বুধবার । ২৭শে মে, ২০২৬ । ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

পরিবেশ রক্ষার্থে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করা নাগরিক দায়িত্ব

মোঃ রমজান আলী

ঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। ত্যাগের মহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে পশু কোরবানি করেন। কিন্তু এই আনন্দ ও ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোরবানির বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা। সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের অভাবে কোরবানির পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও অন্যান্য বর্জ্য যত্রতত্র পড়ে থাকলে পরিবেশ দূষিত হয়, সৃষ্টি হয় দুর্গন্ধ, ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন রোগজীবাণু। তাই কোরবানির বর্জ্য দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা শুধু সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। কোরবানি মূলত পবিত্রতা ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। ইসলাম কখনো অপরিচ্ছন্নতা সমর্থন করে না। বরং ইসলামে পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ বলা হয়েছে। তাই কোরবানির পর পরিবেশ নোংরা রেখে দেওয়ার মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার কোনো প্রতিফলন নেই। পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে কোরবানি সম্পন্ন করাই প্রকৃত ধর্মীয় দায়িত্ববোধের পরিচয়।

এ বছর কোরবানির জন্য এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশুর সরবরাহ পাওয়া যাবে। সারা দেশে সাড়ে তিন হাজারের বেশি হাটে এসব পশু বিক্রি হবে। তবে চাহিদা রয়েছে এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি পশুর। চাহিদার তুলনায় কোরবানিযোগ্য পশুর প্রাপ্যতা রয়েছে। ফলে এবার কোরবানির পশুর সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। এ বছর সম্ভাব্য চাহিদার বিপরীতে ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। ফলে কোরবানির পশুর কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। এবার কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী। এবার সারা দেশে তিন হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। হাট ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সাদা পোশাকেও সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্তবর্তী পশুর হাট বন্ধের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। অতীতে সীমান্তঘেঁষা কিছু হাটের মাধ্যমে বিদেশি পশু প্রবেশ করত। এতে দেশীয় খামারিরা ক্ষতির সম্মুখীন হন। এ পরিস্থিতি বন্ধে সীমান্ত এলাকায় হাট না বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানির সময় অনলাইনে পশু বিক্রি হবে। এ জন্য কোনো খাজনা নেওয়া হবে না। এছাড়া, কোরবানির পশুর চামড়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাই এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রতি বছর ঈদুল আযহার সময় দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিপুল সংখ্যক পশু কোরবানি করা হয়। এতে প্রচুর বর্জ্য তৈরি হয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও খুলনাসহ বড় শহরগুলোতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার টন বর্জ্য জমে যায়। যদি এসব বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করা না হয়, তাহলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টির পানির সাথে মিশে এসব বর্জ্য ড্রেন ও খালে প্রবাহিত হলে পানি দূষিত হয়, সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। একই সাথে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পায়, যা ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ নানা রোগ ছড়িয়ে দেয়।

পরিবেশবিদদের মতে, কোরবানির বর্জ্য থেকে নির্গত দুর্গন্ধ ও জীবাণু শুধু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত করে। তাই নাগরিক সচেতনতা ছাড়া শুধু সরকারি উদ্যোগ দিয়ে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়।

পরিবেশ সুরক্ষা আজ বিশ্বব্যাপী একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের এ সময়ে ছোট ছোট সচেতনতাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কোরবানির সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ যেন পরিবেশ দূষণের কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এলাকার লোকজন যত্রতত্র কোরবানি না দিয়ে কয়েকজন মিলে একই স্থানে কোরবানি দিলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হয়। বর্জ্য অপসারণ বা মাংস বিতরণে পরিবেশসম্মত ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাই যাতে না ছড়ায় তার জন্য কোরবানির স্থানে ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক ওষুধ ছড়িয়ে দিতে হবে। কোরবানির পশুর উচ্ছিষ্ট যেখানে-সেখানে না ফেলে সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত জায়গায় ফেলতে হবে। পরিষ্কার জায়গায় কোরবানি দিন যাতে সহজে পানি দিয়ে ওই স্থান পরিষ্কার করা যায়। পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে নির্দিষ্ট স্থানে পশু কোরবানি দিতে হবে।

এছাড়া, জনগণকে সচেতন করতে গণমাধ্যমে প্রচারণা, মাইকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা প্রচার এবং লিফলেট বিতরণ করতে হবে। কোথাও যেন বর্জ্য জমে না থাকে, সেজন্য স্থানীয় প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি করবে। পরিবেশ অধিদপ্তরও স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। শিশু ও তরুণদের মধ্যেও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই কোরবানির পর পরিবেশ পরিষ্কার রাখা ধর্মীয় দায়িত্বও বটে।

বর্তমান সরকার পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন কোরবানি নিশ্চিত করতে প্রতি বছর নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ সমন্বিতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে। ঈদের আগে থেকেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের প্রস্তুত রাখা, অতিরিক্ত গাড়ি ও ময়লা অপসারণ যন্ত্র মোতায়েন, নির্ধারিত স্থানে পশু জবাইয়ের ব্যবস্থা এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণে তারা পরিচ্ছন্নতা কর্মী, গাড়ি ও আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে।

এছাড়া, জনগণকে সচেতন করতে মাইকিং, গণমাধ্যমে প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে। সরকার কোরবানির পশু নির্ধারিত স্থানে জবাই করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে রাস্তা-ঘাট ও ড্রেন নোংরা হওয়ার আশঙ্কা কমে। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরও পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানি সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে থাকে। কোথাও যেন বর্জ্য খোলা স্থানে ফেলে রাখা না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন তদারকি করে। তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। কিছু মানুষ অসচেতনভাবে খোলা জায়গায় নাড়িভুঁড়ি বা পশুর অবশিষ্টাংশ ফেলে রাখেন। এতে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং পথচারীদের ভোগান্তি বাড়ে। নিজের সামান্য অসচেতনতা পুরো এলাকার মানুষের জন্য দুর্ভোগ ডেকে আনতে পারে। বর্তমানে তরুণ সমাজ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ঈদের দিন ও পরবর্তী সময়ে তারা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেয়, মানুষকে সচেতন করে এবং অনেক এলাকায় স্বেচ্ছায় বর্জ্য পরিষ্কারের কাজও করে থাকে। এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেয় এবং অন্যদেরও সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করে। গ্রামাঞ্চলেও এখন সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে অনেক এলাকায় কোরবানির বর্জ্য খোলা মাঠ বা জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনের প্রচারণার ফলে মানুষ ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।
একটি পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়ে তুলতে সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

নাগরিক সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও প্রশাসনিক তৎপরতা একসাথে কাজ করলে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা দেয় না, এটি একটি সভ্য ও দায়িত্বশীল জাতির পরিচায়কও। ত্যাগের শিক্ষা ধারণ করে যদি আমরা পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিই, তবে ঈদুল আযহার প্রকৃত সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পাবে।

তাই আসুন, কোরবানির আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও দায়িত্বশীল হই। কোরবানির বর্জ্য দ্রুত পরিষ্কার করি, পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করি। শিশু ও তরুণদের মধ্যেও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন