সন্ন্যাসীর চুরি এবার বোচকায় ধরা পড়েছে। এতদিন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, খুলনা -১ এর রাঘব বোয়ালরা আড়ালে আবডালে সবকিছু সাবাড় করে কোটি কোটি টাকার পাহাড় জমাচ্ছিল, তার কিঞ্চিৎ ধরা পড়ায় এবার থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে।
ঘটনাটি খুলনায় দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ান, ডুমুরিয়া উপজেলার পশ্চিম অঞ্চলের। ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরা ঘোনা ইউনিয়নের আরশ নগরের। পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা ১ এর অধীন ডুমুরিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৭/১ পোল্ডারের এক নম্বর গোলাপদহ স্লুইজ গেটের অভ্যন্তরে প্রায় ৩০ বিঘা সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করে দখলদারদের সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ড গোপন বোঝাপড়ার মাধ্যমে সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে কুপকাত করে একশ্রেণীর লোভী কর্মকর্তা এবং অবৈধ দখলদাররা যুগ যুগ ধরে লাভবান হচ্ছে।
আওয়ামী শাসনামলের ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ সম্পত্তি যোগসাজশে ওই বিভাগের রাঘব বোয়ালরা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী দুর্বৃত্তরা ভোগ দখল করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করছে। সরকারের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এসব কর্মকাণ্ড যুগের পর যুগ চলে আসছে। অতি সম্প্রতি স্থানীয় এক দৈনিকে গত ৮ মে ২০২৬ সংবাদটি সেকেন্ড লিড নিউজ আকারে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বক্স আইটেমে প্রকাশিত হয়েছে। ইনভেস্টিগেটিভ এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মিঃ উজ্জ্বল কুমার সেন একটু নড়েচড়ে বসেছেন। পিলে চমকানো এ খবর ফাঁস হয়ে পড়ায় ওই প্রকৌশলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, ডিজে বিড়ালের মতো আমতা আমতা করে বলেছেন, “বিষয়টি এতদিন আমার জানা ছিল না। খোঁজখবর নিয়ে তদন্ত করা হবে। সরকারি জমি চিহ্নিত করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
ডুমুরিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩০ বিঘা সরকারি জমি বছরের পর বছর অবৈধভাবে দখল করে একশ্রেণীর প্রভাবশালী দুর্বৃত্তরা টাকার পাহাড় জমাচ্ছে অথচ ওই বিভাগের সকল শ্রেণির কর্মচারী যুগের পর যুগ কুম্ভ ঘুমে মগ্ন রয়েছেন। বেতন খাচ্ছেন তথাকথিত দায়িত্ব পালন করছেন নামকাওয়াস্তে। যায় যাবে সরকারের, তাতে তাদের কী! বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
পুরো ঘটনাটা খুলে বলা দরকার। খুলনার জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া মাগুরাঘোনাসহ সমগ্র ডুমুরিয়া উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাজার হাজার বিঘা সম্পত্তি বারো ভূতের খোরাক হচ্ছে অথচ এ ধরনের অনিয়ম দেখার কেউ নেই! হাজার হাজার কোটি টাকা যুগের পর যুগ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক শ্রেণির কর্মচারী এবং স্থানীয় লুটেরা দুর্বৃত্তরা যোগসাজশে ব্যবহার করে লাভবান হলেও সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সহযোগী দৈনিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৩০ বিঘা সরকারি জমি অবৈধভাবে যুগের পর যুগ দখল করে সরকারের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মৎস্য ঘের করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন সরকারি জমি দখলে রেখে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে মাছ চাষ করায় সরকারি ওই সম্পত্তি থেকে সরকার একটি কানা কড়িও পায়নি বরং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অবৈধ দখলদার চৌধুরী অছিয়ার রহমান ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরাঘোনা ইউনিয়নের আরশনগর ওয়ার্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। অছিয়ার রহমান চৌধুরী প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা হামিদুর রহমান চৌধুরীর কনিষ্ঠ সহোদর। স্থানীয় এলাকাবাসিরা বলেছেন, পতিত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক শ্রেণির কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ করে প্রভাব খাটিয়ে ওই চৌধুরী হামিদুর রহমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরকারি জমি রাতারাতি একচেটিয়াভাবে নিজের দখলে নেন এবং তিরিশ বিঘা জমিতে নিজস্ব সম্পত্তির মতো কোনো বাধা ছাড়াই স্বাধীনভাবে মৎস্যঘের গড়ে তোলেন। তার আকস্মিক মৃত্যুর পর ঐ ৩০ বিঘা জমি দখল বহাল রেখেছেন তারই প্রভাবশালী কনিষ্ঠ ভ্রাতা অছিয়ার রহমান চৌধুরী।
স্থানীয় সূত্রে প্রকাশ, ডুমুরিয়া উপজেলার পশ্চিম এলাকার আটলিয়া ইউনিয়নের বয়ার সিং মৌজার আমতলা তালতলা ও সালতা নদীর তীরবর্তী বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৭/১ নম্বর পোল্ডারের এক নম্বর গোলাপ দহ স্লুইস গেটের অভ্যন্তরে অবস্থিত প্রায় ৩০ বিঘা সরকারি জমিতে অবৈধভাবে ঘের ভেড়ি নির্মাণ করে বছরের পর বছর বাধাহীনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, যুগের পর যুগ দীর্ঘকাল সরকারি জমি প্রভাবশালী এই ব্যক্তির অবৈধ দখলে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সবকিছু জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বা প্রভাবশালীর গ্রাস থেকে সরকারি জমি দখলের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অনেকে মনে করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের একশ্রেণীর কর্তার সাথে যোগসাজশ থাকার কারণে অলিখিত চুক্তিতে অবৈধ দখলদার এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে পুরো নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে।
পর্যবেক্ষক মহলের বক্তব্য, এভাবে সরকারি সম্পত্তি জবর দখলের শিকার শুধু আঁটলিয়া ইউনিয়নে নয়, ডুমুরিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নে, শোভনা ইউনিয়নে, গুটুদিয়া ইউনিয়নে, মাগুরখালী-ভাণ্ডার পাড়া, সরাফপুর এবং সাহস ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার একর জমি সরকারি দখলে না থাকায় বেহাত হতে চলেছে। বছরের পর বছর সরকারি জমি অবৈধ দখলদারদের হাতে থাকলেও কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা না থাকায় তা এখন ব্যক্তি বিশেষের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে একদিকে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে স্থানীয় জনমনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে। তাদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবার ধারণা পানি উন্নয়ন বোর্ড অবৈধ দখলদারদের সাথে গোপন চুক্তি না থাকলে অদ্যাবধি কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না?
স্থানীয় জনগণ অভিযোগ করেছেন, অবৈধ ভাবে পানি আটকে রাখার ফলে সরকারি ওয়াপদা সড়কে বেড়িবাধ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে পানির চাপে সরকারি রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এ ধরনের অবৈধ ঘের ব্যাবসা চলতে থাকলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রাস্তার উপর পানির চাপের ফলে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধিসহ বাঁধ হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে অবৈধ ঘের মালিকের সাথে কথা বললে, তিনি জানান, আমার ঘেরের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের হয়ত কিছু জমি রয়েছে, তবে কী পরিমাণ জমি আছে তা তিনি স্পষ্ট করে বলেননি। হাল আরএস রেকর্ডে আমাদের জমি কম দেখানো হয়েছে তাই আদালতে মামলা করেছি। তার দাবি, আমি শুধু নই এলাকার স্বপন সরদার , বিষ্ণু মাস্টার, গোলক মন্ডল সহ বহু সংখ্যক ব্যক্তি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরকারি জমি দখল করে আছেন।
অপ্রিয় হলেও সত্য কথা, খুলনার জিরো পয়েন্ট থেকে খর্নিয়া হয়ে চুকনগর পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে ভিতরে শ’শ’একর জমি ভূমি দস্যু স্বার্থান্বেষী মহল দখল করে রেখেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় দুঃসাহস স্পর্ধা দেখিয়ে কোনো বৈধতা ছাড়াই, কীভাবে বছরের পর বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরকারি জমি গ্রাস করে, সেটাই এখন জন জিজ্ঞাসা।
বলা বাহুল্য, ডুমুরিয়া উপজেলা সদরে অনেক বহুতল ভবন কোনো প্রকার বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই নির্মাণ করে ব্যাবসা-বাণিজ্য অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় করে ওইসব ভূমি খেকোরা ভোগ দখল করছে।
এ ব্যাপারে না পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ, না সরকারি প্রশাসন কেউই উচ্চবাচ্য করছে না। পর্যবেক্ষক মহলের জিজ্ঞাসা, এভাবে যদি সরকারি ভূমি প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দস্যুরা গ্রাস করে তা’ এলাকার সাধারণ জনমনে আইনের প্রতি সামাজিক সাম্য বিধি-বিধানের প্রতি যে কোনো মুহূর্তে আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কুম্ভ ঘুম ভেঙে আশা করবো, জমি খেয়ো ভূমি দস্যুদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার সম্পদ দখলে নেবেন। প্রশাসন যত দ্রুত এই কাজগুলো করবে, জল মনে ততই সন্তুষ্টি ফিরে আসবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
খুলনা গেজেট/এনএম

