বাংলাদেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে এক নাজুক অবস্থায় রয়েছে। দেশে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) শতভাগই বর্তমানে একটিমাত্র স্থান – মহেশখালীতে খালাস করা হয়। বলাই বাহুল্য, এই কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠা জরুরি। কারণ, একটিমাত্র স্থানে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা স্থানীয় দুর্যোগ পুরো দেশকে অন্ধকারে তলিয়ে দিতে পারে। চলতি ২০২৬ এর আগস্ট মাসে আমরা এটি দেখেছিও। যেহেতু, কয়লা সরিয়ে আমরা এলএনজি’র ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছি এবং আরও অনেকদিন এই নির্ভরতা বজায় থাকবে; তাই বিকল্প ভরকেন্দ্র গড়ে তোলাটাই যৌক্তিক।
সরকার বোধকরি, এ কারণেই আমূল অবকাঠামোগত পরিবর্তন শুরু করেছে। যার লক্ষ্য : ২০২৯ সালের মধ্যে জ্বালানি গ্রিডের সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীকরণ করা। এরই অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, পায়রা, হিরন পয়েন্ট এবং মোংলায় নতুন ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআর ইউ) স্থাপন করা হবে। (দেখুন, ১১ আগস্ট ২০২৬-এ প্রকাশিত একাধিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন)।
মহেশখালীর একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙার জন্যে পশ্চিম উপকূলের দিকে যাত্রা সাদাচোখে বলা যায়, একটি ভালো উদ্যোগ। যা ২০২৯ সাল নাগাদ সম্পন্ন হবে বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। মহেশখালী কেন্দ্রে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড এবং প্রযুক্তিগত বিভ্রাট শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহই বন্ধ করেনি; এগুলো শিল্প উৎপাদনকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং জাতীয় গ্রিড যে তাসের ঘরের মতো ভঙ্গুর, তা প্রমাণ করে দিয়েছে। ফলাফল, টিকে থাকার জন্য ‘বিকেন্দ্রীকরণ’ হয়েছে মূল লক্ষ্য।
এই নতুন কৌশলের প্রথম পছন্দ হচ্ছে পায়রা সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি একটি স্থান। যেখানে একটি এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক এক্সেলারেট এনার্জির সাথে একটি টার্ম-শিট চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। এই প্রকল্পটি দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান শিল্পাঞ্চলগুলোর প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্পূর্ণ অবকাঠামোগত সার্বভৌমত্বের দিকেও বাংলাদেশ একটি সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছে। তা হচ্ছে, ভোমরা (সাতক্ষীরা) -খুলনা পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে গ্যাস আমদানির জন্য দীর্ঘদিনের আলোচনা বাতিল করেছে। এটি মূলত দেশটিকে ভারতের এইচ-এনার্জি নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল। এই বাতিল করাটি আপাতদৃষ্টিতে অযৌক্তিক মনে হতে পারে। তবে, আন্তঃসীমান্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সরকার নিশ্চিত করেছে যে, দক্ষিণ-পশ্চিম নেটওয়ার্কের শতভাগ সাফল্য যেন দেশীয় পরিকাঠামো এবং উপকূলীয় প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল থাকে। যা তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ সত্ত্বেও দেশের জ্বালানি মানচিত্রের ভবিষ্যৎ তার নিজের সীমানার মধ্যেই নির্ধারণ করে। অবশ্য, এর-জন্যে অনেক ব্যয়ও করতে হবে।
রাজধানী পর্যন্ত একটি বিশাল, বিশেষায়িত লাইনের প্রয়োজনীয়তা এড়াতে পেট্রোবাংলা চার হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভোলা-খুলনা সঞ্চালন পাইপলাইনকে নতুনভাবে ব্যবহার করতে চাইছে। ২০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং দৈনিক ১৮০ মিলিয়ন ঘনফুট ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই প্রকল্পটি মূলত ভোলা দ্বীপ থেকে অভ্যন্তরীণ গ্যাস পরিবহনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। তবে, এটিতে এখন এলএনজি সঞ্চালনের জন্য ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। প্রস্তাবিত হিরণ পয়েন্ট এবং মোংলা টার্মিনাল থেকে আমদানি করা এলএনজিকে এই নেটওয়ার্কের সাথে একীভূত করে ‘সাউথওয়েস্টার্ন এনার্জি লুপ’ তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে। ঢাকা পর্যন্ত একটি পৃথক পথের খরচ বহন করার পরিবর্তে, এই লুপটি আমদানিকৃত গ্যাসকে ভোলা-খুলনা পরিকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ পাবে, যা খুলনা ও যশোরের আঞ্চলিক শিল্প চাহিদা মেটাতে পারবে। এটি স্থানীয় বিতরণ পাইপ-লাইনকে সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিম শিল্প খাতের জন্য একটি কৌশলগত ধমনিতে রূপান্তরিত করতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) মারাত্মক আর্থিক সংকটে ভুগছে। মাত্র এক অর্থবছরে জিটিসিএল ১২ দশমিক ১২ বিলিয়ন টাকার (এক হাজার ২১২ কোটি টাকা) বিশাল লোকসান করেছে। এটি কেবল পরিচালনগত ঘাটতি নয়; এটি ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ ফাঁদের কারণে সৃষ্ট একটি পদ্ধতিগত ব্যর্থতা। বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ গ্যাসের প্রবাহ কম থাকার কারণে প্রায়শই নিষ্ক্রিয় থাকা গ্যাস কম্প্রেসার স্টেশনগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জিটিসিএল বিদেশি সংস্থাগুলোকে লক্ষ লক্ষ টাকা দিতে বাধ্য হয়। গ্যাসের সরবরাহ স্থবির থাকা সত্ত্বেও, প্রায়শই নিষ্ক্রিয় থাকা অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিদেশি সংস্থাগুলোকে অর্থ প্রদান বাবদ জিটিসিএল-এর তিন হাজার মিলিয়ন বা তিনশ’ কোটিরও বেশী টাকা বেরিয়ে গেছে।
এই নগদ অর্থের অপচয় আরও বেড়েছে আইএমএফ-এর সরকারি ঋণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে। এই বিধিনিষেধ কার্যকরভাবে রাষ্ট্রকে জিটিসিএল-কে স্বাধীনভাবে এগোনোর সুযোগ দেয়নি। ফলে কোম্পানিটি এবং আমাদের জ্বালানি ভবিষ্যৎ উভয়েই উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের খামখেয়ালিপনার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বলাইবাহুল্য, এই বিকেন্দ্রীভূত গ্রিডের দিকে পরিবর্তনের জন্য অর্থায়ন ও পরিচালনা করছে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক। তাদের নিকট হতে টাকা ধার নেওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। এ কারণেই বিপিডিবি সম্প্রতি বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য ১৭ শতাংশ হতে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। প্রকৃতপক্ষে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এই ভর্তুকি বিলোপ করার পরামর্শ তিনটি প্রভাব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। একটি হচ্ছে, ভোক্তার ঘাড় হতে সম্পূর্ণ ব্যয়-উদ্ধার করা। দুই, রাজনীতিবিদদের হাত থেকে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে এমন একটি স্বয়ংক্রিয় সূত্রের হাতে তুলে দেওয়া, যাতে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও দাম ওঠানামা করতে পারে। এবং তিন, বাজার-ভিত্তিক বিনিময় হার টাকার মূল্য দুর্বল করে দিয়েছে, যার ফলে পাইপ-লাইন করার জন্য চার হাজার পাঁচশো কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করা আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
নির্মম পরিহাস হচ্ছে, বিদ্যুতের দাম ১৭-২১ শতাংশ বৃদ্ধি হচ্ছে, ’স্বয়ংক্রিয় শুল্ক সূত্র’-এর সরাসরি ফল, যা বর্তমানে জিটিসিএল-এর কোশাগার নিঃশেষ করে দেওয়া, অলস যন্ত্রপাতি ও ’ক্যাপাসিটি পেমেন্টস’-এর খরচ মেটাতে প্রয়োজন হচ্ছে।
কিন্তু, প্রশ্নটি হচ্ছে, বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে কি আমরা সুন্দরবনে উচ্চ প্রযুক্তির জুয়া খেলতে যাচ্ছি? বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের কাছে একটি গ্যাস করিডোর নির্মাণ করা, একটি পরিবেশগত ঝুলন্ত দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো কঠিনতম এক কাজ। বেঙ্গল টাইগার এবং বিপন্ন ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিনের আবাসস্থল সুন্দরবন। এই বনের পক্ষে প্রচলিত ‘ওপেন-কাট’ পদ্ধতিতে পাইপ লাইন তৈরি করা সম্ভব নয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে খনন করলে ‘নিউমাটোফোর’ (শ্বাস-শিকড়) ধ্বংস হয়ে যাবে এবং ‘টপ-ডাইং’সহ বিবিধ রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সমস্যা মোকাবেলার জন্য, আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা হরাইজন্টাল ডিরেকশনাল ড্রিলিং (ঐউউ) প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। এটিতে বনের উপরিভাগ না ভেঙে নদীর তলদেশ এবং শিকড়ের নীচ দিয়ে, গভীরে সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়। এর খরচ অনেক বেশি এবং ঝুঁকিও অনেক।
খননকাজের বাইরেও রয়েছে অ্যাসিড সালফেট মাটি উন্মুক্ত হওয়ার ‘বিপজ্জনক’ হুমকি। উপকূলীয় কাদামাটি খনন করলে সুপ্ত মাটি অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে একটি অম্লীয় প্রবাহ তৈরি করতে পারে। এমনটি ঘটলে প্রথম বৃষ্টিপাতের সাথে সাথেই এই অম্লীয় প্রবাহ স্থানীয় জলজ জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এটি একটি উচ্চ-ঝুঁকির জুয়া খেলা, যেখানে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার বিনিময়ে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের অস্তিত্ব ধ্বংসের মুখোমুখি ঠেলে দেওয়া। আমরা সুন্দরবনের খুব কাছে, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করে এমনিতেই সুন্দরবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছি। এখন বিকল্প জ্বালানি-আমদানির পথ করতে গিয়ে আমরা কি সুন্দরবনকে বিলুপ্ত হওয়ার মতো, বড় ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
আমদানিকৃত এলএনজি’র অবকাঠামো গড়ে তুলতে গিয়ে বাংলাদেশ কেন্দ্রীভূত কেন্দ্র থেকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ, উচ্চ-প্রযুক্তি সম্পন্ন, বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কের দিকে এগোচ্ছে। যাতে আমাদের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। উপরন্তু আন্তর্জাতিক ঋণ এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা ব্যয়ের ওপর এই বিকেন্দ্রীভূত একটি অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলেছে। সুন্দরবনের গভীরে খননের জন্য এইচডিডি প্রযুক্তি ব্যবহার করা এবং তার ‘সাউথ ওয়েস্টার্ন এনার্জি লুপ’ কে একীভূত করার এই চেষ্টা কি দেশে কাঙ্ক্ষিত দ্রুত শিল্পোন্নয়ন ঘটাবে? না-কি উন্নয়নের জন্য আরও অনেক দায় এদেশবাসীকে তাদের জীবন, জীবিকা ও বস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে ঘোচাতে হবে?
খুলনা গেজেট/এনএম

