সোমবার । ২৫শে মে, ২০২৬ । ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ওয়াসার ২৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক হতে দ্বন্দ্বে দুই প্রকৌশলী

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২ এর পরিচালক হতে রীতিমতো স্নায়ু যুদ্ধ শুরু করেছে খুলনা ওয়াসার দুই নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম ও মোঃ কামাল হোসেন। দু’জনই ওই পদের অযোগ্য হওয়ায় রাজনৈতিক তদবির করে তাদের ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সম্মত করেন। এরপর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তারা দু’জন। তাদের পক্ষে ওয়াসার কর্মচারীরাও দুই ভাগ হয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষাদাগারে মেতে উঠেছেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম ও কামাল হোসেনের বিপক্ষে অভিযোগের পাহাড় জমে যায় মন্ত্রণালয়ে। প্রাথমিক তদন্তে এগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। এরপর শুরু হয় একে অন্যকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ। গতবছর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে এক অতিরিক্ত সচিব মন্তব্য করেন, ‘প্রকল্প শুরু হওয়ার আগে পিডি নিয়োগ নিয়ে এতো সংবাদ এর আগে কখনও হয়নি।’ তখন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মাধ্যমে দু’জনকেই মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়।

ওয়াসা থেকে জানা গেছে, ২০১১ সালে পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় মধুমতি নদী থেকে পানি এনে পরিশোধনের মাধ্যমে নগরীতে সরবরাহ করার উদ্যোগ নেয় ওয়াসা। ২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের ৩০ জুন। প্রকল্পের আওতায় বাগেরহাটের মোল্লারহাটে মধুমতী নদীর তীরে দৈনিক ১১ কোটি লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশালাকার ওয়াটার ইনটেক ফ্যাসিলিটি এবং পাম্প হাউস নির্মাণ করা হয়। মোল্লারহাটের ইনটেক পয়েন্ট থেকে রূপসার শোধনাগার পর্যন্ত পানি আনার জন্য প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করা হয়।

একই সঙ্গে রূপসার সামন্তসেনায় দৈনিক ১১ কোটি লিটার পানি শোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বয়ংক্রিয় ও আধুনিক সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়। শোধনাগার থেকে পরিশোধিত বিশুদ্ধ পানি রূপসা নদী পার করে খুলনা শহরের রিজার্ভারগুলোতে নেওয়ার জন্য ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান সরবরাহ লাইন তৈরি করা হয়। নগরীর বিভিন্ন জোনে পানি ধরে রাখা এবং তা সমবণ্টনের জন্য ১০টি নতুন ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার এবং ১০টি নতুন ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণ করা হয়। মহানগরীর অভ্যন্তরে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন বিতরণ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। সেই সাথে গ্রাহক পর্যায়ে পানির অপচয় রোধে কয়েক হাজার বাড়িতে ডিজিটাল মিটারসহ পানির সংযোগ দেওয়া হয়।

প্রথম প্রকল্পের মধ্যেই নগরীর বাকি এলাকায় দ্বিতীয় প্রকল্প নেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। সেই আলোকে ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২।

প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে রূপসার সামন্তসেনায় অবস্থিত শোধনাগারের পানি শোধন ক্ষমতা দৈনিক ১১ কোটি লিটার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ১৩ কোটি লিটারে উন্নীত করা হবে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জরুরি ব্যবহারের জন্য ওই প্ল্যান্টে নতুন করে আরও সাড়ে ৩৮ কোটি লিটার ধারণক্ষমতার একটি বিশালাকার পানির রিজার্ভার তৈরি করা হবে। এছাড়া শহরের আফিল গেটে অবস্থিত ছোট শোধনাগার প্ল্যান্টটির দৈনিক সক্ষমতা ৫৫ লাখ লিটার থেকে বৃদ্ধি করে ২ কোটি লিটারে উন্নীত করা হবে।

খুলনা মহানগরীর বর্তমান পাইপলাইন বঞ্চিত এলাকায় পানি পৌঁছে দিতে আরও ২৫৮ কিলোমিটার নতুন বিতরণ পাইপলাইন মাটির নিচে স্থাপন করা হবে। পানি ধরে রাখা ও উচ্চচাপ বজায় রাখার জন্য নগরীর বিভিন্ন জোনে আরও ৪টি নতুন ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার এবং ৪টি উঁচু ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণ করা হবে এবং নতুন ২৫ হাজার ৮০০টি বাড়িতে ডিজিটাল মিটারসহ সুপেয় পানির সংযোগ দেওয়া হবে। এই প্রকল্পের পরিচালক হতেই যতো দৌড়ঝাপ এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা।

সূত্র জানায়, প্রকল্প তৈরির সময় বিষয়টি তদারকি করেছেন প্রথম প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ও ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদ। তিনি বর্তমানে পয়ঃ নিষ্কাশন প্রকল্পের পরিচালক। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী একই ব্যক্তির বড় দুটি প্রকল্পের পরিচালক হওয়ার সুযোগ নেই।

তারপরও তিনি যাতে পরিচালক হতে না পারেন, এজন্য তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে বেনামি চিঠি পাঠাতে শুরু করেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। সেই চিঠির উদ্বৃদ্ধি দিয়ে একাধিক সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রচারেরও ব্যবস্থা করেন তিনি। খান সেলিম দ্বিতীয় প্রকল্পের পরিচালক হবেন না, এই নিশ্চয়তার পর সেই তৎপরতা বন্ধ হয়।

সূত্র জানায়, পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রথম ফেজে কর্মরত ছিলেন আরেক নির্বাহী মোঃ কামাল হোসেন। রেজাউল ইসলামের এই কাজে অভিজ্ঞতা ছিল না। তখন দু’জনই প্রকল্পের দায়িত্ব পেতে তদবির শুরু করেন। পাশাপাশি আগের প্রকল্পের ব্যর্থতা তুলে ধরে কামালের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকায় এনসিপি নেতাদের ব্যবহার করে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব পান রেজাউল ইসলাম।

তখন রেজাউল ইসলামের বিপক্ষেও নানা অভিযোগ তুলে বেনামি চিঠি দেওয়া হয় শুরু হয়। একই ধরনের সংবাদ হতে থাকে বিভিন্ন পত্রিকায়। একপর্যায়ে গত ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক আশরাফুল আফসার স্বাক্ষরিত পত্রে রেজাউল ইসলামকেও ওই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

সূত্রটি জানায়, রেজাউল ইসলাম ওয়াসায় নিয়োগ পান ২০১০ সালে। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য হিসেবে আইইবি নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে মোঃ কামাল হোসেন নিয়োগ পান পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রকৌশলী হিসেবে। পরে ২০২০ সালে তাকে ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই হিসেবে রেজাউল ইসলাম জ্যেষ্ঠ হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলায় দ্রুত পূর্ণ পিডি নিয়োগের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। গত ২০ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহীদুল হাসানের সভাপতিত্বে ওয়াসার ৪ কর্মকর্তার মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৪ জন কর্মকর্তাকে পাঠাতে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দেন সচিব। সেই নির্দেশনার আলোকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদ, নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম, মোঃ কামাল হোসেন ও মোঃ আরমান সিদ্দিকী। খান সেলিম আহমেদ আগে থেকেই অনিচ্ছুক হওয়ায় পিডি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন রেজাউল ইসলাম ও মোঃ কামাল হোসেন। এরপর থেকে শুরু হয়েছে সেই পুরানো কাঁদা ছোড়াছুড়ি।

এ ব্যাপারে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ফিরোজ শাহ বলেন, সার্বিক বিষয় নিয়ে আমরা বিব্রত। এখন মন্ত্রণালয়ের ওপর সব ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তারা যেটা ভালো বুজবেন করবেন।

রেজাউল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ ধরনের কোনো কর্মকান্ডের সঙ্গে আমি জড়িত নই। কামাল হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন