দর্শনার বড় শোলুয়া গ্রামের একটা উঠোনে আজ কেউ ভাত বাড়ছে না। সেই উঠোনে এক মা বসে আছেন। মায়ের নাম আসমা বেগম। তার ছেলে দশ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। গত বছর কোথাও সুযোগ মেলেনি, একটা পুরো বছর সে অপেক্ষা করেছে। এ বছর মিলল। মা হয়ত সেদিন প্রতিবেশীকে বলেছিলেন, ‘আমার আজমুল এবার পেরেছে।’ ১৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের এক মেসে সেই ছেলে চোর হয়ে গেল। অভিযোগ, কারও ভাত সে চুরি করে খেয়ে ফেলেছিল। তাকে মারা হলো। মাথার চুল কেটে ফেলা হলো। ছাদে তুলে আবার মারা হলো, তারপর ছাদ থেকে ছেলেটা পড়ে গেল। রাত দেড়টায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যখন নেওয়া হলো, লাশের আর কিছু বলার ছিল না। এক থালা ভাত। এই ঘটনা শুনে অনেকের মনে হবে, এমন কিছু এই প্রথম ঘটল। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। আমরা প্রতিবার শোকে স্তব্ধ হই।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি ছিলেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। যারা তাঁকে মেরেছিল, তাঁরা বাইরের কেউ ছিল না। তারা একই হলের বাসিন্দা, একই ক্যাম্পাসের সহপাটী, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। বিচারে ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন হয়েছে, আর ২০২৫ সালে হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রেখেছে। রায় এসেছিল ঘটনার দুই বছর পর। আবরারের বাবাকে ছেলের হত্যার বিচারের জন্য বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় দাঁড়াতে হয়েছে।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল। সন্ধ্যায় চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেনকে ধরে গেস্টরুমে নেওয়া হয়। বরগুনার পাথরঘাটার এই মানুষটি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ছিলেন। রাত দশটা পর্যন্ত দফায় দফায় তাঁকে মারা হয়েছিল। মাঝখানে ক্যান্টিনে বসিয়ে ভাত খাওয়ানো হয়, তারপর আবার মারা হয়। মধ্যরাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ভাত খাওয়ানোর এই দৃশ্যটা আমাদের কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর লাগা উচিত। যে হাত মারছে, সেই হাতই ভাত এগিয়ে দিচ্ছে। এটা করুণা নয়, এ এক ধরনের নিষ্ঠুর খেলা, যেখানে মানুষটা আর মানুষ নয়, একটা খেলনা। আর এখন আজমুল হোসেন। লক্ষ্য করুন তারিখটা। দুই বছর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর আমরা তোফাজ্জলকে হারিয়েছিলাম। ঠিক দুই বছর পর আরেক ১৮ সেপ্টেম্বরে হারালাম আজমুলকে। মাঝখানের এই দুই বছরে আমরা কী শিখেছি? তিনজনের গল্প আলাদা। আবরারের ঘটনায় ছিল সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি, তার সমালোচনামূলক মতপ্রকাশের জের। তোফাজ্জল ছিলেন অসহায়, ভারসাম্যহীন, বাইরের এক মানুষ। আজমুল ছিল এক নবীন, শহরে নতুন, সবেমাত্র ভর্তি হওয়া এক ছেলে। কিন্তু তিন ঘটনার ভেতরে একটা সুতো একই। তিনজনকেই মারা হয়েছে সেই জায়গায়, যেটা তাঁদের আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল। হল, মেস, ছাত্রাবাস। আর যারা মেরেছে, তারা নিজেরাই ধরে নিয়েছে, বিচারের ভার তাদের হাতে। এ ধরনের ঘটনায় একজন মানুষ শুরুতে অভিযুক্ত থাকে, একটু পরেই অপরাধী হয়ে যায়, আর তার পরপরই শাস্তির যোগ্য। আদালতের দরকার পড়ে না, প্রমাণের দরকার পড়ে না। শুধু দরকার হয় এমন একজনের, যার পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। আজমলের বাবা হত্যা মামলা করেছেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষার্থীর নাম তাতে আছে, সঙ্গে আরও ২০ থেকে ২৫ জন অজ্ঞাতনামা।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার সময় এক লাখ টাকা চেয়ে ফোন এসেছিল। পরে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, তারা যাচাই করছে। পুলিশ জানিয়েছে, মেসের বাসিন্দাদের মধ্যে আগে থেকেই কিছু ঝামেলা ছিল এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। সত্য যেদিকেই যাক, সেটা আদালতে প্রমাণিত হোক। সোনাডাঙ্গার রাস্তা অবরোধ করে বসতে হয়েছে আজমুলের সহপাঠীদের। এ মানববন্ধনে নগরপিতা, নন্দিত নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু একাত্মতা পোষণ করেন। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এসে দাঁড়িয়েছেন, পাশে দাঁড়িয়েছে নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থীরাও। এক মৃত ছাত্রের বিচার চাইতে বেঁচে থাকা ছাত্রদের রাস্তায় বসতে হয়। এর চেয়ে বড় লজ্জা আমাদের কী হতে পারে? তবু একটা কথা, কয়েকজনের অপরাধে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে দোষ দেওয়া যায় না। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো ছাত্র নিরপরাধ। দোষী কারা, তা আদালত ঠিক করবে। তবে যতক্ষণ আদালত ঠিক করছে না, ততক্ষণ কেউ যেন বলতে না পারে যে ‘আমরা কিছু জানি না’।
প্রথম আলো লিখেছে, ‘এলাকায় ঘটনা নিয়ে জিজ্ঞেস করলে সবাই একই কথা বলে: আমরা কিছু জানি না।’ ভিড়ের হাতে খুন হওয়া মানুষগুলোর বিচার এত কঠিন হয় ঠিক এই ‘জানি না’ বলার সংস্কৃতির কারণেই। ২১ সেপ্টেম্বর দেশ রুপান্তর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি ‘আর নিতে পারছি না’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ভাত খেয়ে ফেলার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আজমুলকে পিটিয়ে হত্যার খবর আমাদের বিবেক কে নাড়া দিয়েছে। একজন মানুষ হত্যা করার জন্য কতটা অমানবিক হয়ে উঠতে হয়? ক্ষুধা, খাবার, রাগ, এসব মানুষের স্বাভাবিক জীবনের অংশ। একথালা ভাত কী মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে গেল? প্রবন্ধের ভাষায় এবছরের প্রথম আট মাসে শারিরীক নির্যাতনে ৬৮ জন, পারিবারিক পরিসরের নির্যাতনে ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। আবরারের বিচার হয়েছে, কারণ তাঁর বাবা হার মানেননি, তাঁর সহপাঠীরা রাস্তা ছাড়েননি। তোফাজ্জলের পাশে কি তেমন কেউ ছিল? আজমলের পাশে কি আমরা থাকব? আজমল আর ফিরবে না। কোনো রায়, কোনো শাস্তি তাঁর মায়ের শূন্য কোল ভরাবে না। কিন্তু আমরা এটুকু নিশ্চিত করতে পারি, যেন এই সেপ্টেম্বর যেন আরেকটা ‘ভুলে যাওয়া সেপ্টেম্বর’ না হয়ে ওঠে। যেন আগামী বছর ১৮ সেপ্টেম্বর এলে আমরা বলতে পারি, বিচার হয়েছে, আর কোনো মা এমন প্রশ্ন নিয়ে বসে নেই। আজমলের মা যদি আমাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার ছেলের কী দোষ ছিল?’ তখন আজমলের মা কে কী জবাব দেব আমরা?
খুলনা গেজেটের প্রতিবেদনে সন্তানহারা পিতা কুতুবুদ্দিনের অশ্রুসিক্ত চিত্র প্রতিবেদক জাহিদুল ইসলাম সাগর তুলে ধরেছেন। প্রতিবেদনে পিতার দীর্ঘশ্বাস ফুটে ওঠে। সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সন্তান হারা বাবা-মার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। সন্তানহারা মায়ের অশ্রু এখন ও শুকায়নি। ভাত চুরি করে খাওয়ার শাস্তি মৃত্যু। তুচ্ছ ঘটনায় তরতাজা প্রাণ গেল। সচেতন বিবেক স্তম্ভিত। কোনো শান্ত নায় মায়ের চোখের জল থামছে না।
লেখক : শিক্ষার্থী।
খুলনা গেজেট/এনএম

