শিক্ষার্থী আজমুল হত্যাকাণ্ডের কারণ সন্ধানে গোয়েন্দারা

চারজন গ্রেপ্তার হলেও ধরা ছোঁয়ার বাহিরে মূল আসামি মেহেদী

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনার চাঞ্চল্যকর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মোঃ আজমুল হোসেন হত্যা মামলার রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। ভাত চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হত্যার কারণ ফলাওভাবে প্রচার করা হলেও এর পেছনে অন্য একটি কারণ রয়েছে। সেটি নিয়ে কাজ করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আত্মরক্ষায় ছাদ থেকে লাফিয়ে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কথা বলা হলেও এখনও তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনার দিন রাতে থাকা আশপাশের ভবনের কেউ এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মুখ খুলছে না। হত্যাকাণ্ডের ১২ দিন অতিবাহিত হলেও এ মামলায় ৪ জনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে পুলিশ। তবে মূল হোতা মেহেদী রয়েছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ আজমুল হোসেন চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা উপজেলার বড় শালুয়াা গ্রামের কৃষক কুতুবুদ্দিনের ছেলে।

হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে খুলনার একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, উচ্চতর শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত বছর বাড়ি থেকে বের হয়ে খুলনায় আসে আজমুল। খুবি’র পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেও সেখানে অকৃতকার্য হয় সে। এ বছর আবারও পরীক্ষায় অংশ নেয় কিন্ত সুযোগ পায়নি। বিষয়টি সে পরিবারের কাছে গোপন রাখে। এরপর খুলনা বিশ^বিদ্যলয়ের খাজা হল গেটে সংলগ্ন ইসলামাবাদ গলির একটি মেসের ম্যানেজার মেহেদীর সাথে পরিচয় হয় তার। মেহেদী গোপালগঞ্জ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। সে ওই ভবনের যাবতীয় দায়িত্বে ছিল।

সূত্রটি আরও জানায়, মেহেদী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে দেয় আজমুলকে। যেটা নিয়ে ওই মেসে বসবাস করতে থাকে। কিন্তু মেসের সকল শিক্ষার্থী তাকে খুবি’র ছাত্র হিসেবে মনে করত। ভুয়া আইডি কার্ড প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষাগত যোগ্যতা (সনদ) তৈরি করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা নেয়। বাবা-মা’র সাথে একের পর এক প্রতারণা করে টাকা নেওয়ার বিষয় তার বিবেককে তাড়া করে। এক পর্যায়ে মা-বাবাকে সব ঘটনা খুলে বলে। এর আগে সে সোনাডাঙ্গা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। পরিবারে ফিরে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে চাপ দেওয়া হয়।

সূত্রটি আরও জানায়, আজমুলের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত না দেওয়ার পরিকল্পনায় থাকে মেহেদী। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগে থাকে সে। প্রায় ওই মেস থেকে টাকা, মোবাইল, ভাতসহ বিভিন্ন জিনিস চুরি হতে থাকে। এ চুরির পেছনে তারও হাত ছিল। চুরির ঘটনায় মেসে থাকা অন্য শিক্ষার্থীদের আজমুলের বিরুদ্ধে প্রায় উসকে দিতে থাকে। এমনকি রাধুনীর ছেলেকে সাথে নিয়ে তাকে চুরির অপবাদ দিতে থাকে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অপবাদ দিতে থাকে। ঘটনার দিন রাতে ভাত চুরি হয়ে গেলে তার কথা বলতে থাকে।

সূত্রটি আরও জানায়, ঘটনার দিন রাতে ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে মেসে থাকা কয়েকজন বড় ভাই আজমুলের রুমে গিয়ে কয়েকটি চড়Ñথাপ্পড় মারতে থাকে। চোর ধরা পড়েছে এমন সংবাদে রাস্তায় থাকা সাধারণ মানুষও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। রুমের মধ্যে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় মেহেদী এবং গ্রেপ্তার চারজনসহ অনেকে ছাদে নিয়ে যায় তাকে। শুরু হয় নির্যাতন। রাত ১১টা থেকে শুরু করে ১ পর্যন্ত চলে অমানুষিক নির্যাতন। উঠে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা ছিল না তার। তবে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ঘটনাটি প্রচার করা হয়।

গতকাল বুধবার দুপুরের ওই মেসের খুবি’র এক শিক্ষার্থীর সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, হলে যে সব শিক্ষার্থীররা হলে সিট পায় না তারা মুলত খাজা হল গেট সংলগ্ন মসজিদ গলির সরোয়ারের বাড়ির মেসে ভাড়া করে থাকে। ওই ভবনে মেসে শতকরা ৯০ শতাংশ খুবি’র শিক্ষার্থীরা থাকেন। সেখানেও আজমুল খুবি’র আইডি কার্ড নিয়ে থাকত। কিন্তু সে যে খুবি’র শিক্ষার্থী ছিল না, এটা তার জানা ছিল না। তাছাড়া একতলার শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয়তলার শিক্ষার্থীদের খবর রাখতেন না। ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ঘটনার দিন বাবার চিকিৎসার জন্য ঢাকায় অবস্থান করছিলাম।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অজমুলের মেসের পাশে থাকা ভবনের দুরত্ব প্রায় ৬-৭ ফুট। যা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে লাফিয়ে পার হওয়া সম্ভব হয় নয়। তাছাড়া ভবনের ছাদে রয়েছে ৩-৪ ফুট উচু রেলিং। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার পর আজমুলের মরদেহ মেসের পাশে থাকা একটি ছোট ড্রেনের মধ্যে পড়েছিল বলে স্থানীয়রা জানায়।

মেসের রাধুনী ফাতেমা বেগমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মেসের তৃতীয় তলায় থাকা ১০ জনেরথ খাবার রান্না করি। ওই দিন ভাতের গামলা তিন তলা থেকে চতুর্থ তলায় আজমুলের ঘরে কিভাবে গেল তা তিনি জানি না। আশপাশের বাসিন্দাদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো কথা বলতে চাননি। তবে চুরির এবং চোর সন্দেহে আটক এক ব্যক্তিকে ধরে মারা হচ্ছে এমন খবর শুনে অনেকেই মারার জন্য এগিয়ে যায়।

হরিণটানা থানার অফিসার ইনচার্জ ইকবাল হোসেন বলেন, ভাত খাওয়া নিয়ে হত্যাকাণ্ডের মত একটা ঘটনা ঘটবে, এটা আমার বিশ^াস হচ্ছে না। এর পেছনে যে অন্য কোনো কারণ আছে, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। এ মামলার প্রধান আসামি মেহেদীকে খুঁজে পাওয়া গেলে হত্যার কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। চোর বলে আখ্যা দেওয়ায় ৩০-৩৫ জন আশপাশ থেকে এসে মারধোরে অংশ নেয়।

এছাড়া ওইদিন মূলত চারজনের নেতৃত্বে আজমুলকে রাতে ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে পিটিয়ে আহত করা হয়। ছাদ থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে, এটা নিশ্চিত। তবে তাকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেটা মেডিকেল রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, ১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রোড সংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি চারতলা ভবনের ছাদে ভাত চুরির অভিযোগ এনে আজমুলকে পেটানো হয়। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন