ঈদুল আযহা মুসলিমদের বৃহত্তম ঈদ উৎসব। প্রতিবছর আরবি জি¦লহজ্জ মাসের ১০ তারিখে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এই ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো পশু কোরবানি করা। যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়েছে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পশু কোরবানি করে। পরিবারসহ প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে মাংস ভাগাভাগি করে এই ঈদ উদ্যাপন করা হয়।
ধর্মীয় ও সামাজিক এই মেলবন্ধনের পাশাপাশি ঈদ বর্তমান সময়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশেষ করে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহাকে ঘিরে আমাদের পর্যটন খাতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। মা, মাটির টানে ঈদের বড় ছুটিতে মানুষ নিজ কর্মস্থল ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যায় ঈদ করতে। এতে একদিকে যেমন তাদের ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি হয় অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে আসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং কর্মজীবীদের কর্মস্থলে দীর্ঘ ছুটি থাকায় ঈদের দিন থেকেই শুরু হয় তাদের ঘোরাঘুরি। যা চলে ঈদের কয়েকদিন পর্যন্ত। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে যেসব ছোট-বড় পর্যটন স্থান রয়েছে সেসব জায়গা লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও চাঙ্গা হয়ে উঠে। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি এসব পর্যটন স্থান থেকে সরকারের রাজস্বের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। এতে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে। এজন্য সিলেট, কক্সবাজার, সুন্দরবনসহ দেশের বড় বড় পর্যটন স্থানের পাশাপাশি ছোট ছোট পর্যটন কেন্দ্রের দিকেও সুনজর দিতে হবে। সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ সার্বিকভাবে এসব জায়গাগুলো পর্যটকবান্ধব করে তুলতে হবে। তাহলে পর্যটন শিল্পের এ খাত আমাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।
সাম্প্রতিক সময়ে, ঈদ অর্থনীতিকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের বেশ অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের যেসব অঞ্চলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ হয়েছে সেসব অঞ্চল তুলনামূলকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হচ্ছে। আর তা স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র জাফলং, রাতারগুল, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, সেন্টমার্টিন, সাজেক, সুন্দরবনসহ সারাদেশে আরও অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব জায়গায় বছরজুড়ে মানুষ কমবেশি ভ্রমণ করে থাকে। তবে বছরের সরকারি ছুটি কিংবা ঈদ উৎসবে এসব পর্যটন কেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। সুন্দরবন কিংবা কক্সবাজারের মতো জায়গায় শুধু দেশি নয়; বিদেশি পর্যটকরাও ভ্রমণে আসে। এতে দিন দিন আমাদের রাজস্ব খাত শক্তিশালী হচ্ছে। এদিকে সম্প্রতি নতুন করে বেশকিছু পর্যটন কেন্দ্রকে ঘিরে মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রামের গুলিয়াখালী সি-বিচ, নেত্রকোণার আদর্শনগর হাওর পর্যটন কেন্দ্র এবং সুন্দরবনের কালাবগী ও আন্ধারমানিকে মানুষের যাতায়াত বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন এসব পর্যটন কেন্দ্রে মানুষ ঈদের ছুটিতে পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছে। ফলে এখানেও গড়ে উঠা হোটেল ব্যাবসা, রেস্তোরাঁ, পরিবহন খাত থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র হস্তশিল্প এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ব্যবসায়ীরাও ধীরে ধীরে এসব পর্যটন কেন্দ্রের সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে। অনেক জায়গায় এসব পর্যটন ঘিরে রিসোর্ট গড়ে উঠছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের আশপাশে বেশকিছূ রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে গিয়ে মানুষ সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকনের পাশাপাশি নিরাপদ থাকতে পারছে। অনেক সময় পর্যটকরা এখানে এসে স্থানীয়দের মাধ্যমে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং ফল সংগ্রহ করছে। এতে স্থানীয়দের আয় রোজগারের নতুন নতুন পথ খুলে যাচ্ছে। এজন্য পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন। যাতে আমরা সহজে এ খাতকে বিকশিত করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারি।
আমরা দেখেছি, বর্তমান সময়ে পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নানামুখী ব্যাবসার প্রসার ঘটছে। কোনো স্থানে পর্যটকরা গেলে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী পোশাক, খাবার এবং হস্তশিল্প বা কুটির শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন তাদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে এসব স্থানীয় সংস্কৃতি বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি পাচ্ছে। এজন্য বিশেষ করে আমাদের দেশে যারা পর্যটন কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সাথে জড়িত তাদেরকে সরকারি-বেসরকারিভাবে আরও সহযোগিতা করতে হবে। তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবে কিছুটা হতাশার কথা হলো, দেশের অনেক পর্যটন শিল্প হুমকির মুখে পড়তে চলেছে। বিশেষ করে সুন্দরবনসহ বড় বড় পর্যটনকেন্দ্রগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। পর্যটকদের প্লাস্টিক, পলিথিন বা অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য পরিবেশ বা জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি করছে। অনেক জায়গায় দালালদের দৌরাত্ম্য অনেক বেড়ে যাওয়ায় পর্যটকরা এসব স্থানে ঘুরতে এসে নানা হয়রানির শিকার হচ্ছে। আবাসিক হোটেল, বিনোদন কেন্দ্রের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতসহ নানা কার্যক্রমে তারা পর্যটকদের সাথে প্রতারণার ফাঁদ পেতে হাতিয়ে নিচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা। এছাড়া নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় ইচ্ছামতো সুযোগ নিচ্ছে কিছু ট্যুর অপারেটররা। এজন্য এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পর্যটক বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এসব বিষয়ে সরকারকে আরও সুনজর দিতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পর্যটন আমাদের দেশের অর্থনীতি এবং সুনামের বড় একটি মাধ্যম। মুষ্টিমেয় পর্যটকদের অসচেতনতা এবং কিছু অসাধু চক্রের জন্য দেশের সম্ভাবনাময় এই খাতকে ধ্বংস করতে দেওয়া যাবে না। তাই পর্যটন শিল্পের অগ্রগতিতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করার পাশাপাশি টুরিস্ট পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি, পর্যটকদের সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। একই সাথে আমরা যদি স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং সাধারণ মানুষদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারি তাহলে দেশের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আশা রাখা যায়।
লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।

