লায়লা রহমান একটি সময়ের নাম। একটি দীর্ঘ উপাখ্যানের নাম। পুরাতন বটবৃক্ষের নাম যাকে ঘিরে অনেক কাহিনি, অনেক রূপকথা, অনেক গল্পের ঘনঘটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খুলনা মহানগরীতে বিশেষ করে কয়লাঘাট অঞ্চলে। কয়লাঘাট আমার বাপের বাড়ির এলাকা।
এখন অবশ্য ওখানকার সব পাট আমি চুকিয়ে দিয়েই এসেছি। আমার পিতা মোঃ রফিক, প্রবীণ আলোক চিত্র শিল্পী, মা বেগম নূরুননেছা ষাট দশকের দিকে ঐ অঞ্চলে আমার একমাত্র ভাই নূরুল ইসলাম এবং দেড় বছরের আমাকে নিয়ে কয়লাঘাটের কাগজি গলিতে ৫/৬ কাঠা জমি কিনে একতলার ছোটখাটো একটা বাড়ি করে বসবাস শুরু করেছিলেন। অতঃপর ওপার বাংলা থেকে আব্বার শালা, শালি, শাশুড়ি, আত্মীয় স্বজন এসে আমাদের কয়লাঘাটের বাড়ীটাকে একান্নবর্তী পরিবারে রূপান্তরিত করে। ঐ ঘটনাবহুল সময়ের মধ্যেই সংস্কৃতিমনা ও সাহিত্যামোদী জনাব তৈয়েবুর রহমানের সঙ্গে আমার সাংস্কৃতিক মনস্ক পিতার যোগাযোগ ঘটে।
রবীন্দ্র-নজরুল, শরৎ, হারানো দিনের গান, স্মৃতিচারণ, সাহিত্য-আড্ডা প্রভৃতির মাধ্যমে তৈয়েবুর রহমার ও মোঃ রফিকের মধ্যে এক অসম সখ্যতা গড়ে উঠে। এটা ছিল বহিঃমহলের কথা। ভিতরের মহলে লায়লা রহমান যখন মেয়র পত্নী হলেন তখন রূপসা নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ঘটে। তৎকালীন মেয়র হিসাবে জনাব তৈয়েবুর রহমান নন্দিনীদের যথেষ্ট কদর করেন। রূপসা নন্দিনীদের আয়োজনে হাদিস পার্কের বইমেলায় তারা স্বামী-স্ত্রী দুইজনই উপস্থিত হয়ে নন্দিনীদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সেই মঞ্চে ঢাকা থেকে আগত কবি আসাদ চৌধুরী তার উদাত্ত কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি করে খুলনার দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলেন। খুলনা-নন্দিনীরাও লাভ করেছিল যথেষ্ট সুনাম ও জনপ্রিয়তা।
খুলনা মহানগরীর অনেক নন্দিনী ইনার হুইল ক্লাব, লেডিস ক্লাব, খুলনা ক্লাব প্রভৃতির সঙ্গে যুক্ত যার কারণে ঘুরে ফিরে লায়লা রহমানের সঙ্গে অনেকের সখ্যতা গড়ে ওঠে। আমি যদিও কোনো ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত নই কিন্তু কীভাবে যেন লায়লা রহমান আমার লায়লা খালাম্মায় রূপান্তরিত হন। সম্ভবত আমার পিতার সম্পর্ক ধরে আমি তাকে খালাম্মা বলতাম এবং তৈয়েবুর রহমানকে খালুজান ডাকতাম। তাঁরা দু’জনই আমাকে অত্যন্ত স্নেহের নজরে দেখতেন। ওনারা দু’জনই অত্যন্ত সংগীতপ্রিয় এবং ইমলামী চেতনার মানুষ ছিলেন। উর্দু, হিন্দি, পুরানো দিনের সিনেমার গান, গজল, কবিতার ভক্ত ছিলেন। বিশেষ করে নাত-এ রসূল, হামদ, ইসলামি শায়ের প্রভৃতিতে লায়লা খালাম্মার অত্যন্ত আগ্রহ ছিল।
কীভাবে যেন একবার আমি এক অনুষ্ঠানে একটা নাতএ রসুল পেশ করি। সেইখানে লায়লা খালাম্মা উপস্থিত ছিলেন। জানি না কেন সেই গজল শুনে লায়লা খালাম্মা এতটাই বিমোহিত হলেন যে আমাকে পরবর্তীতে বাড়ি থেকে গাড়ি পাঠিয়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে গজল পাঠ করার জন্য তুলে নিয়ে যান। যদিও আমি এমন কিছু আহামরি গাই না কিন্তু কেন জানি লায়লা খালাম্মার ভালো লেগেছিল সেই গজল এবং এই আমাকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন পরিবেশে তাঁর সঙ্গে ওঠা-বসার মধ্য দিয়ে এক অভূতপূর্ব আত্মিক বন্ধনে জড়িয়ে পড়ি। যদিও সে বন্ধন বাস্তবতার কঠিন চাপে পরবর্তীতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আমার আব্বা ২০০৩ সালের ১২ জানুয়ারি কয়লাঘাটায় আব্বারই কষ্টার্জিত অর্থে নির্মিত সেই বসতবাড়িতে আশি ঊর্ধ্ব বয়সে নির্মমভাবে নিহত হন। এই ঘটনা বহুল আলোচিত এবং বিশ্লেষিত। পক্ষে বিপক্ষের এবং কথার মধ্যে আমি যাবো না।
সেই ক্রান্তিকালের একপর্যায়ে দৌড়ে গিয়ে লায়লা খালাম্মার কাছে বলেছিলাম, “খালাম্মা, আমি আমার আব্বাকে বিয়ে দিতে চাই। আপনি আমায় ব্যবস্থা করে দেবেন? খালাম্মা আমার হাতখানি শক্ত করে ধরে বলেছিলেন, সত্যিই! তুমি কি তোমার আব্বাকে বিয়ে দিতে চাও? আমি বলছিলাম, হ্যাঁ দিতে চাই। উনি বেশ প্রত্যয় নিয়ে বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিতাপের বিষয় সফল হননি।”
জীবনে সবকিছু সফলতার মুখ দেখে না। আল্লাহ তায়ালার হুকুম লাগে। হয়ত হুকুম নাই। তাই আমার জীবনে অনেক কিছুই সফল হয়নি। আল্লাহর হুকুম নাই ভেবেই মেনে নিয়েছি। এটাই সুন্নাহ। এটাই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ। এ পথেই পথ। দেখেছি জীবন চিনেছি মানুষ প্রিয় সুভার্থীর আঁজলা ভরা ভালোবাসার আবে জমজম পানি।
সেই জমজম পানির একজনের নাম লায়লা রহমান। আমার লায়লা খালাম্মা। এই তো গত ২১ ফেব্রুয়ারিতে খালাম্মা আবেদিন ভিলার নুরজাহান মোহর স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত রূপসা নন্দিনীদের অনুষ্ঠানে আমাদের আমন্ত্রণে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন। অনেক সুধী মানুষের সঙ্গে আমি বহুকাল পর তাঁর সান্নিধ্যে গিয়েছিলাম। তিনি যে এতকাল পরও আমায় মনে রেখেছেন তা অনুভব করে আবারও অশ্রুসিক্ত হয়েছি। আমাকে উপলক্ষ্য করে তিনি একটা কবিতাও লিখে এনেছিলেন। নিজে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন।
আমার দুর্ভাগ্য কবিতাটি নেবো নেবো করেও ব্যস্ততায় আর নেওয়া হয়নি। আমার বিধিলিপি এমন কেন কে জানে।
মাজেদা হক খালাম্মার শেষযাত্রায় উপস্থিত হবো হবো ভেবেও শেষ পর্যন্ত হতে পারিনি। সুরমার কাছে শুনেছি মাজেদা খালাম্মা আমায় নীরবে খুঁজেছিলেন। মন্নুজাহান আপা, মনোয়ারা আপা, রীতা আপা আনোয়ারা আপা, মমতাজ রেজা মুক্তা আপা, নূরজাহান বেগম শেলী আপা, সবাই একে একে চলে গেল। সমাজে রেখে গেল তাঁদের কীর্তি, তাদের জীবনব্যাপী অর্জন। শুধু আমার কাছে রয়ে গেল তাঁদের অশ্রু সজল স্মৃতি, তাঁদের বুকভরা ভালবাসা। রবীন্দ্রনাথের চরণগুলি মতো।
এই তো সেদিন তুমি এসেছ
দু-দিন পরে যাবে চলে
ঝিনুকের দুটি খোলা
মাঝটুকু ভরা থাক
একটি নিরেট অশ্রু বিন্দু দিয়ে
দুর্লভ, মূল্যহীন।
খুলনা গেজেট/এনএম

