ডেঙ্গুর হটস্পট খুলনা, একমাসে ১২ মৃত্যু

মোহাম্মদ মিলন

উপকূলীয় শিল্পনগরী খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। শয্যা খালি না থাকায় মেঝেতেই সেবা গ্রহণ করতে হচ্ছে রোগীদের।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) নানা উদ্যোগ, ওষুধ ছিটানো ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও বাস্তবে কমছে না এডিস মশার উপদ্রব। সংক্রমণের তীব্রতা বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি বাসা-বাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়েছে কেসিসি ও স্বাস্থ্য বিভাগ। নগরীর ১০টি ওয়ার্ডকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠে তৎপর রয়েছে রাজনৈতিক দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোও।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২০৯ জন এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে ৩৭ জনসহ মোট ২৪৬ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। জেলাভিত্তিক হিসেবে খুলনা জেলাতেই সর্বোচ্চ ১১৬ জন (সরকারি ৭৯ ও বেসরকারি ৩৭) নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ৪৬ জন। অন্যান্য জেলার মধ্যে যশোরে ২৩, সাতক্ষীরা জেলা ও মেডিকেল কলেজসহ ২০, বাগেরহাটে ১৬, নড়াইলে ৭, ঝিনাইদহে ৭, কুষ্টিয়ায় ৫, মেহেরপুরে ৩ এবং মাগুরায় ৩ জন রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে চুয়াডাঙ্গায় নতুন কোনো রোগী ভর্তি হননি।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন জানান, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়িয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৪ জনে। এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫ হাজার ১৮৮ জন এবং মোট মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ৭৩৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছর খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ২০ জনের মধ্যে খুলনায়ই ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বাগেরহাটের একজন মারা গেছে। ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে ৮ জনের মৃত্যু হলেও শুধু আগস্ট মাসেই মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের। বিভাগের সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন এই বিশেষায়িত হাসপাতালে। এখানে এ পর্যন্ত সর্বমোট ১ হাজার ৪৩৫ জন ভর্তি হয়েছেন, যার মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ১৮১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। রোগীর চাপ এতটাই বেশি, নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ড ছাড়িয়ে বারান্দা, মেঝে ও করিডোরে বেড পেতে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পেডিয়াট্রিক (শিশু) ওয়ার্ডে শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকরা। শুধু সরকারি হাসপাতালই নয়, শয্যা মিলছে না বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও।

খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ম্যানেজার মো. হামিদুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালে ডেডিকেটেড ১৫টি বেড থাকলেও বর্তমানে চারগুণের বেশি অর্থাৎ ৫২ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। সংকটকালীন বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কেবিনে তাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

খুলনার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ম্যানেজার মো. হোসেন আলী জানান, ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেক বেশি হওয়ায় বর্তমানে হাসপাতালে সিঙ্গেল বেড দেওয়ার অবস্থা নেই। সেখানে বর্তমানে ৬০ জন রোগী ভর্তি রয়েছে।
খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আইসোলেশন ইউনিটে অন্তত ৫টি করে শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নরমাল স্যালাইন, খাওয়ার স্যালাইন, প্যারাসিটামলসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং মশারির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। উপজেলা ও জেলা সদর হাসপাতালে কিট পর্যাপ্ত রয়েছে। কেসিসির সঙ্গে সমন্বয় করে মহানগরের ১৭, ২২ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বিশেষ সচেতনতা ও বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে।

খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. হিমেল ঘোষ বলেন, বর্ষা এবং বর্ষার শেষে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। আগে এডিস মশা শুধু দিনে কামড়ালেও বর্তমানে রাত-দিন সমানভাবে কামড়াচ্ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমতে পারে।

খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. শওকত আলী বলেন, এখন এডিস মশা শুধু স্বচ্ছ পানিতেই নয়, ময়লাযুক্ত পানিতেও বংশ বিস্তার করছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ ও মেডিকেল টিম গঠন করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

এদিকে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে মাঠে দেখা যাচ্ছে। খুলনাকে ‘মহামারি এলাকা’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে খুলনা মহানগর বিএনপি। বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন ড্যাব, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল মশক নিধন ওষুধ ছিটানো, লিফলেট বিতরণ, বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ ম্যাচিং ও সেবাকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন কাজ করছে। মশক নিধনের পাশাপাশি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহযোগিতায় রোগীদের চিকিৎসার কাজও বিনামূল্যে করা হচ্ছে। এজন্য আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসক পরামর্শ, অবস্থা বুঝে ওষুধ সরবরাহ ও সার্বক্ষণিক আপডেট রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মহানগরের প্রতিটি আক্রান্ত থানা এলাকায় কমপক্ষে একটি ৫০ শয্যার কেন্দ্রীয় সেবাকেন্দ্র এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুযায়ী বড় ওয়ার্ডে ২০ শয্যা ও ছোট দুটি ওয়ার্ড মিলে সমমানের সেবাকেন্দ্র প্রস্তুতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সেন্টারে চিকিৎসক, স্বাস্থ্য সহকারী, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, রক্তের গ্রুপ ম্যাচিং সুবিধাসহ ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে হটলাইন নম্বর টাঙানো থাকবে এবং স্বেচ্ছাসেবী দল সার্বক্ষণিক কাজ করবে। সার্বিক তদারকিতে গঠিত পর্ষদের প্রধান উপদেষ্টা করা হয়েছে সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এমপিকে।

অন্যদিকে, আড়ংঘাটা থানা জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে গত সোমবার ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। খুলনা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পথ। ওয়ার্ড পর্যায়ে সমাজকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসে নগরবাসীর পাশে দাঁড়াতে হবে।

সংক্রমণ ও লার্ভার ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে কেসিসি নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডকে তিনটি জোনে ভাগ করেছে। রেড জোন হিসেবে ঘোষিত ১০টি ওয়ার্ড হলো-১৭, ১৮, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০। অতিসংক্রামক ওয়ার্ড ১, ১৯, ২৬ ও ৩০ এবং মৃদু আক্রান্ত ওয়ার্ড ২, ১০ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড। এছাড়া ১৭, ২২ ও ৩০ নং ওয়ার্ডে কেসিসির ফ্রি ক্যাম্পে নাপা ট্যাবলেট ও স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া মশার লার্ভা নিধন অভিযান সফল করতে বিদ্যমান লোকবলের পাশাপাশি ৩১টি ওয়ার্ডে অতিরিক্ত ৫জন স্প্রেম্যান নিযুক্ত করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা প্রতিটি ওয়ার্ডের ড্রেনসহ সকল জলাবদ্ধ পানিতে এবং বাড়ির অভ্যন্তরিন ড্রেনসমুহে মশার লার্ভা ধ্বংসে ওষুধ ছিটানোর কাজ করবে। নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে একযোগে এ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে এবং চলতি মাস জুড়ে এ কার্যক্রম চলমান থাকবে।

এদিকে মঙ্গলবার থেকে মশার লার্ভা নিধন অভিযান শুরু করা হয়েছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু সকাল সাড়ে ৯টায় নগরীর টুটপাড়া কবরস্থান মোড়ে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে লার্ভা নিধন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শামিউল ইসলাম জানান, পর্যাপ্ত নাপা ও স্যালাইন মজুত রয়েছে। মশক নিধনে ৩টি উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটি সকালে ‘অ্যাবেট’ স্প্রে ও বিকেলে ফগিং করছে এবং লার্ভা পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা- কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। তবে কেসিসির পাশাপাশি নগরবাসীকেও নিজ নিজ আঙিনা, টব ও ছাদ পরিষ্কার রেখে লার্ভামুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে।




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন