মঙ্গলবার । ১৬ই জুন, ২০২৬ । ২রা আষাঢ়, ১৪৩৩

পোনা সংকটে বিপর্যস্ত চিংড়ি শিল্প লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা

মোঃ সাগর মল্লিক, ফকিরহাট

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম রপ্তানিমুখী চিংড়ির রেণু পোনার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু পোনা আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনার ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা, হ্যাচারি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিদেশ থেকে পোনা আমদানির জটিলতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় উৎপাদন, বাজার, কর্মসংস্থান ও ফকিরহাট উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার ওপর।

ফকিরহাট সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য মতে, উপজেলায় বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে নিবন্ধিত ৮ হাজার ৪টি ঘের ও ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। যেখানে বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ বাগদা ও ৭ কোটি ৪৬ লাখ গলদার রেণুর (মোট ১১ কোটি ৭২ লাখ) চাহিদা রয়েছে। তবে স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, বাস্তবে ঘেরের সংখ্যা ও উৎপাদন কাঠামো বিবেচনায় এই চাহিদা মৎস্য বিভাগের হিসেবের চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি। উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী কেন্দুয়া ও কোদলার বিল মিলিয়ে ঘেরের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। যেখানে চলতি মৌসুমে রেণু পোনার চাহিদা প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি। এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাস ঘেরে রেণু ছাড়ার মূল মৌসুম হলেও, ইতোমধ্যে দু’মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু চাষিরা চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রেণু পোনা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হ্যাচারি পোনার সরবরাহ চাহিদার তুলনায় মাত্র ৮ শতাংশ।

ঠিকরিপাড়া এলাকার প্রান্তিক চাষি দাউদ হায়দার বাবু ফকির জানান, প্রতি বছর ১ লাখ ২০ হাজার পোনা ছাড়লেও, এবার মৌসুমের শেষ সময়ে এসে মাত্র ১৮ হাজার পোনা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ঋণ নিয়ে ঘের প্রস্তুত করে মাছ ছাড়তে না পারায় তিনি এখন দিশেহারা। অনুরূপ সংকটের কথা জানান পিলজংগ এলাকার চাষি শওকত আলী। এপ্রিল মাসে ঘের প্রস্তুত করে রাখলেও ১৫ জুন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পোনা পাননি তিনি।

নলধা, গাবখালী ও কাঁঠালতলার প্রবীণ চাষি নজরুল সর্দার, হাফিজুর রহমান ও কামরুল মোড়ল জানান, হ্যাচারির পোনার তুলনায় প্রাকৃতিক পোনার বেঁচে থাকার হার বেশি এবং উৎপাদিত চিংড়ির গুণগত মান ভালো হয়। তাদের দাবি, হ্যাচারির পোনা মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ টিকে থাকে, যেখানে প্রাকৃতিক পোনার ক্ষেত্রে তা প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে প্রাকৃতিক পোনা তাদের কাছে বেশি লাভজনক।

আড়তদার শেখ মনি জানান, বাজারে পোনার দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছর প্রতি হাজার পোনা ১,৩০০ থেকে ১,৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকায় পৌঁছেছে।

ফকিরহাট প্রাকৃতিক চিংড়ি পোনা আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম খোকন জানান, স্থানীয় পর্যায়ে পোনা না থাকায় তারা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনার নদী-সমুদ্র এবং সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আসা বাগদা ও রেণু পোনার ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু এগুলো পরিবহন ও সংগ্রহের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জব্দ ও আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে।

মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ফকিরহাটে গত অর্থবছরে মোট ২,৩১৫ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২,৪৩০ মেট্রিক টন। চাষিদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশও অর্জন করা সম্ভব হবে না।

বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচএম রাকিবুল ইসলাম জানান, মান নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে ২০১১-১২ সালের ৭৮টি হ্যাচারির স্থলে ২০২৫-২৬ সালে তা ৩৭টিতে নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘সরকারি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিকদের এসব বেসরকারি হ্যাচারির মান নিয়ন্ত্রণ বা সরাসরি ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই। তবে হ্যাচারি মালিকরা কারিগরি সহায়তা চাইলে তা দেওয়া সম্ভব।’

ফকিরহাট সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, ‘প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু পোনা আহরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ হওয়ায় অভিযান চালানো হচ্ছে।’

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন