১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত খুলনায় ভাষা আন্দোলনের পাদপীঠ ছিল দৌলতপুর সরকারি বিএল কলেজ। এ কলেজকে কেন্দ্র করেই জেলায় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। বিভিন্ন সময় অংশ নেন রাজনীতিক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা।
ভাষা আন্দোলনে খুলনায় ১৯৪৮ সালের ২৬ তারিখে প্রথম ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় বিএল কলেজের তিনটি ছাত্র সংগঠনের নেতাদের নিয়ে। (১) মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা তাহমিদ উদ্দিন হন আহ্বায়ক, (পরবর্তীকালে টেক্সটাইল কর্পোরেশনের কর্মকর্তা)। অন্যান্য সদস্যরা হলেন (২) ছাত্র কংগ্রেসের নেতা ও তৎকালীন বি, এল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি শৈলেন চন্দ্র ঘোষ, এ, কে চান মিয়া। ১৯৪৭ সালে বি, এল কলেজ সংসদের ভিপি ছিলেন। পরবর্তীকালে পুলিশ সুপার (অবঃ)। (৩) ছাত্র ফেডারেশন : আনোয়ার হোসেন, ধনঞ্জয় দাস, সন্তোষ দাশগুপ্ত, স্বদেশ বোস। (আনোয়ার হোসেন শহীদ হন ২৪-৪-১৯৫০) (৪) মুসলিম ছাত্রলীগের আর যারা তারা হলেন জিল্লুর রহমান, বর্তমান এ্যাড. কুষ্টিয়া।
নূরুল ইসলাম (বিএনপির নেতা), খন্দকার আঃ হাফিজ, পরবর্তীকালে এ্যাড. ও এমপি, এস, এম, জলিল, ক্রীড়া সম্পাদক, বি, এল কলেজ ছাত্র সংসদ (‘৪৭- ‘৫০), পরবর্তীকালে বিমা ব্যবসায়ী ও বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়। কাজী মোঃ মাহবুবুর রহমান, পরবর্তীকালে ম্যাজিস্ট্রেট, সভাপতি, খুলনা সাহিত্য পরিষদ। শেখ হাসান উদ্দিন, ১৯৪৭ ও ‘৪৮ বি, এল কলেজ ছাত্র সংসদের জি এস, পরবর্তীকালে সরকারি জনসংযোগ কর্মকর্তা। আবুল কালাম মোস্তফা, পরবর্তীকালে অধ্যক্ষ। এম মনসুর আলী, এ্যাড. ও প্রাক্তন মন্ত্রী। শেখ রাজ্জাক আলী, এ্যাড. প্রাক্তন স্পীকার, এম, পি। মোমিন উদ্দিন আহমেদ, এ্যাড. প্রাক্তন মন্ত্রী। এস এম আমজাদ হোসেন, এ্যাড. ও প্রাক্তন মন্ত্রী। সভাপতি তমুদ্দুন মজলিস, খুলনা শাখা, আফিল উদ্দিন, মতিউর রহমান (তৎকালীন স্কুল ছাত্র গ্রেপ্তার হন) ও আরও অনেক। যুব মুসলিম লীগ নেতা, আবু মোহাম্মদ ফেরদৌসও ১৯৪৮ এর কর্মী ও নেতা। উপর্যুক্ত নেতৃবৃন্দ অনেকেই ১৯৫২ সনেও ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন।
ন্যাপ নেতা ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের এমপি ১৯৫২ এর ছাত্রনেতা মরহুম আব্দুল গফুর ছিল এ সময়ের ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক। অন্যান্যরা হলেন এ কে শামছুদ্দিন শুনু (লেখক ও ন্যাপ নেতা), লু, র, জাহাঙ্গীর, ছাত্রনেতা (সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশের ডাক), কাজী নুরুল ইসলাম পরবর্তীকালে সচিব, মরহুম আব্দুল বারি এম, পি, শেখ তোফজ্জেল হোসেন, আলতাফ হোসেন (ন্যাপ নেতা), সরদার আব্দুস সাত্তার, খন্দকার এনামুর রহমান (শিক্ষক, মডেল স্কুল), জাহিদুল হক, অধ্যক্ষ, মালিক আতাহার, সমীর আহাম্মদ, নূরুল ইসলাম নান্নু (এ্যাড.), মোঃ সাইদুর রহমান সাইদ, এস, এম, এ মোত্তালিব, গোলাম ছরোয়ার, আইনুল হক, আছাদুল হক, আঃ করিম, আলী আশরাফ, মোশাররফ হোসেন, আলি রেজা, আবু হানিফ, জিল্লুর রহিম, মোঃ আঃ ওহাব, সৈয়দ কামাল বখত ও আরও অনেকে।
মহিলা, ছাত্রী ও শিক্ষার্থী যারা : আনোয়ারা খাতুন (অধ্যক্ষ), ফাতেমা খাতুন (সদস্যা, নারী রক্ষা সমিতি, পরবর্তীতে বি,সি, আই,সি’র ডঃ এবং ফেরদৌস সাহেবের বোন), মাজেদা খাতুন (অধ্যক্ষা, মাজেদা আলী), রোকেয়া বেগম শিরিন (ডঃ মাহবুবের স্ত্রী), লুৎফুন নাহার রেবাম, সাজেদা হোসেন, রাবেয়া খাতুন, লুচি, রোজি, কামরুননেছা, খায়রুন নাহার বেবী ও আরও স্কুলের বহু ছাত্রী। যে, যুগে মেয়েরা ঘর হতেই বের হতো না, সেখানে প্রকাশ্যে মিছিল, ব্যানার হাতে রাস্তা প্রদক্ষিণ করা চরম বিস্ময়কর ব্যাপার। ‘৫২-এর রক্তাক্ত শহীদ ভাইদের প্রাণের দাবিতে বের হতে বাধ্য হয় প্রতিবাদমুখী বোনেরা। ভাষা সৈনিক আবু মোঃ ফেরদৌস এর ভাষায় মেয়েরা রাস্তায় নেমেছে, মিছিল করেছে। বোরকা পরেই মাজেদা (বেগম মাজেদা আলী) নেতৃত্ব দিয়ে লেডিস পার্কে নিয়ে এসেছে মেয়েদের মিছিল। তৎকালীন আর,কে, গার্লস কলেজের ডিগ্রীর ছাত্রী পরবর্তীতে অধ্যক্ষ।
অধ্যক্ষ আনোয়ারা খাতুন বলেন, “প্রায় ২০০ ছাত্রীদের মিছিল করোনেশন গার্লস স্কুলের দক্ষিণ মোড়, পিটিআই-এর চৌরাস্তা হতে হাজী মহসীন রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, যশোর রোড হয়ে লেডিস পার্কে সভা করে প্রতিবাদ মিছিলটি পুনরায় পি,টি,আই মোড়ে শেষ হয়। দুই পাশের রাস্তার বাড়িঘর হতে পুরবাসীরা দেখেছে আমাদের প্রতিবাদ মিছিল, হাত নাড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে উৎফুল্লভাবে ছাদের উপর থেকে।
ভাষা সৈনিক আইনজীবীরা : এ্যাড. এ,এফ,এস, আব্দুল জলিল, পার্ট অধ্যক্ষ, বিএল কলেজ ইসলামের ইতিহাস বিভাগ, বিএল কলেজ (১৯৪৭-‘৪৮), এ্যাড. আঃ জব্বার (১৯৭১ এ শহিদ), এ্যাড. এ, এইচ দেলদার আহম্মেদ, প্রাক্তন মন্ত্রী, (পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার), মোস্তা গাউসুল হক (প্রাক্তন মন্ত্রী পূর্ব পাকিস্তান সরকার), আব্দুল হামিদ, আলী হাফেজ, নকিব উদ্দিন সরদার, আব্দুস সাত্তার, আব্দুল ওহাব মোক্তার, গোলাম সায়ীদ মোক্তার প্রমুখ। ভাষা সৈনিক তাহমিদ উদ্দিন, আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস, আবুল কালাম শামছুদ্দিন সুনু, শেখ তোফাজ্জেল হোসেন, এস,এম,এ মোত্তালেবের স্মৃতিচারণ হতে জানা যায়, এ সকল আইনজীবীদের ভূমিকা। শেখ তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, আমিও গ্রেফতার হই ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী আন্দোলনে। এ সময় এ্যাড. আব্দুল জব্বার, গোলাম সায়ীদ মোক্তার অর্থ দিয়ে কোর্টে মামলা পরিচালনা করেছেন সর্বক্ষণ।
খুলনা গেজেট/এনএম

