জলবায়ু-সহনশীল জীবিকায় নারীদের নেতৃত্বে সালমা বেগম

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনা জেলার অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা দাকোপ। লবণাক্ততার বিস্তার, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং নিয়মিত বন্যা এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে নারীরা পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা এবং পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহুমাত্রিক ঝুঁকির সম্মুখীন হন।

৩৫ বছর বয়সি সালমা বেগমও এমনই একজন নারী। তিনি ছোট পরিসরে হাঁস-মুরগি পালন করে পরিবারের আয়ে সহায়তা করতেন। কিন্তু প্রায় প্রতিটি দুর্যোগেই তাঁর হাঁস-মুরগি মারা যেত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। ফলে আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎসটি বার বার নষ্ট হয়ে যেত। এতে পরিবারে খাদ্য সংকট তৈরি হতো এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়ে যেত।

সালমা বলেন, “প্রতিবার দুর্যোগ এলেই মনে হতো আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে। আয় এর উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হবার পাশাপাশি পরিবারের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ত।”

সালমা বেগম UNWomen-এর EMPOWER Project-এর আওতায়, বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস পরিচালিত উঠান বৈঠক এবং জলবায়ু মেলা-য় অংশগ্রহণ করেন। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, দুর্যোগ প্রস্তুতি, জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা, লবণাক্ততা-সহনশীল সবজি চাষ, উঁচু মাচায় হাঁস-মুরগির ঘর নির্মাণ, সঞ্চয়ের কৌশল, বিকল্প আয়ের সুযোগ এবং পরিবার ও সমাজে নারীর অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যাবহারিক জ্ঞান অর্জন করেন। এসব কার্যক্রম শুধু তথ্য প্রদানেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং নারীদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি, সমস্যা বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে।

অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সালমা নিজ উদ্যোগে অল্প খরচে কাঠ ব্যবহার করে হাঁস-মুরগির জন্য উঁচু মাচায় একটি ঘর নির্মাণ করেন, যা বন্যার সময় হাঁস-মুরগিকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করবে। ফলে দুর্যোগের মধ্যেও তাঁর আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।

একই সঙ্গে তিনি সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলেছেন এবং জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও প্রস্তুত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি পরিবারে অর্থনৈতিক অবদান রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

সালমা বলেন, “আগে আমরা ভাবতাম দুর্যোগ মানেই শুধু ক্ষয়ক্ষতি। এখন বুঝতে পেরেছি, আগে থেকেই প্রস্তুতি নিলে এবং সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে জীবিকার ক্ষতি রোধ করা সম্ভব। উঠান বৈঠক থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো আমার জীবন বদলে দিয়েছে।”

আজ সালমা বেগম শুধু নিজের পরিবারকেই আরও সহনশীল করে তুলেননি, তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের অন্যান্য নারীদেরও জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা গ্রহণে উৎসাহিত করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে তিনি প্রতিবেশীদের দুর্যোগ প্রস্তুতি, নিরাপদ হাঁস-মুরগি পালন এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ সম্পর্কে সচেতন করছেন।

সালমা বেগমের গল্প প্রমাণ করে যে, নারীদের ক্ষমতায়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজনমূলক উদ্যোগে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পরিবার, সমাজ এবং পুরো সম্প্রদায় আরও সহনশীল ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন