উৎপাদনহীন ও লোকসানে থাকা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস ও হার্ডবোর্ড মিলের জায়গায় লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন কারখানা তৈরি করতে চায় সরকার। দেশ-বিদেশে এর চাহিদা তুলে ধরে শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবীত ও নতুন পণ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠান স্থাপনে চীনের সহায়তা চেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। চীনের রাষ্ট্রদূতকে শিল্প মন্ত্রাণালয় উল্লিখিত উৎপাদনহীন এ দু’টি রাষ্ট্রীয় মিল সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর গত দু’যুগে রাজনীতিকরা মিল চালুর নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। এ মিল দু’টি বন্ধ হওয়ার পর খালিশপুর মৃত শিল্প নগরী বলে এখন মুখেমুখে প্রচলিত।
ভৈরব নদের তীরে খালিশপুরে ১০৩ একর জমির ওপর স্যান্ডওয়েল কোম্পানি ১৯৫৯ সালে কারিগরি সহায়তা দিয়ে নিউজপ্রিন্ট মিল স্থাপন করে। ব্যয় হয় ৭৪ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা মিলের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। এ শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রধান উৎপাদিত পণ্য নিউজপ্রিন্ট ছাড়াও বুকপ্রিন্ট, র্যাপার, ব্লু ম্যাচ পেপার ও ম্যাকানিক্যাল প্রিন্ট তৈরি হত। বছরে ৪৮ হাজার মেঃটন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। যাত্রা থেকে শুরু করে বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ৪৩ বছরে মিলটি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে। লোকসান দেখিয়ে ২০০২ সালে মিলের উৎপাদনের চাকা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। উৎপাদনহীন এ প্রতিষ্ঠান পাহারা দিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও পানির বিলসহ বিভিন্ন খাতে মাসে গড়ে ৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। গত ২৪ বছরে সব দলই মিলটি চালুর আশ্বাস দিয়ে শ্রমজীবী জনতার ভোট আদায় করে।
গত ১২ জুন প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নির্বাচনি অঙ্গীকার ছিল ‘খুলনা-৩ আসন আপনার, দায়িত্ব আমার’। ইতোমধ্যে মিলের যন্ত্রপাতি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিলামে বিক্রি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিউজপ্রিন্ট মিলের এ স্থানটির ৪৭ শতক জমির ওপর একটিভ ফার্মসিউটিক্যাল ইনগ্রেডেন্টিন এন্ড স্টার্ট নামক ওষুধের কাঁচামাল তৈরির প্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। বিসিআইসির তত্বাবধায়নে মিলটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। মিলের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আবু সাইদ প্রস্তাবিত এ প্রতিষ্ঠানে ১৪টি ওষুধের কাঁচামাল তৈরির প্রকল্প বিষয়টির বর্ণনা দেন। কিন্তু এ প্রকল্পে অর্থ মন্ত্রাণালয় পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি। ২০০৫ সালে কারখানার ১৩ একর জমি বিসিককে ইজারা দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিঃ কে ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করার জন্য বিদ্যুৎ কোম্পানি নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়।
ভৈরব নদের তীরে দৌলতপুর জুট মিল ও নিউজপ্রিন্ট মিলের মধ্যবর্তী স্থানে ১৯৬৫ সালে ৯ দশমিক ৯৫ একর জমির ওপর হার্ডবোর্ড মিল স্থাপন হয়। তিনশ’ লাখ বর্গফুট বার্ষিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু হয়। সুন্দরী কাঠ হার্ডবোর্ড তৈরির অন্যতম কাঁচামাল ছিল। সুন্দরবন কর্তৃপক্ষ এক পর্যায়ে একাধিক যুক্তি দেখিয়ে হার্ডবোর্ড মিল কর্তৃপক্ষকে সুন্দরী দেওয়া বন্ধ করে দেয়। উৎপাদিত হার্ডবোর্ড দিয়ে সিলিং, পাটিশান, স্টল, প্যাভেলিয়ান, হালকা আসবাবপত্র তৈরি হয়। এ মিলটিও ২০১৩ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সূত্রের ভাষ্য, উৎপাদনহীন ও লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় মিল ও শিল্প প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে বিদেশি বিনিয়োগে আকৃষ্ট করছে সরকার। ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদুত ইয়াও ওয়ানের সামনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা বন্ধ মিল পুনরুজ্জীবনে বিকল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণে সহায়তা চেয়েছে। পুরানো কাঠামো ধরে রাখার পরিবর্তে নতুন বিনিয়োগ, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এসব সম্পদকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার কৌশল নিয়েছে সরকার। মন্ত্রণালয় খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস ও হার্ডবোর্ড মিলের জায়গায় লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা তুলে ধরে চীনের রাষ্ট্রদূতের কাছে সেদেশের বিনিয়োগের প্রত্যাশা করেছে।
বাণিজ্য, বস্ত্র, পাট ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর মিল দু’টির পুনরুজ্জীবন, বেকারত্ব মোচন ও প্রকল্প ভিত্তিক বিনিয়োগের বিষয়টি চীনের কাছে তুলে ধরা হয় বলে গণমাধ্যমকে জানান। প্রসঙ্গ নিয়ে বলেন, বন্ধকৃত মিলে যে-সব পণ্য উৎপাদন হতো এখন দেশে-বিদেশে আর এসবের ব্যবহার নেই। অর্থনীতিক দিকে থেকে এগুলো মূল্যহীন। উৎপাদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানের বয়স ৬০-৭০ বছর পার হয়েছে। বেকারত্ব মোচনের লক্ষ্যে এবং সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নতুন শিল্পের প্রসারে নানা কৌশল নেওয়া হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

