রবিবার । ১০ই মে, ২০২৬ । ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩

কয়রার মৌচাষে নতুন দিগন্ত

সাইফুল ইসলাম, কয়রা

কয়রা উপজেলা ও সুন্দরবন সংলগ্ন নদীপাড়ে গড়ে উঠছে মৌবক্সভিত্তিক মধু চাষের এক নতুন সম্ভাবনা। একসময় যেখানে বননির্ভর মৌয়ালরা ঝুঁকি নিয়ে প্রাকৃতিকভাবে মধু সংগ্রহ করতেন, এখন সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে মৌবাক্স বসিয়ে নিরাপদ ও টেকসই উপায়ে মধু উৎপাদনে ঝুঁকছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন যুবক ও কৃষক মৌবাক্স স্থাপন করে নিয়মিত মধু সংগ্রহ করছেন। বনাঞ্চলের ফুল, গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এসব এলাকায় উৎপাদিত মধুর মান ও স্বাদ অন্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন ও উৎকৃষ্ট।

সরেজমিন দেখা যায় এমন ব্যস্ত দৃশ্য। মৌ বাক্সের পাশে দাঁড়িয়ে মৌচাষি রিফাত হোসেন বলেন, “এগুলোই আমাদের মৌমাছির ঘর। সুন্দরবনের বিভিন্ন ফুল থেকে ওরা মধু এনে এখানে জমা করছে। এখন আর আমাদের বনের ভেতরে যেতে হয় না, বনের পাশেই বসে মধু সংগ্রহ করছি।”

সাতক্ষীরা থেকে আসা মৌচাষিদের একটি দল বর্তমানে বানিয়াখালী গ্রামের নদীপাড়ে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছে। তাঁদের মোট ৪০০টি মৌ বাক্সের মধ্যে ১২০টি এখানে রাখা হয়েছে। তীব্র রোদ থেকে মৌমাছিকে রক্ষা করতে বাক্সগুলোর ওপর খড় ও চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।

মৌচাষিরা জানান, “মৌমাছিরা নদী পেরিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে অন্তত তিন কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে ফুল থেকে মধুর রস সংগ্রহ করে। কয়েক দিন আগে তাঁরা প্রায় তিন মণ মধু সংগ্রহ করেছেন। এখন সুন্দরবনে কেওড়া ফুল ফোটা শুরু হওয়ায় উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তাঁরা।”

মৌচাষি রিফাত হোসেন জানান, “তাঁদের ৪০০টি মৌবাক্স পরিচালনায় বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়। গত বছর তাঁদের আয় হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ টাকা। তবে ফুলের মৌসুম না থাকলে মৌমাছিকে চিনি খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। প্রতিটি বাক্সে রানী মৌমাছি থাকা জরুরি, না হলে শ্রমিক মৌমাছিরা অন্যত্র চলে যায়।”

কয়রার সুন্দরবনসংলগ্ন শাকবাড়িয়া নদীর তীরেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সারি সারি মৌবাক্স বসিয়ে কাজ করছেন মৌচাষিরা। বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে মৌচাকের ফ্রেম ঘুরিয়ে মধু আলাদা করা হয়। পরে সেই চাক আবার বাক্সে ফিরিয়ে দিলে মৌমাছিরা নতুন করে মধু জমাতে শুরু করে।

শাকবাড়িয়া নদীর তীরের মঠবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাড়ির পেছনে কয়েকটি মৌবাক্স ঘিরে স্থানীয় নারী-পুরুষ ব্যস্ত সময় পার করছেন। মৌচাকের ফ্রেম বের করে ব্রাশ দিয়ে মৌমাছি সরিয়ে মেশিনে বসিয়ে ঘুরিয়ে মধু আলাদা করা হচ্ছে।

কয়রায় অবস্থিত বন বিভাগের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীন বলেন, “এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে সুন্দরবনের ওপর চাপ কমছে এবং মৌয়ালদের ঝুঁকিও হ্রাস পাচ্ছে।”

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, “এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। বনে না গিয়েও সুন্দরবনের মধু আহরণের একটি নিরাপদ ও টেকসই বিকল্প তৈরি হচ্ছে।’

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন