বন্ধ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, কদিন বাদেই মুসলিমদের সর্ববৃহৎ উৎসব ঈদুল ফিতর। আনন্দ ও উৎসবের আমেজ এখন শহর থেকে গ্রাম সবখানে। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ইতোমধ্যেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) ছেড়েছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। চিরচেনা সেই কোলাহল নেই, নেই ক্যাফেটেরিয়ার আড্ডা কিংবা হাদী চত্বর দিয়ে গাড়ির মিছিল। তপ্ত দুপুরের রোদে খা খা করছে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ এবং প্রশাসনিক ভবন এলাকা। যে ক্যাম্পাস সবসময় মুখরিত থাকত কয়েক হাজার প্রাণের স্পন্দনে, সেই বিশাল ক্যাম্পাসে এখন শুধুই নীরবতা।
কোলাহল বিহীন ক্যাম্পাসেও বিরাম নেই একদল মানুষের। যখন সবাই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট থেকে শুরু করে হাদি চত্বর, অদম্য বাংলা, হল থেকে হলের করিডোর, একাডেমিক ভবন ও প্রশাসনিক ভবন সব জায়গায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে থাকেন তারা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী, মালি ও আনসার সদস্য। ক্যাম্পাসের সবার কাছে যারা গার্ডমামা বা ভাই-মামা হিসেবে পরিচিত।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মচারীদের সবাই একসঙ্গে ছুটিতে যেতে পারেন না। এক ঈদে যারা বাড়ি যান, অন্য ঈদে তাদের থাকতে হয় ক্যাম্পাসের পাহারায়। যদিও ছুটি নিলে আবার ডিউটি করতে হয় ছুটির দিনের। এই নিয়মকে মেনে নিয়েই তারা আগলে রাখছেন পুরো ক্যাম্পাসকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার জন্য সর্বমোট ১০৮ জন নিরাপত্তারক্ষী রয়েছেন। এর মধ্যে অফিসিয়ালি কাউকে ছুটি দেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে দায়িত্বরত এক নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গে কথা বলতেই বিষণ্ন হাসি দিয়ে তিনি বলেন, মামা, আমরা মুসলমান, আমাদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের দিন ঈদের দিন। কিন্তু কি করব, কিছু করার নেই। এই ক্যাম্পাসে যারা পড়েন, তারাও আমার ছেলে-মেয়ের মতো। আমার একটি ছেলে মারা যায় ১১ বছর বয়সে পানিতে ডুবে। আমার ছেলে বেঁচে থাকার সময় আমি একবারও তার হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে যেতে পারিনি। তারপরও দায়িত্বের জায়গা থেকে সবকিছু মেনে নিয়ে চলতে হয়। শেষ কবে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সর্বশেষ গত বছর পরিবারের সঙ্গে ঈদ করেছি, তাও ৮ বছর পর। তারপরও আফসোস নেই; যেখানে চাকরি করি, এখানেও দেখাশোনা করা আমার বড় দায়িত্ব।
হাদি চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা এক গার্ড সদস্য জানান, ঈদের দিন সকালে যখন দেখি পুরো ক্যাম্পাস খালি, তখন মনটা খারাপ হয় ঠিকই। কিন্তু স্যাররা যখন এসে ঈদের শুভেচ্ছা জানান বা ভালো-মন্দের খোঁজ নেন, তখন মনে একটু ভালো লাগা কাজ করে। তারপরও চাঁপা কষ্ট থেকে যায়।
ঈদে ক্যাম্পাস শূন্য হয়ে যাওয়ার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে বিভিন্ন ল্যাবরেটরি, আবাসিক হল এবং গুরুত্বপূর্ণ অফিসগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তাদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। রাতভর টর্চ হাতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ঘিঞ্জি জায়গা থেকে শুরু করে মেইনগেট পর্যন্ত টহল দেন তারা। সবার ঈদের আনন্দ যখন শুরু হয়, তাদের দায়িত্ব তখন দ্বিগুণ হয়ে যায়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. মো. নাজমুস সাদাত জানান, ঈদে যারা বাড়ি যেতে পারেননি, তাদের জন্য উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়। ইতোমধ্যেই সকল ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এছাড়াও আমরা ঈদের দিন তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেই, তাঁদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করি। এই নিরাপত্তাকর্মীদের ত্যাগ ছাড়া একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল ক্যাম্পাস কল্পনা করা অসম্ভব। তাদের জন্য আমরা সবসময় আন্তরিক।
সবাই যখন ঈদের সেমাই-পায়েস আর নতুন পোশাকে উৎসবে মগ্ন, তখন খুবির এই প্রহরীরা হয়তো মোবাইলে থাকা পরিবারের ছবির দিকে তাকিয়েই খুঁজে নেন ঈদের সার্থকতা। তাদের এই নিঃস্বার্থ পাহারায় নিরাপদ থাকে সবুজ এই বিদ্যাপিঠ।
খুলনা গেজেট/এনএম

