রবিবার । ২১শে জুন, ২০২৬ । ৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩

স্মরণ: শিক্ষক-অভিভাবক আমাদের ভূঁইয়া স্যার

ড. খ. ম. রেজাউল করিম

অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আবদুল কাদির ভূঁইয়ার ছিলেন একজন প্রথিতযশা শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৪৫ সালের ২০ অক্টোবর নারায়নগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার পাঁচরুখী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুল (ঢাকা) থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ইতিহাসবিদ, লেখক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দিন উমরের আগ্রহ ও অনুপ্রেরণায় ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরের বছর সমাজবিজ্ঞান স্বতন্ত্র বিভাগ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানে যোগ দেন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। শুরু থেকেই তিনি নব্যপ্রতিষ্ঠিত বিভাগটির একাডেমিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এছাড়া বিভাগটির উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ফজলুর রশিদ খানকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান ও বিভাগটিকে গড়ার অনুরোধ জানান। খান স্যারও তাঁর প্রিয় ছাত্রের অনুরোধে ১৯৬৯ সালে সরাসরি রীডার বা সহযোগী অধ্যাপক পদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। গুরু-শিষ্যের যৌথ প্রচেষ্টায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিভাগটি একাডেমিক, ক্রীড়া ও সাংষ্কৃতিক দিক থেকে একটি সুসংগঠিত বিভাগ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচিতি লাভ করে।

ভারতের দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিল্লী স্কুল অব ইকোনোমিক্স (ভারত) থেকে পিএইচ-ডি ডিগ্রিধারী অধ্যাপক ভূঁইয়ার গবেষণা সুপারভাইজার ছিলেন ভারতের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক এ. এম. শাহ। তাঁর পিএইচ-ডি গবেষণা বিষয় ছিল বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবার। সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও তাঁর আগ্রহের বিষয় ছিল ইতিহাস ও রাজনীতি। তাই সুযোগ পেলেই বিভিন্ন আড্ডায় এ দুটি বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। অধ্যাপক ভূঁইয়া দীর্ঘ ৪৪ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পাঠদান করে গেছেন। পাশাপাশি ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সাল অবধি তিনি বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও সাহসী উদ্যোগে বিভাগের বহুবিধ উন্নয়ন ঘটে। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে বিশ^বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, সিনেট, একাডেমিক কাউন্সিল এবং ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ-এর বোর্ড অব গভর্নেন্স এর সদস্য হিসেবে ভূমিকা রাখেন। তিনি ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল অবধি শের-এ বাংলা হলের প্রাধ্যক্ষ ও ১৯৯৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০১-২০০৫ সাল পর্যন্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অবসর গ্রহণের পর (২০১২) তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল অবধি খাজা ইউনুস আলী ইউনিভার্র্সিটির (সিরাজগঞ্জ) উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাংক ফ্যাকাল্টি এবং সাউথ ইস্ট ইউনিভাসিটির অতিথি শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সাংগঠনিকভাবে দক্ষ মানুষটি আমেরিকান সোসিওলজিক্যাল এসোসিয়েশন, ইন্ডিয়ান সোসিওলজিক্যাল সোসাইটি, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ও বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য ছিলেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন আমি অধ্যাপক ভূঁইয়াকে শিক্ষক ও গাইড হিসেবে পাই। প্রথমে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হিসেবে এবং পরবর্তীকালে ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ-এর ফেলো হিসেবে তাঁর তত্ত্বাবধানে পিএইচ-ডি সম্পন্ন করি। সেই সুবাদে অধ্যাপক ভূঁইয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল দীর্ঘ ২৭ বছরের। তাঁর বেশ কিছু একাডেমিক কর্ম ও গবেষণা কাজে সহযোগী হিসেবে কাজ করা এবং এসব কাজের উদ্দেশ্যে সহযাত্রী হিসেবে দেশের নানা স্থানে ভ্রমণের সুযোগ ঘটে। অর্থাৎ তাঁর সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁেক ঘনিষ্ঠভাবে জানার সুযোগ তৈরি হয়। তাঁর বহির্মুখী ও সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব¡, মানবতাবোধ-মহত্ত্ব ও জ্ঞানের গভীরতায় বিমোহিত হই। মূলত তাঁর যাপিতজীবন ও সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার কৌশল, চিন্তা জগতের ব্যপ্তি এবং সততা, সময়ানুবর্তিতা ও পরোপকারী স্বভাবের কারণে তিনি আমার মত অনেক শিক্ষার্থীর কাছে একজন অনুকরণীয় আদর্শ শিক্ষক ও অভিভাবক হয়ে ওঠেন।

একজন শিক্ষার্থীবান্ধব ও আদর্শ শিক্ষকের যেসব গুণ থাকা প্রয়োজন তাঁর সেসবের বাইরে এমন কিছু বিশেষ গুণাবলি ছিল, যা তাকে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদেরকে কোনোদিন ভুলতে দেয়নি। মনে পড়ে ১৯৯৫ সালে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়াকালীন পরিচয় হলেও স্যারকে আমি প্রথম মাস্টার্স ক্লাসে আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের কোর্স শিক্ষক হিসাবে পাই। স্যারের পড়ানোর ধরন, বাচনিক কৌশল, উপস্থাপনভঙ্গি ও ভাষার ব্যবহার ছিল অসাধারণ ও আকর্ষণীয়। তত্ত্বের মতো রসকষহীন ও অপেক্ষাকৃত জটিল ও কঠিন বিষয়কে তিনি সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতেন। তিনি ঘড়ির কাঁটা মেপে প্রতিদিন সকাল ৮.১৫ মিনিটে ক্লাসে হাজির হতেন। কোনো দিন এর ব্যতিক্রম চোখে পড়েনি। ক্লাসে ঢুকে শিক্ষার্থীদের হাজিরা নিশ্চিত করেই তিনি তাঁর প্রস্তুতকৃত সুসংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ বক্তৃতা শুরু করতেন। তাঁর বক্তৃতাগুলো ছিল সমসাময়িক সমাজের উদাহরণে ভরপুর অথচ বাহুল্য বর্জিত। কোনো বিষয়ের সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে উদাহরণ দিতেন। ফলে আমরা সবাই বিষয়টি তাৎক্ষণিক বুঝতে পারতাম। ‘শিক্ষার সকলের চেয়ে বড়ো অঙ্গটা-বুঝাইয়া দেওয়া নহে, মনের মধ্যে ঘা দেওয়া (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।’ ঠিক এই কাজটি তিনি করতেন অত্যন্ত সফলভাবে।

মানব জীবনের অদৃশ্য নাটাই হলো শৃঙ্খলা। আর এই সুশৃঙ্খল জীবনের ভিত্তি রচিত হয় শিক্ষাজীবনে। তিনি অত্যন্ত শৃঙ্খলিত জীবন যাপন করার কারণে শিক্ষার্থীদের কোনো অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। ত্ইাতো প্রায় প্রতিদিনই শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে কাউকে না কাউকে তাঁর ক্লাস থেকে বের করে দিতেন। অনেকেই মজা করে তাকে সমাজবিজ্ঞানের বাঘ বলে ডাকতেন। ফলে আমরা সবাই স্যারকে প্রচণ্ড ভয় পেতাম। তবে সে ভয় ছিল শ্রদ্ধা ও ভালবাসা মিশ্রিত।

ভূঁইয়া স্যার লেখালেখির চেয়ে পড়তে ও বলতে বেশি পছন্দ করতেন। ফলে তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা একবারেই কম। তার লিখিত গ্রন্থ দু’টি হলো ‘স্যার সৈয়দ আহমদের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তা’ (এটি তাঁর মাস্টার্স থিসিস ছিল) ও ‘সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব: নির্বাচিত সমাজবিজ্ঞানীদের অবদান’ (সহলেখক আমি)। মূলত আমার অনুরোধেই তিনি দ্বিতীয় গ্রন্থটি লিখতে সম্মত হন। এছাড়া তিনি সামাজিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে ১৬টি গবেষণা প্রবন্ধ দেশ-বিদেশের মানসম্মত সামাাজিক বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশিত হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সরকারি অনুদানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেছেন। সেসব প্রকল্পে তাঁর শিক্ষার্থীদের তথ্যসংগ্রহকারী হিসেবে কাজে লাগাতেন এবং তাদেরকে হাত-কলমে গবেষণা শেখাতেন। আমি তাদের মধ্যে অন্যতম। এছাড়া তিনি দেশ-বিদেশের বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার, ওয়ার্কশপ, সিম্পোজিয়াম ও কনফারেন্সেও অংশ নিয়েছেন।

নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন অধ্যাপক ভূঁইয়া। জীবনে তাকে কখনো কোনো দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে দেখিনি। সততা ও আদর্শের পথে অবিচল থেকে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে পালন করে গেছেন। শুধু সমাজবিজ্ঞান বিভাগ নয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে আসীন থেকে ভূঁইয়া স্যার সমাগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। যে কোনো সহকর্মী-শিক্ষার্থী কিংবা কোনো অফিস সহকারী সমস্যা নিয়ে তাঁর দারস্থ হলে তিনি তা সমাধানের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। মনে হতো এটি যেনো তাঁর নিজের সমস্যা।

ভূঁইয়া স্যারের সৌজন্য ও ভদ্রতা জ্ঞান ছিল শিক্ষণীয়। মনে পড়ে আমাকে তিনি শুরু থেকেই তুমি সম্বোধন করতেন। আমি মাস্টার্স শেষ করেই তাঁর পরামর্শে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএস-এ এমফিল কোর্সে ভর্তি হই। ভর্তির পরপরই তিনি একদিন তাঁর অফিস সহকারীর মাধ্যমে আমাকে একটা চিঠি পাঠান। খামের উপরে ও চিঠির শুরুতে তিনি আমাকে জনাব রেজাউল করিম সম্বোধন করেন। তিনি ঐ অফিস সহকারীকে বলেছিলেন ‘আইবিএস-এ গিয়ে রেজাউল করিম স্যারকে চিঠিটা দেবে’। অফিস সহকারী আইবিএস-এ এসে রেজাউল করিম নামে কোনো স্যারকে খুঁজে না পেয়ে, আমাকে এসে জিজ্ঞাসা করেন যে ‘রেজা ভাই ভূঁইয়া স্যার রেজাউল করিম স্যারকে দেবার জন্য একটা চিঠি পাঠিয়েছেন, কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানে এই নামে কোনো স্যারকে খুঁজে পাচ্ছি না। আপনি কি ওনাকে চেনেন?” আমি চিঠিটি হাতে নিয়ে দেখি আমার চিঠি। আমি তাকে বলি এটাতো আমার চিঠি। তখন সে আমাকে বলে, ‘আপনি আবার স্যার হলেন কবে?’। এভাবেই স্যার অন্যকে সম্মানিত করতেন।

গুরুভক্তি ও যোগাযোগ রক্ষায় ভূঁইয়া স্যার ছিলেন অতুলনীয়। যখন আধুনিক যোগাযোগ কৌশল গড়ে ওঠেনি, তখন তিনি নিয়মিত চিঠি লিখে ও টেলিফোনে তাঁর বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী, শিক্ষক ও কিছু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। কাজটি তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করতেন। একদিন তো তিনি বলেই বসলেন ‘আমি এটা সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে করি।’ এছাড়া তাঁর বন্ধু-বান্ধব বা শিক্ষকদের কেউ রাজশাহীতে একাডেমিক কাজে বা বেড়াতে এলে তিনি তাদের কোথায় রাখবেন, কি খাওয়াবেন, কিভাবে যাবেন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তারা যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, স্যারের বাসায় একবেলা খেতে হতো। আবার বিদায় বেলায় তাদেরকে নানা প্রকার উপঢৌকন দিতে ভুলতেন না।

উপহার মানেই শুধু বস্তু নয়, উপহার মানে অনুভব, সম্পর্কের মূল্য আর কারও মুখে হাসি ফোটানোর এক অনন্য প্রকাশ। কাউকে উপহার প্রদান ছিল ভূঁইয়া স্যারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কেউ তার বাসা বা অফিসে গেলে তিনি তাকে কোনো না কোনো উপহার দিতেন। এছাড়া বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে তার প্রিয়জনদের নিয়মিত শুভেচ্ছা উপহার পাঠাতেন। রাজশাহীতে থাকার কারণে তিনি আম ও লিচুর মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা তার সুহৃদদেরকে ঐসব ফল পাঠাতে ভুলতেন না। আমি নিজে তাঁর কাছ থেকে যে কত উপহার পেয়েছি তাঁর হিসেব নেই। আমার মতো অনেকেই তাঁর কাছ থেকে এসব উপহার নিয়মিত পেত। অনেক সময় তাঁর নিজের সন্তানদের কাছ থেকে পাওয়া উপহারও তিনি অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। কাউকে দেয়ার মাঝে যে আনন্দ সেটি তিনি সত্যি সত্যি উপভোগ করতেন।

মানবিক সহায়তা করাকে তিনি নৈতিক দায়িত্ব মনে করতেন। তাই তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার স্বার্থে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত তাঁর সন্তান, বন্ধু ও সহপাঠী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিঃসংকোচে আর্থিক সাহায্যের আহবান জানাতেন। তাঁর সততা, ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে সকলেই তাঁর আহবানে সাড়া দিতেন। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ দ্বারা অনেক শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সক্ষম হন। এটি তাঁর ছিল এক অনন্য গুণ। কাজটি তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও নিরলসভাবে চালিয়ে গেছেন।

বলা হয় “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষাকাল”। জীবন চলার পথে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু জেনেছি, শিখেছি। যেমন- পোশাকে সবসসময় পরিপাটি থাকা, পোশাকের মূল্য যাই হোক না কেনো, তা সুন্দর করে পরিধান করা, সকালে ঘুম থেকে ওঠে দিনের সম্ভাব্য কাজগুলো ছোট ছোট চিরকুটে লিখে ফেলা, যে কোনো অনুষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ের কমপক্ষে ১০/১৫ মিনিট পূর্বে উপস্থিত হওয়া, কারো ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়লে, গাড়ির চালক মালিক হলে তাঁর পাশে বসা, এবং যে কোনো অফিস-আদালতে গিয়ে প্রথমে নিজের পুরো পরিচয় দিয়ে কথা বলা ইত্যাদি।

আসলে একজন বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী অধ্যাপক ভূঁইয়া স্যারকে নিয়ে এরকম শত শত প্রবন্ধ লিখেও শেষ করা যাবে না। স্যারকে হারিয়ে আমরা হারিয়েছি একজন আদর্শ শিক্ষক, একজন অভিভাবক। সত্যি বলতে কী, আজকে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার ভিত্তিভূমি হলেন অধ্যাপক ভূঁইয়া। স্যারের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকে, তাঁর বিদেহ আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। স্যারের জন্য সবাই দোয়া করবেন।

আজ আমার শিক্ষক-অভিভাক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মাদ আবদুল কাদির ভূঁইয়ার ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। কর্মযোগী, আদর্শ ও শিক্ষার্থী-বান্ধব শিক্ষক, অভিভাবক অধ্যাপক ভূঁইয়া বিগত ৩০ মে, ২০২০ খ্রিস্টাব্দে সন্ধ্যায় ডেংগু জ¦রে আক্রান্ত হয়ে ঢাকাস্থ মেরুল বাড্ডার নিজ বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।। সত্যি বলতে কী, আজকে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার ভিত্তিভূমি হলেন অধ্যাপক ভূঁইয়া। স্যারের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকে, তাঁর বিদেহ আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। স্যারের জন্য সবাই দোয়া করবেন।

লেখক : অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান) ও অতিরিক্ত পরিচালক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন