বুধবার । ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩

বৈশাখের বুকে লেখা এক প্রেম কাব্য কালবৈশাখি থেকে শান্ত বিকেল

মোঃ আসাদুজ্জামান সরদার

কালবৈশাখি ঝড়ের মতোই তুমি এসেছিলে জীবনে, আর আজ দুই বছর ধরে তুমিই আমার শান্ত বিকেল। হাতে হাত রেখে দুটি বছর পার করে দিলাম। বৈশাখের এই উৎসবে, নতুন বছরের হাত ধরে আমাদের ভালোবাসা পা রাখুক তৃতীয় বছরে। শুভ নববর্ষ, প্রিয়তমা।

আজ ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ইং। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্ন পহেলা বৈশাখ। কিন্তু আমার কাছে এই দিনটি কেবল পঞ্জিকার পাতা পরিবর্তনের উৎসব নয়, এটি আমাদের দুই বছরের এক অমর উপাখ্যানের জীবন্ত দলিল। শিরীষ আর কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় ঘেরা ক্যাম্পাসটি যেন নিজেই এক জীবন্ত কাব্যগ্রন্থ। আর সেই কাব্যের সবচেয়ে মায়াবী সর্গটি জুড়ে আছে হিমাদ্রি।

বিগত দুটি বছরের প্রতিটি ক্ষণ যেন বৈশাখি মেলার সেই রঙিন নাগরদোলার মতো আবর্তিত হয়েছে। ১৪ এপ্রিল, ২০২৪ রবিবার, সেই বিশেষ দিনটি থেকে আজ অবধি, সময় যেন তার নিজস্ব ছন্দে বয়ে চলেছে। হিমাদ্রি, যার নামের মধ্যেই রয়েছে পাহাড়ের স্নিগ্ধতা, হিমালয়ের শুভ্রতা আর গাম্ভীর্য, সে আজ সেজেছে পূর্ণ বৈশাখি সাজে। সে আমার জীবনে এসেছে বসন্তের শেষ আর গ্রীষ্মের শুরুর সেই সন্ধিক্ষণে, যখন প্রকৃতি নতুন সাজে সাজার অপেক্ষায় উন্মুখ থাকে। সে বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী, তাই তার কথাবার্তায়, চলায়-ফেরায় সবসময়ই একটা পরিশীলিত নান্দনিকতা খুঁজে পাই। রবীন্দ্রনাথের কবিতা কিংবা জীবনানন্দের বনলতা সেনের সেই ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ সবই যেন হিমাদ্রির উপস্থিতিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মনে পড়ে ১৪৩১ বঙ্গাব্দের শুরুর সেই বৈশাখি সকালের কথা। বিএল কলেজের পুকুর পাড় দিয়ে যখন সে হেঁটে যাচ্ছিল, তার লাল সাদা শাড়ির আঁচলটা বাতাসের দোলায় যেন সাহিত্যের কোনো এক ধ্রুপদী নায়িকার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। হাতে রেশমি চুড়ি আর পায়ে নূপুরের রিনঝিন শব্দ যেন কোনো এক অদৃশ্য তালের সঙ্গে সংগতি রেখে বাজছে। কপালে সেই ছোট কালো টিপ, যা তার চেহারায় এক মায়াবী স্নিগ্ধতা লেপে দিয়েছে। আজ সেই ক্ষণ থেকে গুনে গুনে সাতশ ত্রিশ (৭৩০) টি দিন পার হয়ে গেল। গত দুই বছরে হিমাদ্রি কেবল আমার প্রিয়তমা হয়ে থাকেনি, সে হয়ে উঠেছে আমার জীবনের ধ্রুবতারা। আমাদের গত দুই বছরের পথচলা যেন বৈশাখি মেলার সেই নাগরদোলার মতো কখনো উত্তেজনায় ভরপুর, কখনো আবার ধীরস্থির প্রশান্তিতে ঘেরা।

মনে পড়ে সেই প্রথম দিনের কথা, বিকেলে মেলায় গিয়ে যখন মেলার ভিড়ে আমরা প্রথম হাওয়াই মিঠাই ভাগ করে খেয়েছিলাম। সেই মাটির ঘোড়া, বাঁশির সুর আর হিমাদ্রির হাতের রেশমি চুড়ির শব্দ আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। বৈশাখের এই মেলার রং যেন আমাদের সম্পর্কেরই প্রতিচ্ছবি। জিলাপির সেই প্যাঁচালো রসালো মাধুর্য, মাটির ঘোড়া কেনা, মাটির সরাচিত্রের নিখুঁত আলপনা আর বাঁশির সেই করুণ অথচ মিষ্টি সুর এগুলো আমাদের ভালোবাসার স্মৃতি।

মাত্র দুটি বছর – শুনতে খুব কম মনে হলেও, আমাদের এই পথচলায় প্রতিটি দিন ছিল নতুন এক গল্পের সূচনা। কখনো কলেজের বকুলতলায় বসে দীর্ঘ আলাপ, কখনো আবার মেলার ভিড়ে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরা। হিমাদ্রির সেই অদ্ভুত হাসি আর দুষ্টুমিটা, অভিমান গুলোই আমার পৃথিবীটাকে রঙিন করে রেখেছে। সে যখন সাহিত্যের জটিল তত্ত্বগুলো সহজ করে বোঝায় কিংবা কোনো এক উদাস দুপুরে জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করে শোনায়, তখন মনে হয়— পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য যেন এই একটি মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ। রসায়নের জটিল বিক্রিয়ায় যেমন অনেক সময় নতুন কিছু সৃষ্টি হয়, আমাদের এই দুই বছরেও সৃষ্টি হয়েছে অগাধ বিশ্বাস আর মায়া। বিএল কলেজের রসায়ন ল্যাব থেকে বেরিয়ে যখন আমি তার অপেক্ষায় বকুলতলায় দাঁড়াই, তখন মনে হয় পৃথিবীর সব মৌল আর যৌগ একদিকে, আর হিমাদ্রির সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তের এনার্জি আরেক দিকে। বিএল কলেজের পুকুর পাড়, বকুলতলা আর কলেজ মাঠের সবুজ ঘাস আমাদের এই দুই বছরের ভালোবাসার নিঃশব্দ সাক্ষী।

আজ দুই বছর পূর্ণ হলো। এই দুই বছরে আমরা যেমন মেলার রঙিন আলো দেখেছি, তেমনি একে অপরের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হয়েছি। ভালোবাসা মানে তো কেবল পাশাপাশি হাঁটা নয়, ভালোবাসা মানে একে অপরের মনের গহিনের নীরবতাটুকুও বুঝে নেওয়া। মেলার সেই বাঁশির সুর আজও যেন কানে বাজে, যা আমাদের প্রথম পরিচয়ের সেই পবিত্র সুরটিকে বহন করে চলেছে।

বৈশাখ আসে নতুনের কেতন উড়িয়ে, আর আমাদের ভালোবাসা প্রতিবারই সেই নতুনত্বের আবহে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে। এটি আমাদের ভালোবাসার পুনর্জন্মের মাস, আমাদের হৃদয়ে নতুনের কেতন ওড়ানোর মাস। হিমাদ্রি, তোমার সঙ্গে কাটানো এই ৭৩০ টি দিন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয়। আগামী দিনগুলোতেও এভাবেই তোমার হাতের ওপর হাত রেখে ভৈরব নদের পাড় ধরে কিংবা কলেজের সেই চিরচেনা পথে হেঁটে যেতে চাই।

এই দুই বছরে কত শত বিকেল আমরা কাটিয়েছি খুলনার সব দর্শনীয় স্থান কিংবা নদীর তীরে সূর্যাস্ত দেখে। প্রতিটি বৈশাখ আমাদের জীবনে আসে নতুন এক প্রতিজ্ঞা নিয়ে। ২০২৪-এর সেই শুরু, ২০২৫-এর সেই প্রথম বর্ষপূর্তি, আর আজ ২০২৬-এর এই মাহেন্দ্রক্ষণ সবই যেন এক সুতোয় গাঁথা এক রঙিন মালা। আমাদের এই প্রেমের দুই বছর যেন কেবল দুটি বছরের সমষ্টি নয়, এটি সহস্র বছরের এক পুরোনো বিশ্বাসের নতুন রূপ।

শুভ দুই বছর পূর্ণতা, আমার প্রিয় হিমাদ্রি। ১৪ এপ্রিল ২০২৪ থেকে শুরু হওয়া এই যে বর্ণিল যাত্রা, তা যেন আজীবনের তরে এভাবেই প্রবহমান থাকে। বিএল কলেজের প্রতিটি ধূলিকণা আর বৈশাখি মেলার প্রতিটি রঙিন আলো আমাদের এই শাশ্বত প্রেমের সাক্ষী হয়ে থাকুক। আমাদের এই ভালোবাসার গল্প যেন বাংলা সাহিত্যের কোনো এক অমর কাব্যের মতো অক্ষয় হয়ে থাকে। বৈশাখ আসবে, বারবার, মেলা বসবে প্রতি বছর, আর আমাদের ভালোবাসা যেন প্রতিবারই নতুনের আবাহনে আরও সতেজ, আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন