, মানুষ পাবে। সত্য বলো, বাঘ পাবে।”
এখন প্রশ্ন হলো—আমাদের জাতীয় জীবন কি এই রাখাল বালকের গল্পের উন্নত সংস্করণ নয়?
প্রতিদিন নেতারা চিৎকার করছেন—
“দেশ গেল!”
“গণতন্ত্র শেষ!”
“স্বাধীনতা বিপন্ন!”
“ধর্ম গেল!”
“সংস্কৃতি গেল!”
“জাতি ধ্বংস হয়ে গেল!”
এত কিছু যাওয়ার পরও দেশটা আশ্চর্যজনকভাবে এখনো যায়নি।
জনগণও বিভ্রান্ত।
কোনটা আসল বাঘ, কোনটা নির্বাচনী বাঘ, কোনটা টকশো বাঘ, কোনটা ফেসবুক লাইভ বাঘ—বুঝে ওঠা দায়।
একদল বলে, সব সমস্যা বিরোধী দলের কাজ।
আরেক দল বলে, সব সমস্যা সরকারের কাজ।
মাঝখানে জনগণ দাঁড়িয়ে ভাবে—
“তা হলে ভালো কাজটা করছে কে? জাতিসংঘ?”
দেশে যখন চাপাতি চলে, তখন বিবৃতি আরও দ্রুত চলে।
মনে হয়, খুনির চেয়ে মাইকের সংখ্যা বেশি।
এমন অবস্থা হয়েছে যে, মানুষ এখন মৃত্যুর খবর শুনেও আগে দেখে—
“এটার রাজনৈতিক ভার্সন কোনটা?”
কারণ সত্য এখন আর ঘটনা না, সত্য এখন দলীয় সম্পদ।
আমাদের নেতারা জনগণকে এত বেশি ভয় দেখান যে, একসময় মানুষ ভয় পাওয়ার শক্তিটাও হারিয়ে ফেলে।
যেমন বেশি হর্ন শুনতে শুনতে একসময় কানে শব্দ ঢোকে না।
একসময় গ্রামের মানুষ বাঘের ভয় পেত।
এখন মানুষ ভয় পায়—
সংবাদ সম্মেলনকে।
এদিকে আমরা সাধারণ মানুষ বড় অসহায়।
আমরা বুঝতে পারি না—
কার কথা বিশ্বাস করব।
কার পোস্ট শেয়ার করব।
কার স্ট্যাটাসে “হাহা” দেব।
শুধু এটুকু বুঝি—
নেতাদের জন্য যা রাজনৈতিক কৌশল, জনগণের জন্য তা জীবন-মরণ প্রশ্ন।
তাই বিনীত অনুরোধ—
দয়া করে প্রতিদিন বাঘ দেখাবেন না।
মাঝে মাঝে সত্যিকারের গরুটাকেও দেখতে দিন।
আর যদি সত্যিই বাঘ আসে, অন্তত এতটুকু বিশ্বাস রেখে যান যেন মানুষ তখনও দৌড়ে আসে।
কারণ জনগণ একবার বিশ্বাস হারালে, বাঘেরও আর খুব কষ্ট করতে হয় না।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা।
খুলনা গেজেট/এনএম

