মধ্যবয়সি এক ভদ্রলোক ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামিয়েছেন। জানালার কাচে টোকা দিল সাত-আট বছরের একটি মেয়ে। হাতে কয়েকটি ফুলের মালা। নিচু কণ্ঠে সে বলছে, “স্যার, একটা মালা নেন না! সকাল থেকে কিচ্ছু খাই নাই।” সিগন্যাল সবুজ হতেই গাড়িটি ধোঁয়া উড়িয়ে চলে গেল, আর মেয়েটির জীর্ণ আঁচলে ঢাকা পড়ল তার একরাশ হতাশা। এটি কোনো এক বিশেষ দিনের গল্প নয়; বাংলাদেশের ব্যস্ত নগরীগুলোর যে-কোনো সিগন্যাল বা মোড়ে এটি প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য।
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মৌলিক চাহিদা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমাদের আশপাশে বেড়ে ওঠা এই পথশিশুদের জীবন থেকে শিশু অধিকার শব্দ দুটি যেন একদমই নির্বাসিত।
পরিসংখ্যানের আয়নায় পথশিশুদের অবস্থান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর যৌথ তথ্যমতে, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। যার একটি বড় অংশ অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকায়।
সুরক্ষার অভাব : এসব শিশুদের একটি বড় অংশ রাতে ঘুমানোর জন্য বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল কিংবা খোলা ফুটপাত বেছে নিতে বাধ্য হয়।
শিক্ষাহীনতা : গবেষণায় দেখা গেছে, পথশিশুদের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পায় না।
স্বাস্থ্য ও পুষ্টিহীনতা : পর্যাপ্ত খাবার ও সুপেয় পানির অভাবে এরা চরম অপুষ্টি, চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা জটিলতায় ভোগে।
কেন এরা রাজপথে?
কোনো শিশুই পথশিশু হয়ে জন্মায় না। সামাজিক ও পারিবারিক কিছু চরম বাস্তবতাই তাদের রাস্তায় ঠেলে দেয়।
পারিবারিক দারিদ্র্য ও নদীভাঙন : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীভাঙন ও গ্রামের চরম দারিদ্র্য অনেক পরিবারকে ভিটেমাটিহীন করে তোলে। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা শহরে এসে বস্তি বা খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেয়।
পারিবারিক বিচ্ছেদ ও নির্যাতন : মাতা-পিতার বিচ্ছেদ, সৎ মা বা বাবার নির্যাতন এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে অনেক শিশু ঘর ছেড়ে শহরের পথে আশ্রয় নেয়।
শিশুশ্রম ও শোষণ : পেটের দায়ে খুব ছোট বয়সেই এদের ফুল বিক্রি, টোকাই বা কাগজ কুড়ানো, কুলিগিরি কিংবা লেগুনা-বাসের হেলপারি করতে হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ জীবন ও অধিকার লঙ্ঘন
পথশিশুদের দৈনন্দিন জীবন কাটায় চরম নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের ঝুঁকিতে। যে বয়সে হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সে বয়সে তাদের যুদ্ধ করতে হয় একবেলা খাবারের জন্য।
এক নজরে তাদের প্রধান সমস্যাগুলো:
মাদকাসক্তি : একাকিত্ব, হতাশা ও ক্ষুধা ভুলতে অনেক পথশিশু ড্যান্ডি (আঠা জাতীয় বিষাক্ত উপাদান) ও অন্যান্য নেশায় জড়িয়ে পড়ছে।
অপরাধ ও শোষণের শিকার : কোনো অভিভাবক না থাকায় অপরাধী চক্র তাদের বিভিন্ন অবৈধ কাজ বা চুরি-ছিনতাইয়ের কাজে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
যৌন ও শারীরিক নির্যাতন : ফুটপাত ও খোলা স্থানে বাসের কারণে কন্যা-পথশিশুরা প্রতিনিয়ত শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের চরম ঝুঁকিতে থাকে।
আমাদের করণীয় ও উত্তরণের পথ
শিশু অধিকার শুধু কাগজে-কলমে বা সভা-সেমিনারের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পথশিশুদের মূলধারার সমাজে ফিরিয়ে আনতে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ।
পুনর্বাসন ও আশ্রয়কেন্দ্র : প্রতিটি প্রধান শহর ও স্টেশনের আশেপাশে মানসম্মত সরকারি ও বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্র গঠন নিশ্চিত করতে হবে।
আনুষঙ্গিক ও কারিগরি শিক্ষা : তাদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার, যাতে তারা পরবর্তীতে স্বাবলম্বী হতে পারে।
কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন : মাদকাসক্ত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সঠিক চিকিৎসা দিয়ে ডিনোটেশন/কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফেরানো জরুরি।
সামাজিক সচেতনতা : পথশিশুদের অবহেলার চোখে না দেখে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসা এবং তাদের জন্য জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।
আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ—এই বহুল প্রচলিত বাক্যটি পথশিশুদের ক্ষেত্রে অর্থহীন হয়ে পড়ে, যদি না তাদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটুকু আমরা সুনিশ্চিত করতে পারি। রাজপথের এই অবহেলিত শিশুদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং পুরো সমাজের মানবিক নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিটি শিশুই যাতে নিজ অধিকার নিয়ে নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে, সেই সুন্দর ভোরের অপেক্ষায় আমাদের আজই কাজ শুরু করতে হবে।
খুলনা গেজেট/এএজে


