সীমান্তবর্তী মহকুমা সাতক্ষীরাতেও ভাষা আন্দোলনের ঢেউ লাগে। আশাশুনির বুধহাটার কাছে হাবাশপুর গ্রামের সন্তান বাম চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ সরদার আনোয়ার হোসেন ও তালা উপজেলার খলিশখালী গ্রামের স্বদেশ বসু দৌলতপুর বিএল অ্যাকাডেমির ছাত্র ছিলেন। তারা দু’জনেই একই দর্শনে বিশ্বাসী। ছাত্র ফেডারেশনের সক্রিয় কর্মী। তালা তেতুলিয়া গ্রামের সন্তান সৈয়দ কামাল বখত সাকী ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে এবং ইসলামকাঠি গ্রামের তুষার মজুমদার ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলি হওয়ার পর দেশবাসী ফুঁসে উঠে।
সাতক্ষীরা পৌরসভার সুলতানপুর এলাকার নাট্যকার মীর মোকসেদ আলীর পুত্র মীর মঞ্জুর আলী ও সাতক্ষীরা বারের একসময়কার আইনজীবী সামসুল হক ঢাকায় লেখাপড়া কালীন সময়ে ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন। সামসুল হক ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। এক সময়কার শিক্ষক নেতা শেখ আমানুল্লাহ যশোরে লেখাপড়া করতেন। তিনি সেখানে ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন। এছাড়া পিসি কলেজের ছাত্র সাতক্ষীরার সন্তান এ্যাড. মুনসুর আহমেদ সেখানে তমুদ্দুন মজলিশের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। সে সময় সাতক্ষীরাতে রাজনৈতিক দলের তৎপরতা ছিল না। স্থানীয় ছাত্র-জনতাকে ভাষা আন্দোলনের মূল স্রোতের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য সাহিত্যিক মোঃ ওয়াজেদ আলীর পুত্র সুশোভন আনোয়ার আলী সামসুল হক ও তারাপদ রায় চৌধুরী সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাতক্ষীরা কলেজ কেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৫০ সালের দিকে সাতক্ষীরা কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা মর্যাদার দাবিতে ক্লাশ বর্জন ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়।
ভাষা আন্দোলনে খুলনার অগ্র সৈনিক এম এ গফুর, মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা, বিএল অ্যাকাডেমির ছাত্র সংসদের জিএস সৈয়দ কামাল বখত সাকী ও সুশোভন আনোয়ার আলীর নেতৃত্বে শহরে বড় আকারের মিছিল বের হয়। মিছিল শেষে গুড়পুকুরের পাশে বটতলায় সভা অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে সুশোভন আনোয়ার আলীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ঢাকাস্থ জাগ্রত সাতক্ষীরা সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক স্মরণিকায় আসাদুল্লাহ খান স্মৃতি চারণ করতে যেয়ে বলেন, ৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র মিছিলে গুলিবর্ষণের খবর ঐ দিনই সন্ধ্যায় টেলিগ্রাম মারফত সাতক্ষীরা শহরে পৌঁছায়। তখনকার দিনে দৈনিক পত্রিকাগুলো পৌঁছাত এক দিন পর পর। ঢাকা একুশে ফেব্রুয়ারির গুলির ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পরবর্তীতে সাতক্ষীরায় এসে বর্ণনা করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ডাক্তার শামসুর রহমান। এ খবর শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুদিন পর সুশোভন আনোয়ার আলীর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন কমিটি গড়ে উঠে। সাতক্ষীরা কলেজ ও পিএন হাইস্কুলের ছাত্ররা ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হয়। ঢাকার আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করে এবং সাতক্ষীরার আন্দোলন সংগ্রামের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আন্দোলনকারীরা ঢাকাতে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কাছে টেলিগ্রাম করেন। ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও এই মিছিলে সম্পৃক্ত হয়। সাতক্ষীরা গার্লস স্কুলের ছাত্রী গুল আরা খান ও সুলতানা চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল মহিলা কর্মী গড়ে ওঠে। তারা ২২ ফেব্রুয়ারি শহরে মিছিল বের করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি গুড় পুকুর পাড়ে আমবাগান চত্বরে এক জনসভায় ঢাকায় ছাত্র হত্যার সাক্ষী ডাঃ শামসুর রহমান জনতার সামনে একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনার বিবরণ দেন। ১৯৫২ সালের মার্চ মাসে পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সাতক্ষীরায় আসেন। তখন সাতক্ষীরা শহরে বাস বা যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল ছিল না। শহরে চলত গরুর গাড়ি। কলারোয়া থেকে গরুর গাড়িতে চড়ে মাওলানা ভাসানী সাতক্ষীরায় আসেন এবং গুড়পুকুর বট তলায় জনসভায় বক্তৃতা করেন। তিনি সাতক্ষীরার জনগণকে ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তখনকার দিনে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে ছাত্ররা রাস্তায় গান গেয়ে এ আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। শিল্পীদের এই গ্রুপের নেতৃত্ব দেন শোভন আনোয়ার আলী। তার সাথে ছিলেন গণসংগীত শিল্পী কুকরালী গ্রামের শেখ লুৎফর রহমান, রসুলপুরের শহীদুল্লাহ খান ও রবীনের চাচা খোকন।
১৯৪৮ সালে বড়লাট কায়েদা আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ঘোষণা উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উক্তির প্রতিবাদে সংগীত শিল্পী শেখ লুৎফর রহমান তার বন্ধু কবি আনিসুল হক চৌধুরীকে দিয়ে লিখিয়ে নেন নতুন গান ‘ওরে ভাইরে ভাই বাংলাদেশে বাঙালি আর নাই’। তিনি পঞ্চাশ দশকেই অগ্রণী শিল্পী সংঘের মাধ্যমে গণসংগীতের ধারায় নতুন আন্দোলনের সূচনা করেন। দেবহাটা উপজেলার ধোপাডাঙ্গা গ্রামের সন্তান বাম চিন্তা চেতনায় উদ্বুদ্ধ লুৎফর রহমানও ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির পর এখানকার জনগণ বিজয়ের আনন্দে ফেটে পড়ে।
খুলনা গেজেট/এএজে

