সুন্দরবন দেখতে এসে খুলনাকে না দেখা এক অপূর্ণতা

মোঃ মামুন হাসান

সুন্দরবনে যাওয়ার পথে খুলনায় নামলেন, রাত কাটালেন, সকালে নৌযানে উঠলেন, তারপর ফিরে এলেন। বেশির ভাগ পর্যটকের কাছে এটিই খুলনার সঙ্গে সুন্দরবন ভ্রমণের সম্পর্ক। অথচ এই সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। সুন্দরবন দেখতে এসে খুলনাকে না দেখা অনেকটা একটি গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাদ দিয়ে পুরো গল্পটি পড়ার মতো। কারণ সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, আর খুলনাও শুধু সুন্দরবনে যাওয়ার পথ নয়। দুটিকে মিলিয়েই তৈরি হতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতা।

সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রকৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিস্ময়। নদী, খাল, গাছপালা, বন্য প্রাণী আর মানুষের জীবনযাত্রার এক অসাধারণ সমন্বয় এই বনকে করেছে অনন্য। দেশ বিদেশের পর্যটকের কাছে সুন্দরবনের আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন নিয়ে আমাদের পরিকল্পনায় একটি বিষয় এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। সেটি হলো সুন্দরবনের সঙ্গে খুলনাকে একটি সমন্বিত পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা।

খুলনা সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। সুন্দরবন ভ্রমণের আগে পর্যটকের প্রস্তুতি, যাতায়াত, নৌযান, খাবার, থাকার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অনেক সেবার সঙ্গে এই শহর সরাসরি যুক্ত। ফলে পর্যটকের কাছে খুলনার গুরুত্ব কেবল ভৌগোলিক নয়, পর্যটন অর্থনীতির দিক থেকেও যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক পর্যটক খুলনায় অবস্থান করলেও শহরটিকে দেখার জন্য আলাদা সময় রাখেন না। সুন্দরবন দেখা শেষ করেই তারা পরবর্তী গন্তব্যের দিকে চলে যান।

অথচ খুলনাকে দেখার মতো অনেক কিছুই আছে। রূপসা নদী, রূপসা সেতু, নদীর পাড়ের জীবন, শহরের পুরোনো অংশ, স্থানীয় বাজার, খাবার এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা একজন পর্যটককে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা দিতে পারে। খুলনার সৌন্দর্য হয়ত বড় কোনো আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সৌন্দর্য অনেকটাই ছড়িয়ে আছে মানুষের প্রতিদিনের জীবনে। নদীর ধারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়াও একজন পর্যটকের কাছে একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।

পর্যটনের আসল শক্তি এখানেই। একজন পর্যটক কোনো জায়গায় শুধু দৃশ্য দেখতে যান না। তিনি সেই জায়গার মানুষকে দেখতে চান, খাবারের স্বাদ নিতে চান, সংস্কৃতিকে জানতে চান, স্থানীয় জীবনকে অনুভব করতে চান। সুন্দরবনকে বুঝতে হলে সুন্দরবনের আশপাশের জনপদকেও বুঝতে হবে। নদী ও নৌপথের সঙ্গে যারা যুক্ত, জেলে ও বনজীবী মানুষের জীবন, স্থানীয় বাজার ও খাদ্যসংস্কৃতি সবকিছু মিলিয়েই সুন্দরবনের পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। খুলনা সেই অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

খুলনাকে সুন্দরবন পর্যটনের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পর্যটক যদি শুধু সুন্দরবনে গিয়ে ফিরে না এসে খুলনায় এক বা দুই দিন অবস্থান করেন, তাহলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় খাবার ও বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় বাড়বে। পর্যটকের অবস্থানকাল বাড়লে পর্যটন ব্যয়ের একটি বড় অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে থেকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এ জন্য প্রয়োজন নতুন করে পর্যটন পরিকল্পনা করা। সুন্দরবনের প্রচারণায় খুলনাকে শুধু প্রবেশপথ হিসেবে দেখানো নয়, একটি স্বতন্ত্র গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে হবে। সুন্দরবন ভ্রমণের আগে বা পরে পর্যটকদের জন্য খুলনা শহরভিত্তিক ছোট ভ্রমণ প্যাকেজ তৈরি করা যেতে পারে। নদী ভ্রমণ, স্থানীয় খাবারের অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্যবাহী স্থান পরিদর্শন, স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা কিংবা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে এসব প্যাকেজের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। এতে পর্যটকের সময় যেমন বাড়বে, তেমনি খুলনার পর্যটন সম্ভাবনাও নতুনভাবে বিকশিত হবে।

তবে শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না। পর্যটকের সময়ের মূল্য দিতে হবে। একজন পর্যটক একটি শহরে কতক্ষণ থাকছেন, কী দেখছেন, কী খাচ্ছেন এবং কী অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, সেটিও পর্যটন উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। পর্যটককে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দ্রুত পাঠিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে, তাকে একটি অঞ্চলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সুন্দরবন ও খুলনাকে একসঙ্গে ভাবলে সেই সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আমাদের পর্যটন প্রচারণাতেও তাই পরিবর্তন প্রয়োজন। সুন্দরবনকে একক গন্তব্য হিসেবে প্রচার করার পাশাপাশি খুলনা, সুন্দরবন এবং দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য পর্যটন আকর্ষণকে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিট হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। এতে পর্যটকের ভ্রমণকাল বাড়বে এবং একই সঙ্গে একাধিক গন্তব্য উপভোগের সুযোগ তৈরি হবে।

সুন্দরবন আমাদের প্রকৃতির গল্প বলে। খুলনা সেই গল্পের সঙ্গে মানুষের জীবন, নদী, সংস্কৃতি ও জনপদের গল্প যুক্ত করে। একটি অঞ্চলকে শুধু তার দর্শনীয় স্থান দিয়ে চেনা যায় না, তার মানুষ ও জীবনযাত্রার মধ্য দিয়েও তাকে চিনতে হয়। সেই বিবেচনায় সুন্দরবন ও খুলনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

সুন্দরবন যদি হয় বাংলাদেশের প্রকৃতির বিস্ময়, তাহলে খুলনা সেই বিস্ময়ের দরজা। এখন প্রয়োজন দরজাটিকে শুধু প্রবেশপথ হিসেবে না দেখে নিজেই একটি গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা। সুন্দরবন দেখতে এসে খুলনায় একটু থামা, শহরটিকে দেখা, নদীর কাছে দাঁড়ানো, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া এবং মানুষের জীবনকে কাছ থেকে অনুভব করা পর্যটকের ভ্রমণকে আরও পূর্ণতা দিতে সুন্দরবন দেখে ফিরে আসা একটি ভ্রমণ হতে পারে, কিন্তু সুন্দরবনের সঙ্গে খুলনাকে দেখা একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ। কারণ প্রকৃত ভ্রমণ শুধু চোখকে আনন্দ দেয় না, একটি অঞ্চলকে জানার এবং অনুভব করার সুযোগও তৈরি করে।

লেখক : ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন