৪৫ বছর বয়সী রিপন হাওলাদার। তিন ছেলে মেয়ে, স্ত্রী আর মা’কে নিয়ে ছয় সদস্যের সংসার। বসবাস করেন দৌলতপুর কুলি বাগান এলাকায়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। দেড় দশক আগে দৌলতপুর রেললাইনের পাশে খালি জায়গায় দোকান বসান। বাধা না পেয়ে পরবর্তীতে দোকানের উপর টিনের ছাপড়া দেন। সেই থেকে স্বল্প মূল্যে বাচ্চাদের কাপড় বিক্রি করেন। রেলওয়ের জায়গা। যে-কোনো সময় উচ্ছেদ হতে পারেন। জেনেও পেটের দায়ে ব্যবসা করছেন।
রিপন হাওলাদার খুলনা গেজেটকে বলেন, ‘প্রতিদিন দোকান খুলতে না পারলে পেট চলে না। গত সপ্তাহে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অবৈধ জায়গা ছেড়ে দেওয়ার জন্য মাইকিং করেছে। পরিস্থিতি বোঝার জন্য সবাই এক সপ্তাহ দোকান বন্ধ রাখি। দোকান বন্ধ থাকায় বেচা বিক্রি করতে না পারায় দারিদ্রতা নেমে আসে সংসারে। এটা শুধু আমার বেলায় নয়। রেল লাইনের দু’পাশে যারা ব্যবসা করছে সবার একই অবস্থা। সবাই আমরা গরীব। উচ্ছেদ করলে আমাদের পেটে লাথি মারা হবে।’
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রিপন হাওলাদারের মতো অসংখ্য নারী পুরুষ রেল লাইনের দু’পাশে কাপড়-চোপড়, শাক সবজি, ফলমূল, পান সুপারি, আলু, পেঁয়াজ, রসুন প্রসাধনীসহ নানান ধরনের পণ্য সামগ্রী বিক্রি করে সংসার চালান।
অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের অসাধু কর্মকর্তা এবং বাজার কমিটির নেতৃবৃন্দকে ম্যানেজ করে ঝুঁকিপূর্ণ রেল লাইনের জায়গা দখল করে চলছে রমরমা বেচাকেনা। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।
ফলোুতিতে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন। মাঝে মধ্যে ছোটোখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। বড়ো ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে। রেল লাইনের দু’পাশে পথচারীদের চলাচলের রাস্তা দখল করে দোকানপাট গড়ে ওঠায় ক্রেতা সাধারণেরকে ঠেলাঠেলি এবং ঝুঁকি নিয়ে মালামাল ক্রয় করতে হয়।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও অদৃশ্য কারণে থেমে যায়। অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন অনেকে।
জানা গেছে, সম্প্রতি রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আগমনকে কেন্দ্র করে রেলের জায়গা দখলকারী ব্যবসায়ীদের সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়। এতে কর্ণপাত করেনি কেউই। তবে সপ্তাহখানেক দোকান ঘরের উপর টিনের ছাপড়া এবং পলিথিন খুলে রাখা হয়। রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন শেষে চলে যাওয়ার পর পুনরায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী টিনের চাল এবং পলিথিন স্থাপন করেছে। বাকিদের স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
খুলনা রেলওয়ে অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত কানুনগো মোঃ রুহুল আমিন খুলনা গেজেটকে বলেন, ‘রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনে আসার প্রোগ্রাম দেওয়ার পর মাইকিং করে সবাইকে রেলের জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। বাজার কমিটিকেও বলা হয়েছিল রেলের জায়গায় অবৈধ স্থাপনা থাকতে পারবে না। তবে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। মাইকিংয়ের পর সাময়িক স্থাপনার উপরের ছাপড়া খোলা হয়েছিল। আবারও তারা পূর্বের অবস্থানে ফিরে গেছে। বিষয়টা আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। এখন একটা বড়ো ধরনের উচ্ছেদ অভিযান প্রয়োজন। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলেছি, দ্রুত উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। মুখে বললে কেউ শুনছে না, সরেও যাচ্ছে না। উচ্ছেদ অভিযানের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট লাগবে। ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার অনুমতি লাগবে। বাজার কমিটিকে বলেছি আপনারা দায়িত্ব নেন। আপনারা বসিয়েছেন। না শুনলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব। টাকা লেনদেনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ভিত্তিহীন।’
রেলওয়ের আমীন মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অবৈধ স্থাপনার ব্যাপারে আমি নিজে সরজমিনে যেয়ে তাদেরকে নিষেধ করেছি। সাথে কানুনগো ছিল। ডিও স্যারের নির্দেশে মাইকিং করেছি। বাজারের সভাপতিকে বলেছি। ডিও স্যার পরিদর্শন শেষে চলে যাওয়ার পর তারা আবার বসেছে। বললে শোনে না। এখন কী করব। মারামারি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমাদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। তারা শুনে না।’
বাজার কমিটির সভাপতি শেখ আসলাম হোসেন বলেন, ‘আপাতত তারা একটু পলিথিন মুড়ি দিয়ে আছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের যখন উচ্ছেদ করার প্রয়োজন হবে। উচ্ছেদ করবে। এরা গরীব মানুষ কিছু শাকসবজি নিয়ে বসে। উপরে পলিথিন দিয়ে কোনো মতে ব্যবসা বাণিজ্য করে। অনেক মহিলারা আছে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পলিথিন মুড়ি দিয়ে শাক সবজি বিক্রি করে। গরিব মানুষের পেটে লাথি মেরে লাভ কি? এরাতো গরিব মানুষ। কর্ম করে খায়। চিটিংবাজি করে খাচ্ছে না। মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি করছে না। বাবা খোর, গাঁজাখোর, সারা দেশের সবকিছু চলছে তাদের দিকে খেয়াল নেই। ফুটপাতে এক দেড়শ লোক কর্মসংস্থান করে খাচ্ছে। তাদের পিছে আপনারা লাগেন না। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনের করে গেছে এখন তারা পলিথিন মুড়ি দিয়ে একটু বসবে। যখন উচ্ছেদ হবে কোথাও একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিবে, তখন তারা সে জায়গায় চলে যাবে। এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে।’
খুলনা গেজেট/এনএম

