সাতক্ষীরা-খুলনা সড়কটি বেশ কিছুকাল ধরে মহাসড়ক বলে পরিচিতি পেয়েছে। ‘মহাসড়ক’ কথাটা শুনতে বেশ ভালো লাগে। কিন্তু এই সড়কের দুর্দশা, অনিয়ম, অব্যবস্থার ফিরিস্তি তুলে ধরলে, স্বয়ং আল্লাহ’র আরশ কেঁপে উঠবে! ১৯৮২-৮৩ সালে এরশাদ সরকার আমলে সড়কটির সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটে। ১৯৭৬-৭৭ সালে বিএনপি সরকার আমলে এই সড়কে খুলনার পুরোনো রেডিও সেন্টার থেকে অর্থাৎ বর্তমান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা থেকে চুকনগর পর্যন্ত সড়কটিতে মাটি ভরাট এবং ইট বিছানো হেরিং বোন রাস্তা নির্মিত হয়। তারপর এরশাদ আমলে কৈয়া নদীর উপর ব্রিজ, ডুমুরিয়ার মেছাঘোনা সংলগ্ন হাম কুড়া নদীতে ব্রিজ, খর্নিয়া নদীর উপর ব্রিজ নির্মিত হয়। আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে। সেও ১৯৮২-৮৩ সালের ঘটনা। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট সেনা প্রধান থেকে রাজনীতিবিদ হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ এই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করেন।
বর্তমানে সাতক্ষীরা-খুলনা সড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ততম একটি সড়কে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন পরিবহন ট্রাক নানা ধরনের মোটরযান চলাচল করে। দুর্ভাগ্যজনক অত্যন্ত অপ্রিয় সত্যি কথা, এই সড়কটি তিনটি জেলার সংযোগ রক্ষা করলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে দারুণভাবে অবহেলিত বঞ্চিত। দক্ষিণ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার একমাত্র মাধ্যম হলেও এটি মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে। এতিম সড়কের মতো চলছে এর জীবন! পুরো রাস্তাটি সাতক্ষীরা-খুলনা খানা-খন্দকে ভরা। মেঘ বৃষ্টি হলে গর্তগুলো ছোটখাটো পুকুরের আকার ধারণ করে। শুনতে বিস্ময়কর মনে হলেও এটাই সত্য। মালবাহী গাড়ি কিংবা যাত্রীবাহী যানবাহন কিংবা রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সগুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পথ চলে। দারুণ ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়।
এই অবহেলিত দুর্ভাগা সড়কটিতে সারা বছর ধরে দুর্ঘটনা ঘটিয়েই চলেছে কিন্তু তদারকির যেন কেউ নেই। অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই করে মালবাহী গাড়িগুলো ভারবাহী জন্তুর মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে থেমে থেমে চলে সে এক নাজুক অবস্থা! কিন্তু এতসব ঘটনার পরও তদারকি বা মনিটরিং এর জন্য কাউকেও পাওয়া যায় না!
অরক্ষিত সড়কে মেয়াদ উত্তীর্ণ লক্কড় ঝক্কর নাম ঠিকানাহীন আদিকালের বাস চলছে জবাবদিহিতার কোন বালাই নেই। কিছুটা বিস্ময়কর মনে হয় তাই না? বছরের পর বছর চলছে দিনরাত সকাল সন্ধ্যা চলছে। বর্ষা গরমে শীতকালেও চলছে। কেউ খবর রাখে না। উদাসীন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কুম্ভঘুমে আচ্ছন্ন। কবে যে ঘুম ভাঙবে তাও মানুষ জানে না। এইসব পুরোনো বাসগুলোতে লেখা থাকে ‘সাতক্ষীরা-খুলনা’ বিরতিহীন যাত্রীবাহী বাস অথচ মুড়ির ঠোঙা মার্কা লক্কড় ঝক্কড় এই বাসগুলো চুকনগর থেকে খুলনার সোনাডাঙ্গা পর্যন্ত চলে অর্থাৎ মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। তারপরে অতিরিক্ত যাত্রী উঠানোর জন্য সাইনবোর্ডে লেখা থাকে : ‘বিরতিহীন দূরপাল্লার যাত্রী বাস!’ শুনতে হাস্যকর হলেও এটাই বাস্তব। বাসগুলোর অধিকাংশের কল কবজা মেশিনপত্র একেবারে ঢিলে ঢালা হয়ে গেছে। মুড়ির ঠোঙা মার্কা এই বাসগুলোতে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ২-৩ গুণ বেশি যাত্রী ঠেসে ঠেসে উঠানো হয়! অন্য উপায় না পেয়ে যাত্রীরা ওই বাসে উঠে রড ধরে দাঁড়িয়ে চুকনগর থেকে খুলনা, ডুমুরিয়া থেকে খুলনা পাড়ি দেন, কিন্তু ভাড়া আদায় করা হয় ঠিক ঠিক। যাত্রীদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে।
সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের বাসগুলোর মধ্যে পাইকগাছা- খুলনা, চুকনগর-খুলনা, এমনকি সাতক্ষীরা খুলনার দূরপাল্লার বাসগুলো যাত্রীদের কাছে থেকে তাদের ইচ্ছা মাফিক স্বেচ্ছাচার মূলক ভাড়া আদায় করছে কোন টিকিট ছাড়াই, বছরের পর বছর। এসব অনিয়ম যাত্রীদের কাছে এখন গা’ সয়া হয়ে গেছে। ঠেসে ঠেসে নারী-পুরুষ সকল ধরনের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী উঠিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা যেন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। লক্কড় ঝক্কড় মার্কা ফিটনেসবিহীন এই গাড়িগুলো তদারকির কোনো কর্তৃপক্ষ নেই সড়কে। যায় যাবে সাধারণ মানুষের প্রাণ যাবে, তাতে কর্তৃপক্ষের কি আসে যায়? কোন ট্র্যাফিক পুলিশ কিংবা বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ কোন কালেও এ ব্যাপারে ন্যূনতম মনিটরিংও করে না। ঘটনাটি বিচিত্র না! ফলে লক্কড় ঝক্কড় ওইসব বাসে উঠে ব্যস্ততম যাত্রীরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অফিস আদালত মিল কারখানা কিংবা স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করায় শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বিপাকে পড়ে। যা’ বলছিলাম, সাতক্ষীরা-খুলনা সড়কে যাতায়াতকারী দূরপাল্লার বাস কিংবা লোকাল বাস কেউই ভাড়া আদায় ব্যাপারে আন্তরিক নয়। প্রত্যেকেই স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নেয়। যদিও উল্লেখ করা রয়েছে ডুমুরিয়া থেকে খুলনার সোনাডাঙ্গা পর্যন্ত ভাড়া ৩০ টাকা কিন্তু গল্লামারি নির্মাণাধীন ব্রিজের কারণে যাত্রীবাহী বাসগুলো ডুমুরিয়া থেকে গল্লামারি জিরো পয়েন্ট হয়ে সোজা সোনাডাঙ্গা টার্মিনালে পৌঁছায়। অফিস আদালতে বিশ্ববিদ্যালয় জরুরি কাজে শহরে গমনাগমনকারী যাত্রীদের জিরো পয়েন্টে নেমে যেতে হয়। তাদেরও ভাড়া সোনাডাঙ্গার রেটে আদায় করা হয়। সোনাডাঙ্গা পর্যন্ত ৩০ টাকা ধার্য থাকলেও ডুমুরিয়া থেকে ১০ মিনিটে সোনাডাঙ্গা পৌঁছে সকল ধরনের যাত্রীর কাছ থেকে যারা রডে ঝুলে যায় একই রেটে টাকা আদায় করা হয়, যা বিবেকহীন স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর। জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত প্রকৃত ভাড়া ২০ টাকা হওয়া উচিত অথচ জবরদস্তি মূলকভাবে ৩০ টাকা ভাড়া নেওয়ায় সীমিত আয়ের দরিদ্র যাত্রীরা প্রায়শ দারুণ লজ্জায় ও বিপাকে পড়েন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সড়কে মহিলা যাত্রীদের জন্য কোন পৃথক আসনের ব্যবস্থা নাই। শুধু বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া আদায়ের স্বার্থে প্রতিদিন তাদের ঝুলে ঝুলে খুলনা যাতায়াত করতে হয়। এ ব্যাপারে বাস মালিক সমিতি, বিআরটিএ কিংবা প্রশাসন সম্পূর্ণ নীরব। সাধারণ যাত্রীরা দাবি করেছেন, যাত্রীবাহী গাড়িতে ভাড়া সংক্রান্ত একটি তালিকা থাকতে হবে আবশ্যিকভাবে। এছাড়া আন্ত : জেলা বাস মালিক সমিতির নির্ধারিত ভাড়া গ্রহণের টিকিট থাকতে হবে। এর কিছুই দায়িত্ব পালন করে না ওরা। মোটর মালিক সমিতি বাসে এক একজন স্বেচ্ছাচারী কন্ডাক্টার সেট করে যাত্রীদের কাছ থেকে পকেট কাটার কাজ ভালোভাবেই সম্পন্ন করে। বিবরনটি সরে জমিন তদন্ত করলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষ সবই জানতে পারবেন। ভাড়া গ্রহণ ব্যাপারে বন্ধ হবে স্বেচ্ছাচারিতা, টিকিট সিস্টেম চালু হলে। অন্যথায় যাত্রী এবং বাস কর্তৃপক্ষের এই চাপাচাপি অবস্থা বছরের পর বছর চলতে থাকবে। একটি স্বাধীন দেশের জন্য এটা কতটা উপযোগী? একটু ভেবে দেখবেন!
খুলনা সাতক্ষীরা মহাসড়কে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, তারপরও যেখানে সেখানে স্টপেজ তৈরি করে, যাত্রী উঠানো নামানোর কাজ করা হয়, এই লক্কড় ঝক্কড় বাসের মাধ্যমে। এই সড়কে যেসব গাড়ি চলাচল করে যাত্রী বহন করে। তাদের অধিকাংশই ফিটনেস বিহীন গাড়ি। চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যায়। যাত্রীদের মাঝপথে নেমে যেতে হয়। এছাড়াও এই সড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ ড্রাইভার এর লাইসেন্স নাই। এই কারণে বেপরোয়া চালায়, তদন্ত করলে দেখা যাবে, হেলপার কিংবা কন্ডাক্টর লাইসেন্সবিহীনভাবে ড্রাইভার হিসেবে গাড়ি চালাচ্ছে। এরা যে বেপরোয়া গাড়ি চালায় তাতে যেকোনো মুহূর্তে সড়ক দুর্ঘটনা অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রশাসন এসবের কোন কিছুর খবর রাখে না।
অসহায় ভুক্তভোগী যাত্রীরা মনে করেন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলা লক্কড় ঝক্কড় বাসগুলো প্রশাসন বিআরটিএ মালিক সমিতির যৌথ উদ্যোগে সড়ক থেকে উঠিয়ে নেওয়া উচিত। যাত্রীদের জীবন তাতে নিরাপদ হবে। ব্যবসা একটু কম হবে। উপরের এজেন্সি গুলো একটু শক্ত হলে, রাস্তায় যাত্রীদের জীবন নিরাপদ হবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। প্রশাসন বিআরটিএ উনারা কি বলবেন জানি না। তবে মানুষের জীবন নিরাপদ করতে হলে এর বিকল্প নেই। যতই নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হোক না কেন, ভেতরের গলদ থাকলে অবশ্যই দুর্ঘটনা ঘটবেই। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের এক শ্রেণির মুষ্টিমেয় অসাধু কর্মকর্তাদের মৌখিক অনুমতির আশকারা পেয়ে, এই গাড়িগুলো বছরের পর বছর দুর্নীতিবাজ মালিকদের রাস্তায় নামাতে সহযোগিতা করছে। তা না হলে পুরোনো মেয়াদ উত্তীর্ণ এইসব বাস রাস্তায় নামার সাহস পায় কি করে?
উপসংহার : সড়কপথে নিরীহ যাত্রীদের চলাচল করার সময় পৈতৃক প্রাণ হাতে নিয়ে চলতে হয়, বাস কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে। অনেক সময় অপরিকল্পিতভাবে যেখানে সেখানে স্টপেজ করার কারণে যাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওদিকে বাসের চালকের সময় ফুরিয়ে গেলে রাস্তায় ওই সব বাস বেপরোয়াভাবে সীমাহীন দ্রুতগতিতে চলতে গিয়ে প্রায়শ দুর্ঘটনা ঘটায়।
বাস বা যানবাহন কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে বলবো, “আপনারা পরিবহন ক্ষেত্রে উপার্জন করেন, নিষেধ করছি না। তবে সরকারি বিধি না মেনে বেপরোয়া চালানোর কারণে, অনিয়মের কারণে, যে জীবনগুলো দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে অকালে ঝরে যাচ্ছে, তাদের কথাও একটু স্মরণে রাখবেন।” প্রশাসনের কাছে এই সামান্য প্রত্যাশা টুকু করা নিশ্চয়ই অন্যায় হবে না। বিষয়টি নিজেরাও আরেকবার ভেবে দেখবেন।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

