বুধবার । ২৭শে মে, ২০২৬ । ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ঈদুল আযহার গুরুত্ব এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর শিক্ষা

আবদুল কাদের খান

বিশ্ব মুসলমানদের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ উৎসব ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ। পবিত্র কোরআনে কোরবানির বদলে ‘কুরবান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। হাদিসেও কোরবানি শব্দটি ব্যবহৃত না হয়ে এর পরিবর্তে অজহিয়া ও জাহিয়া প্রভৃতি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আর এ জন্যই কোরবানির ঈদকে- ‘ঈদুল আযহা’ বলা হয়। এখানে আযহা শব্দটি আরবিতে কোরবান, ফারসি বা উর্দুতে ‘কোরবানি’ রূপে পরিচিতি পেয়েছে। যার অর্থ নৈকট্য। সম্পূর্ণ বিশ্লেষণের পর পারিভাষিক অর্থে – কোরবানি ওই মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়।

প্রচলিত অর্থে ঈদুল আযহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ও তার নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে ‘শারঈ তরিকায়’ যে পশু জবাই করা হয়, তাকে ‘কোরবানি’ বলা হয়। ঐদিন সকালে রক্তিম সূর্য উপরে উঠার সময়ে কোরবানি করা হয় বলে ওই দিনটিকে অন্য ভাষায় – ‘উয়াওমুল আযহা’ বলা হয়ে থাকে। যদিও এই কোরবানি সারাদিন ও পরের দুদিনও করা যায়। মূলত কোরবানির শাব্দিক অর্থ ত্যাগ। জ্বিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে পরম ত্যাগের নির্দেশনা স্বরূপ বিশ্ব মুসলিম মহাসমারোহে হজের অন্যতম অংশ পশু জবাইয়ের মাধ্যমে কোরবানি বা ঈদুল আযহা উৎসব পালন করে। সুতরাং ত্যাগের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মুসলমান জাতি যে উৎসবে মিলিত হয়, তাই ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ।

কোরবানি মুসলিম জাতির একটি ঐতিহ্য হওয়ায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ কারণে রাসূল (সাঃ) সব সময় কোরবানি করেছেন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি বর্জনকারী ব্যক্তির প্রতি তিনি সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেন। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’

কোরবানির ইতিহাস : কোরবানির ইতিহাস বহু প্রাচীন। আল্লাহর রাহে কোরবানি মানবজাতির প্রতি আল্লাহর প্রদত্ত সকল শরীয়তেই কার্যকর ছিল। সকল নবীর উম্মতকেই কোরবানি করতে হয়েছে। প্রত্যেক নবীর ইবাদতের এ ছিল এক অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তায়ালার এ বিধান মানবজাতির সৃষ্টি লগ্ন থেকেই কার্যকর হয়ে আসছে। মানব সভ্যতার সুদৃঢ় ইতিহাস এটাই সাক্ষ্য দেয় যে পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেদের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করে। এটাই মানুষের চিরন্তন স্বভাব বা ফিতরাত। এ ফিরাতের স্বীকৃতি প্রদান করে মহান আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট

ভাবে ঘোষণা করেছেন : ‘আমি প্রত্যেক নবীর উম্মতের জন্য কোরবানির এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি। যেমন তারা ওসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নিতে পারে, যেসব তাদেরকে দান করেছেন” (সূরা আল হজ -৩৪)।

মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোরবানি : মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোরবানি হাবিল কাবিল থেকে শুরু হয়। আদম হাওয়া দম্পতির জোড়ায় জোড়ায় পুত্র কন্যা সন্তান প্রসব করে। স্ত্রী হাওয়ার গর্ভজাত যমজ সন্তান কাবিলের সাথে যে কন্যা সন্তানটি জন্ম হয় সে খুব সুশ্রী সুন্দরী হয় তার নাম আকলিমা। আর হাবিলের সাথে সহজাত সহোদরা যে বোনটি জন্ম হয় সে তুলনামূলকভাবে একটু কম সুন্দরী তার নাম গাজা। বিবাহের সময় হলে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হাবিল এর সাথে জন্ম নেওয়া কন্যা গাজা কাবিলের ভাগে পড়ে। কাবিল বায়না ধরলো, জেদ করলো, আমার সহজাত বোন আকলিমাকে আমার সাথে বিবাহ দিতে হবে। হযরত আদম (আঃ) তাদেরকে আল্লাহর কাছে কোরবানি পেশ করতে বললেন। যার টি কবুল হবে সেই ওই কন্যার পানি গ্রহণ করবে। আদম আলাইহিস সাল্লাম নিশ্চিত ছিলেন, যে সত্য পথে আছে তার কোরবানি কবুল হবে। তৎকালে কোরবানি গৃহীত হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ ছিল। যার কোরবানি গৃহীত হবে আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কোরবানিকে ভস্মীভূত করে অন্তর্হিত হবে। যার টি কবুল হবে তার মালামাল অর্থাৎ কোরবানিকে ভস্মীভূত করে অন্তর্হিত হবে। এই পরীক্ষায় হাবিলের দ্রব্য এবং কাবিলের দ্রব্য রাখা হলো। হাবিলেরটি ভস্মীভূত হলো। হাবিল বিজয়ী হলেন। তার কোরবানি কবুল হলো। হযরত আদম (আঃ) এর পর সকল উম্মতের মধ্যে অবিচ্ছিন্নভাবে কোরবানি প্রথা চালু রয়েছে।

আমাদের কোরবানি সুন্নতে ইব্রাহিমী : কোরবানি এবাদত হিসেবে যদিও হযরত আদম আঃ এর থেকে চলে আসছে, কিন্তু পরবর্তীতে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর এক ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে এ কোরবানির প্রথা চলে আসছে। আমরা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সাল্লাম এর মিল্লাতের অনুসরণে প্রতিবছর আমরা পশু কোরবানি করি পাপ পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি, মনের পশুকে বধ করার নিয়তে। যেমন ইব্রাহিম আলাইহিস সাল্লাম আল্লাহর নির্দেশিত পরীক্ষায় প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোরবানির সংকল্প গ্রহণ করেন। তিনি যেমন আল্লাহর নির্দেশে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু স্নেহময় পুত্র ইসমাইলকে তার উদ্দেশ্যে কোরবানি করতে প্রস্তুত হন, ঈদুল আযহার দিন বিশ্ব মুসলমানরাও তেমনি পশু কোরবানির মাধ্যমে নিজেদের প্রিয়তম জানমাল আল্লাহর পথে কোরবানি করার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সাল্লাম এর সেই মহত্ত্ব এবং মাকবুল কোরবানিকে – শাশ্বত রূপদানের জন্যই আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এই দিনে মুসলমানদেরকে ঈদুল আযহা উপহার দিয়েছেন এবং কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ঈদুল আযহার তাৎপর্য : ঈদুল আযহা ইব্রাহিম আলাইহিস সাল্লাম ও তার স্ত্রী বিবি হাজেরা এবং প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আঃ)’র পরম ত্যাগের কঠিন পরীক্ষার স্মৃতি বিজড়িত উৎসব হলেও কোরবানির স্মৃতিবাহী জিলহজ্জ মাসে হজ উপলক্ষে সমস্ত পৃথিবী থেকে লাখ লাখ মুসলমান সমবেত হন ইব্রাহিমের স্মৃতি বিজড়িত মক্কা মদিনায়। তারা হযরত ইব্রাহিমী আদর্শে আদর্শবান হওয়ার জন্য জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেন। হজ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের এক উজ্জ্বল অনন্য উদাহরণ। যা প্রতিবছর আমাদেরকে তাওহিদী প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। ঈদুল আযহা উৎসবের একটি অঙ্গ হচ্ছে কোরবানি। কোরবানি হলো চিত্তশুদ্ধির ও পবিত্রতার মাধ্যম। এটি ইসলাম ধর্মে সামাজিক রীতি হলেও আল্লাহর জন্যই এ রীতি প্রবর্তিত হয়েছে। তিনি একমাত্র স্রষ্টা প্রতিমুহূর্তে তার করুণা লাভের জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে প্রত্যাশী। আমাদের প্রিয় বস্তু বিত্ত, সংসার এবং সমাজ তার উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। এবং কোরবানি হচ্ছে সেই নিবেদনের একটি প্রতীক। মানুষ কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হতে চায়। আল্লাহর জন্য মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে রাজি আছে কী-না সেটাই পরীক্ষার বিষয়! কোরবানি সেই পরীক্ষার কথা আমাদেরকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর কাছে পরীক্ষাও ছিল তাই। আমাদেরকে এখন আর স্বীয় পুত্র কোরবানি দেওয়ার মতো কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় না। একটি মুসিল্লাই হালাল পশু কোরবানি করেই আমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি।

কোরবানির ঈদ প্রসঙ্গে স্বভাবতই একটি প্রশ্ন এসে যায়! আমরা কী শুধু কোরবানির সময়ই গরিব-দুঃখী মানুষকে আহার করানোর কথা ভাববো? আর বছরের বাকি দিনগুলো কি তাদের এড়িয়ে চলবো? স্পষ্ট উত্তর হবে – না, অবশ্যই না। মূলত কোরবানি একটি প্রতীকী ব্যাপার! আল্লাহর জন্য নিঃশর্তভাবে আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত মাত্র।

মনে রাখতে হবে, কোরবানির পশুর রক্ত মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না বরং তার তাকওয়া অর্থাৎ তার মনের মহান প্রভুর প্রতি আত্মনিবেদনটি পরীক্ষা হয়। সারা বছরই আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় নিজ অর্জিত সম্পদ দুস্থদের কল্যাণের ত্যাগের মানসিকতায় গড়ে তুলতে হবে। এই ত্যাগের মনোভাব যদি সারা বছর বহাল থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, কোরবানির ঈদ ও কোরবানি সার্থক হয়েছে। নইলে নামমাত্র এটি একটি ভোগবাদী অনুষ্ঠান থেকে যাবে চিরকাল।

ঈদুল আযহার লক্ষ্য হচ্ছে, সকলের সাথে ঐক্য ও সদ্ভাব বজায় রাখা। আন্তরিকতা বিনয় ও নম্র আচরণ করা। সমগ্র মুসলমানের জীবনে এই সুযোগ সৃষ্টি হয় বছরে মাত্র দু’বার। ধনী দরিদ্র রাজা প্রজা একই কাতারে দাঁড়িয়ে পায়ে পা, কাঁধে কাধ মিলিয়ে খোলা জমিনে অর্থাৎ ঈদগায় আন্তরিকতার সাথে দু’রাকাত সালাত আদায়ের মাধ্যমে মানুষে মানুষে পরস্পর ভেদাভেদ ভুলে যায়। পরস্পরে কুশল বিনিময় করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। জীবনকে ক্ষণিকের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আন্তরিক মহানুভবতায় পরিপূর্ণ করে। মূলত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈন্য হতাশা দূরীকরণের জন্য ঈদুল আযহার সৃষ্টি হয়েছে।

মানব সন্তানের, বিশেষ করে মুসলমানের কোন সৎকর্মই আল্লাহর কাছে কোরবানির রক্তের চেয়ে প্রিয় নয়। কেয়ামতের দিনে কোরবানির পশুর শিং, লোম আর ক্ষুর সমূহ নিয়ে হাজির করা হবে। কোরবানির রক্ত মাটি স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহর কাছে তার সওয়াব গ্রাহ্য হয়ে যায়।

আল্লাহর কাছে কোরবানির সওয়াব গ্রাহ্য হওয়ার তাৎপর্য কী? প্রশ্ন উঠতে পারে! যে আকুণ্ঠ ইমান আর ত্যাগের মহিমায় উদ্দীপ্ত হয়ে নবী ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ আলাইহিস সাল্লাম প্রিয় প্রাণাধিক পুত্রের গলায় ছুরি উত্তোলিত করেছিলেন, কোরবানির পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার সময় ইব্রাহিমের মানব সন্তানদের অর্থাৎ অনুসারীদের হৃদয় তন্ত্রী সেই ইমান ও ত্যাগের সুরে যদি অনুরনিত না হয়ে ওঠে তাদের দেহ আর মনের পরতে পরতে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের আকুল আগ্রহে উদ্বেলিত না হয়, তাহলে তাদের কোরবানির উৎসব গোস্ত ভক্ষণের পর্বেই পর্যবসিত হবে।

আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কোরবানি দাতাদের সাবধান করে দিয়েছেন : ‘কোরবানির পশুর রক্ত গোশ্ত কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি’ (সূরা আল হজ -৩৭)।

ঈদুল আযহার শিক্ষা : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাধ।’ আরেক স্থানে কোরবানি কবিতায় বলেছেন, ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’ মানুষ আল্লাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে, এই শিক্ষাই ইব্রাহিম আলাইহিস সাল্লাম আমাদের জন্য রেখে গেছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লাম আমাদের জন্য ওই ত্যাগের অনুষ্ঠান অনুসরণকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে গেছেন। বিশেষ করে ঈদুল আযহার মূল আহ্বান হলো, আল্লাহ ভীতি। কোরবানির পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার পূর্বে নিজেদের মধ্যে লুকানো পশুত্বের গলায় ছুরি দিতে হবে। মহান আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণকারী ও আত্মত্যাগী হতে হবে। তাই তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মুমিন বা মুত্তাকী হতে হবে। আমাদের সালাত, কোরবানি, জীবন মরণ সবকিছু আল্লাহর জন্য উৎসর্গ হোক। ঈদুল আযহায় স্রষ্টার নিকট এই থাকুক প্রার্থনা।

আমরা আবারও কবি নজরুলের উক্তিটি মনে করি —
‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’

ভাষ্যকার : অধ্যাপক, প্রবন্ধকার, কবি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন