প্রবাসে পরিবার ছাড়া ঈদ যেন প্রাণহীন। এই বর্ণহীন, পানসে ঈদে মনকে একটু খুশি করতে খুলে বসি শৈশবের সেই আনন্দময় স্মৃতির ঝাঁপি।
গ্রামে বড় হয়েছি। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত তাই সব সুখ-স্মৃতি গ্রামকে ঘিরেই। কালেভদ্রে শহরে ঈদ পালন করলেও গ্রামের সেই আনন্দ আর কোথাও খুঁজে পাইনি। যতভাবেই বলি না কেন, কম হয়ে যাবে।
ঈদের ক্ষণগণনা শুরু হতো বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। এখনকার মতো সেই সময় অগ্রিম দিন-ক্ষণ জানার প্রযুক্তি হয়ত ছিল, তবে গ্রামের মানুষ তার খবর রাখত না। পঞ্জিকা আর চন্দ্র মাসে যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁদের মধ্যে বাহাস চলত কবে, কোন তিথিতে চাঁদ দেখা যাবে। সেই বাহাসের সমাধান হতো স্বয়ং চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে। ফেসবুকে চাঁদ দেখার সুযোগ তখন ছিল না; সরাসরি আকাশে চাঁদ খোঁজার সেই আনন্দ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। মেঘের আড়াল থেকে যে সবার আগে চাঁদ খুঁজে পেত, তাকে সবাই সৌভাগ্যবান মনে করত। শুরু হতো পটকা ফোটানোর ধুম, আনন্দ-মিছিল আর হই-হুল্লোড়। চাঁদ দেখার সংবাদ শোনার জন্য মানুষ রেডিওতে কান পেতে থাকত। চাঁদ দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোজার ঈদে রেডিওতে ভেসে আসত সেই গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ আর কুরবানির ঈদে বাজত নজরুলের সেই আহ্বান ‘প্রাণের যা তোর প্রিয়তম, আজকে সে সব আন্, খোদারই রাহে আজ তাহাদের কর রে কোরবান্।’
তারপর শুরু হতো প্রস্তুতি। সব ঈদে নতুন জামা জুটত না, তাই ভালো জামাটা মা আগেই ধুয়ে-পরিষ্কার করে রাখতেন। আমাদের উপজেলা সদরেও বিদ্যুৎ ছিল না, তাই গ্রামে বিদ্যুতের কথা কল্পনাও করতাম না। ভারী লোহার ইস্ত্রি স্টোভের বা কাঠের আগুনে গরম করে কাপড় ইস্ত্রি করা হতো।
সকালে ঘুম ভাঙত আব্বার ডাকে। আব্বার সঙ্গে আমরা তিন ভাই সুগন্ধি সাবান মেখে গোসল করতাম বাড়ির পাশের খালে তখন খালে মিষ্টি পানির স্বচ্ছ প্রবাহ ছিল। গ্রামের সবাই সেই খালেই গোসল করত। একসঙ্গে গোসলের কলকল ছাপিয়ে ঈদগাহ থেকে মাইকে ভেসে আসত ডাক্তার সোবহান দাদার তকবির। কতক্ষণে ঈদগাহে পৌঁছাব— ভেতরে সেই তুমুল উত্তেজনা অনুভব করতাম।
ঈদগাহে যাওয়ার আগে বিস্তর কাজ। হয়ত জামাটা ঠিক আছে, কিন্তু পায়জামার রশি খাটো। নয়তো দেখা গেল জামার একটা বোতাম খোলা। মা সুই-সুতা নিয়ে ঠিক করলেন, তো জুতায় কালি করা হয়নি। নয়তো যতœ করে তুলে রাখা নতুন টুপিটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ঈদগাহে যাওয়ার আগে আমরা আব্বা, মা ও মুরুব্বিদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতাম। আমরা তিন ভাই একে একে প্রথমে আব্বাকে, তারপর মাকে সালাম করতাম। যতবার মাকে সালাম করেছি, ততবার তিনি চোখ ভিজিয়ে ফেলতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করতেন। মা সবাইকে কড়কড়ে নতুন টাকা সালামি দিতেন। সেই নতুন টাকার উষ্ণতা পকেট থেকে শরীর ছুয়ে যেত।
ঈদের মাঠে বের হওয়ার সময় বড় বিপত্তি বাধাত ভগ্নিপতি সোহরাব ভাই। মেয়েদের মতো পাউডার-স্নো মেখে, আতর লাগিয়ে বের হতে তাঁর বিস্তর বিলম্ব। আমি আর মেজভাই আব্বার দুপাশে হাঁটতাম, আর বড় ভাই জায়নামাজ নিয়ে বড় বড় পায়ে আগেই চলে যেত।
ঈদগাহের ইমাম সাহেবের মন ছুঁয়ে যাওয়া বয়ান ঈদ এলেই প্রবাসে অনুভব করি। বয়ান যত মধুর হোক, তিনি ঘড়ির কাঁটা ধরে জামাত শুরু করতেন। নামাজ শেষ হলে আব্বাকে দিয়ে কোলাকুলি শুরু করে বড় ভাই তারপর আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহপাঠী, পরিচিত সবার সঙ্গে কোলাকুলি করতে করতে বুকই ব্যথা হয়ে যেত। সব শেষে কোলাকুলি হতো মাওলানা শাহাদাৎ হুজুরের সঙ্গে সে এক অনাবিল আনন্দ। যার সঙ্গে আগের দিন মনোমালিন্য হয়েছিল, আজ তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সব মনঃকষ্ট মুছে ফেলছি এই অনুভূতির কোনো তুলনা নেই।
এই পর্ব শেষ হলে শুরু হতো গ্রামের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত কবর জিয়ারত ও দোয়া। কুরবানির ঈদে জোরেশোরে শুরু হতো কুরবানির আয়োজন, কিন্তু আমাদের কাছে কেউ ঘেঁষত না। ইতোমধ্যে মা সেমাই-খিচুড়ি রান্না শেষ করে গোসল সেরে নতুন শাড়ি পরতেন। মাকে তখন এত স্নিগ্ধ লাগত যে মনে হতো আরেকবার সালাম করি।
আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম, গ্রামের কেউ যেন না খেয়ে বাড়ি পার হয়ে না যায়। গ্রামের সবাইকে নিয়ে খেতে বসে কত সুখ-দুঃখের কথা— সেই অনাবিল একতার অনুভূতি আজও বুকে বাজে। মহিলারা দল বেঁধে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে আসতেন।
সেই সময় ঈদ কার্ড দিয়ে দাওয়াত দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। আগেই তালিকা থাকত কার কার বাড়িতে না গেলেই নয়। পায়ে হেঁটে সেসব বাড়িতে হাজিরা দিতাম। কেউ বাদ গেলে পরে মান-অভিমান চলত।
আমাদের সময় যুগ পরিবর্তন শুরু হয়েছিল। গ্রামে ঈদের বিকেলে খেলাধুলো আর নৌকাবাইচকে বিদায় জানিয়ে সবাই বিটিভির বাংলা ছায়াছবি দেখতে শুরু করেছে। কয়েকদিন ধরে চলা বিজ্ঞাপন বহুল সেই অনুষ্ঠানসূচি ঈদ আনন্দের অনুষঙ্গ হয়ে উঠত। কাজের সূত্রে আব্বার হিন্দু-মুসলমান বন্ধুরা সন্ধ্যায় আসতেন বাড়ির আঙিনায়, জমে উঠত জমজমাট আসর।
সেই সময় গ্রামের মানুষের হাতে নগদ টাকা ছিল না, আভিজাত্যও ছিল না— কিন্তু দিনগুলো ছিল আনন্দময়। অভাব ছিল, হিংসা-বিদ্বেষ ছিল না। একজনের বিপদে অন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ত। উৎসবে মুসলমান-হিন্দু, উঁচু-নিচু সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যেত। এখন সমাজ দ্রুত বদলাচ্ছে, মানুষের আর্থিক উন্নতি হচ্ছে— কিন্তু পাল্লা দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে পারস্পরিক মমতা আর ভালোবাসার বন্ধন।
এখন আমার অবস্থান পাল্টে গেছে। দেশে থাকলে এখন আমি সালামি দিই, আমার মেয়েরা আমাকে সালাম করে। যান্ত্রিক যানে চড়ে গ্রাম-ইউনিয়ন ঘুরে বেড়াই— কিন্তু শৈশবের সেই আনন্দ আর খুঁজে পাই না। ইচ্ছে করে কল্পনার টাইম মেশিনে চড়ে সেই শৈশবে ফিরে যাই।
কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি,
‘ফিরে আসুক সেই আনন্দ।’

