বহুল পঠিত, নির্দয়ভাবে নিন্দিত, গভীর অনুরাগে সমাদৃত ও নন্দিত, বিপুল বিস্ময়ের নাম কাজী নজরুল ইসলাম।
আমেরিকান অধ্যাপক হেনরি গ্লাসি বলেছেন- বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম গোটা মানব জাতির কাছে তিনটি কারণে সবসময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক-স্বাধীনতা, সুবিচার আর প্রেম। প্রকৃতপক্ষে নজরুল ইসলাম এই তিনটি বিষয়ের ক্ষেত্রে ছিলেন আপোসহীন। তিনি সর্বাংশে স্বাধীনতাকামী, সুবিচার প্রত্যাশী ও প্রেম সত্তায় উজ্জীবিত। তাঁর বিদ্রোহ এ তিনটি সত্যকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কেবল বাঙালী নয় সর্বকালের সর্বদেশের মানুষের জন্যে প্রয়োজন এই ত্রয়ী সত্য। সে কারণেই তিনি সর্বজনীন কবি। তাঁর লেখায় আমরা পাই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রতিধ্বনি।
সকল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নজরুল যেমন ছিলেন প্রতিবাদী তেমনই সবধরণের নির্যাতন, শোষণ আর অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তাই’ত তিনি দৃঢ়কন্ঠে ছড়িয়েছেন মানবতার বাণী আর শিকল ভাঙ্গার সুরে গেয়েছেন মুক্তির গান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতের স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রাণপ্রিয় অবিসংবাদিত নেতা সুভাষ চন্দ্র বোস ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার আলবার্ট হলে নজরুলের গণসংবর্ধনা সভায় বলেছিলেন, “নজরুলের গান এতই উদ্দীপনামূলক যে আমরা যখন যুদ্ধে যাব তখন গাইব নজরুলের গান। আবার আমরা যখন কারাগারে যাব তখনও নজরুলের গানই গাইব।”
দুর্ভাগ্য আমাদের এই সাম্য ও শান্তির দূত, অমর শিল্পী, মানবতাবাদী মহামনীষী ১৮৯৯ হতে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘকাল জীবিত থেকেও মাত্র ৪২ বছর বয়সে হয়েছিলেন সম্বিতহারা অর্থাৎ তাঁর চৈতন্য, অনুভূতি, স্মৃতিশক্তি, বাকশক্তি, লেখার শক্তি সবই লোপ পায় চিরতরে। ভাবতে বেদনাকাতর হতে হয় যে, এই অসাধারণ প্রতিভাধর সৃষ্টিশীল মানুষটি হয়ে যান সম্পূর্ণরূপে নির্বাক, নিশ্চুপ, নিষ্কৃয়। অথচ এই নজরুলই’ত তাঁর ৪২ বছরের সুস্থ্য জীবনের মধ্যে মাত্র ২২ বছরের সাধনায় আমাদের সাহিত্য, কাব্য ও সঙ্গীতের গগনে তুলেছেন বৈশাখী ঝড়, সৃষ্টি করেছেন গ্রীষ্মের মধ্যহ্নহ্ন সূর্যের প্রখর উত্তাপ, আবার ঝরিয়েছেন শ্রাবণের বারিধারা, দিয়েছেন শরতের পূর্ণিমার চন্দ্রের স্নিগ্ধ কোমল পরশ, সৃষ্টি করেছেন বসন্তের দখিনা সমীরণের আমেজ। তাঁর লেখায় কোথাও পথ চলতে দিক নির্ণয়কারী উত্তর আকাশে ধ্রুবতারা বা ভোরের পূর্ব আকাশে শুকতারা আবার কখনও বা পশ্চিম আকাশে সন্ধ্যাতারার উজ্জ্বল উপস্থিত। এমনিভাবে তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন কত গান, কত কাব্য, কত গল্প, কত উপন্যাস, কত প্রবন্ধ, কত নাটক, কত সুর, কত কথা, কত ভবিষৎবাণী যা থেকে আমরা পেয়েছি জীবনে চলার প্রেরণা, গতি, ছন্দ, সঠিক নির্দেশনা, আশার আলো সব মিলিয়ে বলা যায় জীবনের বিচিত্র স্বাদ।
এটা খুবই লক্ষণীয় যে মানব চরিত্রের বা আচরণের বিরল দু’টি বৈশিষ্ট্য নজরুল ইসলামের মধ্যে প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। যা তাঁকে মহামানবের মর্যাদায় আসীন করেছে। প্রথমতঃ তিনি আধ্যাত্মিক চেতনাসমৃদ্ধ মানুষ ছিলেন। তাই’ত তাঁর অনেক লেখায় ও গানে প্রকাশ পেয়েছে আধ্যাত্মিক ভাবনা। তবে একথা খুবই স্পষ্ট যে তাঁর মধ্যে সামান্যতম সংকীর্ণতা বা গোড়ামী বলে কিছু ছিল না। তিনি আল্লাহ আর রসুলের বাণী বুকে ধারণ করে আল্লাহর সৃষ্ট মানুষকে ভালবেসেছিলেন। ভালবেসেছিলেন আল্লাহর সৃষ্ট প্রকৃতিকে। তাঁর একটি লেখা উদ্ধৃত করলে সহজেই বোঝা যাবে কতটা গভীরে ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক ভাবনা।
মস্জিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই।
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামজীরা যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে।
গোর আজাব থেকে এ গুনাহ্গার পাইবে রেহাই।
কত পরেজগার খোদার ভক্ত নবীজীর উম্মত
——————————————-
আল্লাহর নাম জিকির করে লুকিয়ে গভীর রাতে
আমি তাদের সাথে কেঁদে কেঁদে
আল্লাহর নাম জপিতে চাই।
কবি নজরুল ইসলাম যে আল্লাহর কত নিকটের, কত কাছের প্রিয় বান্দা ছিলেন তা আমরা বুঝিনি। কিন্তু তাঁর ঐ প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেছেন বলেই কবির মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মসজিদেরই পাশে তাঁর কবর হয়েছে। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি মসজিদের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। এই মহান কবির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
দ্বিতীয়ত: তিনি ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিশীল ভাবাদর্শের মানুষ। তিনি বিজ্ঞান প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কার দিয়ে পৃথিবীকে সাজানোর প্রবক্তা ছিলেন, তাই তিনি তাঁর লেখনী দিয়ে তুলে ধরেছেন-
থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে-
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ-দেশান্তরে
ছুট্ছে তারা কেমন করে,
কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,
কিসের আশায় করছে তাঁরা বরণ মরণ-যন্ত্রণাকে।
কেমন করে বীর ডুবুরি সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে,
কেমন করে দুঃসাহসী চল্ছে উড়ে স্বর্গপানে।
জাপ্টে ধরে ঢেউয়ের ঝুঁটি
যুদ্ধ জাহাজ চল্ছে ছুটি,
কেমন করে আন্ছে মানিক বোঝাই করে সিন্ধু-যানে,
কেমন জোরে টান্লে সাগর উথ্লে ওঠে জোয়ার-বানে।
——————————————-
রইব নাকো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এসব ভুবন ঘুরে-
আকাশ-বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চূড়ে।
আমার সীমার বাঁধন টুটে
দশ দিকেতে পড়ব লুটে,
পাতাল ফেড়ে নাম্ব নিচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে,
বিশ^-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।
কি অসাধারণ তাঁর ভাবনা! কি বিস্ময়কর তাঁর কল্পনা! কিন্তু এ সবের মধ্যে যে লুকিয়ে ছিল চরম বাস্তবতা তাতো আজ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কারের আর সফল অভিযানের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে। জগৎবাসী দেখেছে কিভাবে মানুষ চন্দ্রকে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে, কিভাবে সাগরের তল দেশ হতে মনি-মানিক্য তুলে আনছে। আবার মানুষ মঙ্গল গ্রহের রহস্য ভেদ করতে ছুটে চলেছে। নজরুলের স্বপ্ন ছিল সারা বিশ^ জগৎকে আপন হাতের মুঠোয় নিয়ে দেখার, তাতো আজ দিনের আলোর মতই স্পষ্ট। বিশে^র যে কোন প্রান্তে বসে মানুষ সারা বিশে^র চলমান ঘটনাবলীর সর্বশেষ তথ্য ও চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে নিজ হাতের মোবাইল ফোনের মধ্যে দেখতে, শুনতে ও জানতে পারছে। কি অসাধারণ দূরদর্শী ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন নজরুল।
আসলে নজরুল ইসলাম বিশ^-প্রকৃতি আর মানব জীবনের কথা নিয়ে এমন সুতীব্রভাবে চিন্তা করেছিলেন যে সেই গভীর ভাবনার প্রচন্ড স্নায়ুবিক চাপ বেশিদিন সইতে পারেননি। তাঁর ধমনী সেই প্রবল চাপে আক্রান্ত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য। তবে আক্রান্ত হওয়ার আগেই অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি নিজের পরিনতির কথা অনুভব করে ভবিষৎবাণী করেছিলেন-
তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিব না।
কোলাহল করি সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙ্গিব না।
-নিশ্চল নিশ্চুপ
আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিধুর ধূপ।
অর্থাৎ তিনি ধূপের মত দগ্ধ হয়ে পুড়ে পুড়ে নিশ্চল নিশ্চুপ হয়ে যাবেন। তবু কোলাহলের উচ্চনাদে মানুষকে আর জাগাবার চেষ্টা করবেন না।
লেখক : প্রাক্তন ট্রেজারার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
খুলনা গেজেট/এনএম

