মানুষ গড়ার কারিগর ও অসমাপ্ত অঙ্গীকার

ফরহাদ হুসাইন

বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ। এটি ক্যালেন্ডারের আর দশটি দিবসের মতো নিছক একটি তারিখ নয়। এটি সেই নীরব স্থপতিদের স্মরণের দিন, যাঁরা মোমের মতো নিজে গলে অন্যের পথে আলো জ্বেলে দেন। সভ্যতার ভোর থেকেই গুরুর আসন উঁচুতে। এথেন্সের পথে-ঘাটে প্রশ্ন ছুড়ে সক্রেটিস শিখিয়েছিলেন, নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করাই জ্ঞানের প্রথম ধাপ। সক্রেটিস থেকে প্লেটো, প্লেটো থেকে অ্যারিস্টটল, অ্যারিস্টটল থেকে আলেকজান্ডার, জ্ঞানের এই অটুট শিকলই পশ্চিমা চিন্তাজগতের মেরুদণ্ড। প্রাচ্যে কনফুসিয়াস ধনী-গরিবের ভেদ ঘুচিয়ে শিক্ষাকে করেছিলেন সবার অধিকার। উপমহাদেশে গুরুকুল, টোল, পাঠশালা, মক্তব আর নালন্দা-তক্ষশীলার ঐতিহ্য মনে করিয়ে দেয়, এ মাটিতে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা-ভক্তি আর স্নেহ-মমতার বন্ধনে গাঁথা।

ইসলামে সমুন্নত শিক্ষকের মর্যাদা

আল্লাহ যাঁদের কাজকে সম্মানিত করেছেন এবং যাঁদের ব্রতকে সমুন্নত করেছেন, শিক্ষকেরা তাঁদের অন্যতম। তাঁদের মর্যাদা মানুষের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ঊর্ধ্বে। শিক্ষকতা শ্রেষ্ঠ পেশাগুলোর একটি, নবী ও সৎকর্মশীলদের পেশা।যাঁর সঙ্গে আল্লাহ সরাসরি কথা বলেছেন, সেই মুসা (আ.) আল-খিদরের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন একজন বিনয়ী ছাত্রের মতো। তিনি বলেছিলেন: “আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি, যাতে আপনি আমাকে যা শেখানো হয়েছে তা থেকে সৎ পথের শিক্ষা দেন?” (সূরা আল-কাহফ: ৬৬) শিক্ষকের সান্নিধ্যে থাকার অনুমতি চাওয়া এবং তাঁর জ্ঞানের প্রয়োজন স্বীকার করার এই বিনয়ই শিক্ষকের মর্যাদার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ। এই মর্যাদার দায়ও আছে। শিক্ষকের প্রথম অঙ্গীকার হওয়া উচিত আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিষ্ঠার সঙ্গে প্রচেষ্টা নিবেদন করা। কাজ মহত্ত্ব পায় নিয়তের গুণে, আর তার প্রভাব টিকে থাকে অন্তরের আন্তরিকতায়।

নবী ﷺ বলেছেন: “কাজের পরিণতি নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক মানুষ তা-ই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।” (সহীহ আল-বুখারী) প্রতিদান শিক্ষক আশা করবেন তাঁর রবের কাছে, আর আনন্দিত হবেন প্রিয় নবী ﷺ-এর এই সুসংবাদে: “যে ব্যক্তি কোনো জ্ঞান শিক্ষা দেয়, সে অনুরূপ আমলকারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।” (সুনান ইবনে মাজাহ)। ছাত্ররা শিক্ষকের পাঠ থেকে যেমন শেখে, চালচলন থেকেও তেমনই শেখে। শিক্ষক সৎ হলে তারা সততার পথে চলে, পথভ্রষ্ট হলে সেই পথেও হাঁটে।

আল-জাহিজ বর্ণনা করেছেন, এক পিতা তাঁর সন্তানদের শিক্ষককে বলেছিলেন: “আমার সন্তানদের শিক্ষা দেওয়ার আগে আপনার প্রথম কাজ হোক নিজের চরিত্র পরিশুদ্ধ করা, কারণ তাদের দৃষ্টি আপনার ওপর নিবদ্ধ। তারা যাকে ভালো মনে করে, আপনিও তাকে ভালো মনে করেন; তারা যাকে মন্দ মনে করে, আপনিও তাকে মন্দ মনে করেন।” তাই যে সদ্গুণের বিরোধিতা নিজে করেন, তার দিকে ছাত্রদের ডাকা শিক্ষকের সাজে না। যা নিজে করেন, তা থেকে নিষেধ করাও সাজে না। শিক্ষা হয়তো বিস্মৃত হয়, কিন্তু উত্তম দৃষ্টান্ত থেকে যায়, তা মুছে যায় না।

জ্ঞানীর মর্যাদার বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন: “বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান?” (সূরা আয-যুমার: ৯)

ইসলাম ও ইতিহাস শিক্ষককে যে আসনে বসিয়েছে, বাস্তবে সেই আসন কি আজ অটুট আছে?

শিক্ষাবিজ্ঞানের গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, স্কুলের ভেতরের নানা উপকরণের মধ্যে শিক্ষকের মানই শিক্ষার্থীর শেখার ওপর সবচেয়ে জোরালো প্রভাব ফেলে। দালান, ডিজিটাল পর্দা বা ঝকঝকে পাঠ্যবই কোনোটাই শিক্ষকের বিকল্প নয়। রুশ মনোবিজ্ঞানী ভাইগটস্কি দেখিয়েছিলেন, শিশু একা যতটা পারে আর সহায়তা পেলে যতটা পারে, এই দুইয়ের ফারাক ভরাট করেন শিক্ষক। ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশ এ সত্য বুঝেছে বলেই শিক্ষকতাকে করেছে বাছাই-প্রতিযোগিতার, প্রশিক্ষণনির্ভর ও সম্মানজনক পেশা। সেখানে শিক্ষক ডাক্তার-প্রকৌশলীর মতোই সমাদৃত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে প্রশ্ন উঠছে, যন্ত্রই কি তবে শিক্ষকের জায়গা নেবে? যন্ত্র তথ্য জোগাতে পারে, কিন্তু চরিত্র গড়তে পারে না। ভুল করা শিশুর পিঠে হাত রাখা, হতাশ কিশোরের চোখে স্বপ্ন জাগানো, নীতি-নৈতিকতার পাঠ দেওয়া, এসব মানবিক কাজ শিক্ষকের ভাগেই থাকবে। ইউনেসকো জানিয়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিবাসনের মতো নতুন চাপের কারণে ১৯৬৬ সালের সুপারিশমালা এখন সংশোধন করা হচ্ছে।

বিশ্ব আজ এক নীরব সংকটের মুখে। ইউনেসকোর বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিটি শিশুকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা দিতে ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৪ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষক প্রয়োজন। পেশাটি যোগ্য মানুষকে টানতে পারছে না, আবার যাঁরা আছেন তাঁদেরও ধরে রাখা যাচ্ছে না। কারণ অভাব-অনটন, কাজের চাপ আর সামাজিক অবমূল্যায়ন। আজকের দিনটির দাবি তাই শুধু শুভেচ্ছা বিনিময় নয়, পেশাগত, বস্তুগত ও সামাজিক, এই তিন স্তরের মর্যাদা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের বাস্তবতা এ আলোচনাকে আরও তীক্ষ্ণ করে। নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী পরিষদের দাবি, ৫ হাজার ৩৩২টি নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬৮ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বছরের পর বছর বিনা বেতনে কাজ করছেন। “বেতনহীন শিক্ষক” শব্দবন্ধটিই একটি জাতির লজ্জা। এক শিক্ষক-লেখকের হিসাব অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা ত্রয়োদশ গ্রেডে, মূল বেতন মাত্র ১১ হাজার টাকা। পদোন্নতির সুযোগও নেই, ২০-৩০ বছর চাকরি করে একই পদে অবসর। আরেকটি লেখায় বলা হয়েছে, প্রায় ৩৬ হাজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী একই পাঠ্যক্রমে পড়ান, অথচ সুযোগ-সুবিধায় সরকারি শিক্ষকদের সঙ্গে ব্যবধান রয়ে গেছে।

এর পরিণতি শুধু শিক্ষকের ব্যক্তিগত কষ্টে সীমাবদ্ধ থাকে না। আর্থিক অনিরাপত্তায় অনেক শিক্ষক বাধ্য হয়ে স্কুলের পর টিউশনির পথ ধরেন। কোচিং-বাণিজ্য রোধের নীতিমালা থাকলেও অভাবের তাড়নায় শ্রেণিকক্ষ ও কোচিং সেন্টারের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। অভিভাবকের পকেট কাটা যায়, শিক্ষার্থীর শেখার মান পড়ে, আর শিক্ষকের সম্মানও ধুলোয় মেশে। এর সঙ্গে আছে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিছু শিক্ষককে অপমান ও জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার বেদনাদায়ক ঘটনা। যে সমাজ গুরুর গায়ে হাত তোলে, সে সমাজ নিজের ভবিষ্যতের গায়েই হাত তোলে।

ঘোষণা আর বাস্তবতার ফারাক

শিক্ষকের মর্যাদার প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত মাস শেষে হাতে পাওয়া বেতনের প্রশ্নও। এখানেই আজ সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। গত ১৯ সেপ্টেম্বর সরকার “চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬” জারি করেছে। নতুন বেতন স্কেল কার্যকর ধরা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে, তবে বর্ধিত বেতন মিলবে ধাপে ধাপে। প্রথম ধাপে বৃদ্ধির ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ, আর শতভাগ কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে। অন্যান্য ভাতা কার্যকরের তারিখ ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি। সরকারি কর্মচারীরাও কিন্তু এখনো বাড়তি টাকা হাতে পাননি। সেপ্টেম্বরের বেতন হয়েছে পুরোনো স্কেলেই, অক্টোবরের বেতন নতুন হারে মিলবে নভেম্বরের শুরুতে, সঙ্গে তিন মাসের বকেয়া। এই সারিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা দাঁড়িয়ে আছেন আরও পেছনে।

প্রতিশ্রুতি অবশ্য ছিল। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও নতুন বেতন কাঠামোয় বেতন পাবেন। ব্যানবেইসের হিসাবে এমন শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার। তবে ঘোষণার শুরু থেকেই একটি অস্বস্তিকর রীতির আভাস ছিল। মাউশির এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, সচরাচর সরকারি চাকরিজীবী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পে-স্কেল একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হয় না, সরকারি কর্মচারীরা আগে পান আর শিক্ষকেরা পান কিছুটা পরে। এই “কিছুটা পরে” কতদিন গড়ায়, তার ভুক্তভোগী প্রতিবারই শিক্ষকেরা।

এর পরের ঘটনাপ্রবাহ আরও বিভ্রান্তিকর। ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এমপিওভুক্তদের নবম পে-স্কেলে অন্তর্ভুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি, উচ্চপর্যায়ে হয়েছে কেবল মৌখিক আলোচনা। ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন শেষে শিক্ষামন্ত্রী বললেন, পৃথক প্রজ্ঞাপন অর্থ মন্ত্রণালয় জারি করবে এবং সেখানে কাজ চলছে। দু-দিন পরেই, ৩০ সেপ্টেম্বর, শিক্ষাসচিব জানালেন আলাদা প্রজ্ঞাপনের প্রয়োজনই নেই। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনেই শিক্ষকেরা বেতন-ভাতা পাবেন, আর সরকারি কর্মচারীরা যে সুবিধা পাবেন শিক্ষকেরাও তাই পাবেন।

আমি যে মরুর দেশে বসে লিখছি, সেখানে শিক্ষকের সম্মান রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ। ৫ অক্টোবর ইউনেসকো সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হবে ইউনেসকো-হামদান পুরস্কার ফর টিচার ডেভেলপমেন্টের নবম আসর। শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নকে সম্মান জানাতে আমিরাতের এই উদ্যোগ ইউনেসকোর মঞ্চে বছরের পর বছর স্বীকৃতি পাচ্ছে। শিক্ষকের মর্যাদা যে উন্নয়নের পূর্বশর্ত, এই দৃষ্টান্ত তারই প্রমাণ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সন্তানরাও এখানে সেই সম্মানের আবহে বেড়ে উঠছে। আমাদের দেশে সেই আবহ কেন তৈরি হবে না?

সময়ের দাবী

একই যোগ্যতা, একই দায়িত্ব, অথচ ভিন্ন বেতন কাঠামো ও ভাতা, এই অসঙ্গতি দূর করতে হবে। পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা-ভিত্তিক পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে মেধাবীরা শিক্ষকতাকে দশেষ পছন্দ’ নয়, প্রথম পছন্দ ভাবেন। যোগ্য মানুষ বাছাই, ডিজিটাল ও আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও সামাজিক অবস্থান তৈরি করতে হবে। পাঠ্যক্রম ও শিক্ষানীতি প্রণয়নে শিক্ষকের মতামতের স্থান দিতে হবে।

শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড, এ কথা আমরা সবাই মুখে বলি। কিন্তু মেরুদণ্ড দুর্বল রেখে কোনো জাতি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ষাট বছর আগে বিশ্ব যে অঙ্গীকারনামায় সই করেছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন আজও বাকি। যে হাত আমাদের হাতে কলম তুলে দিয়েছে, সে হাত যেন কখনো অভাবে বা অপমানে কাঁপতে না হয়।

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন