রঙিন টিনের ছাউনি, সেমিপাকা ঘর, সামনে খোলা উঠান দূর থেকে দেখলে মনে হয় সাজানো-গাছানো একটি আবাসিক এলাকা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের আমলে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের জন্য মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় নির্মিত হয়েছিল এসব ঘর। তিন বছর আগে অসহায় পরিবারগুলোর চোখে এসব ঘর ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন, ছিল নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে।
কয়রা উপজেলার লালুয়া বাগালি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২৯টি ঘরের অধিকাংশেই এখন তালা ঝুলছে। সরেজমিন গিয়ে ১৩ থেকে ১৪টি পরিবারকে বসবাস করতে দেখা গেছে। সেখানে এখনো তৈরি হয়নি স্থায়ীভাবে বসবাসের ন্যূনতম পরিবেশ। নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, চারটি নলকূপই অচল। কয়েকটি ঘরের প্লাস্টারও খসে পড়ছে। যাতায়াতের রাস্তায় কাঁদা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট। ফলে ঘর পেয়েও অন্যত্র চলে যাচ্ছেন বাসিন্দারা।
উপকারভোগী হেলাল উদ্দিন, রিক্তা ও আব্দুস সাত্তার গাজীসহ কয়েকজন জানান, এখনো তাঁদের হাতে জমির দলিল দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে দুর্ভোগ বাড়ে, সন্তানদের পড়াশোনাও ব্যাহত হয়। আয়-রোজগারের সুযোগ না থাকায় অনেকেই এখানে নিয়মিত থাকতে পারেন না। বাজার করতে কাঁদাযুক্ত কাঁচা রাস্তা কিংবা নদীপথ ব্যবহার করতে হয়। ভ্যান চালিয়ে জীবিকানির্বাহ করতেও সমস্যা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ভ্যানের ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যায় না।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্প এলাকায় চারটি নলকূপ বসানো হলেও শুরু থেকেই পানি ওঠে না; লাগানো হয়নি মাথাও। পর্যাপ্ত পাইপ মাটির নিচে না বসানোর কারণেই এমনটি হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
তাঁদের ভাষ্য, “২৯টি ঘরের মধ্যে মাত্র ১৩ থেকে ১৪টি পরিবার নিয়মিত থাকে। বাকিরা কখনো থাকে, কখনো থাকে না। কর্মসংস্থান না থাকায় এখানে এসে কেউ টিকতে পারে না। আমরা কোনো রকমে কষ্ট করে জীবনযাপন করছি।”
প্রকল্পের বাসিন্দারা জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে নদীর চরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বিঘা সরকারি খাস জমি রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালীরা ওই জমি ভোগদখল করছেন। জমি উদ্ধার করে তাঁদের কাজে লাগানোর সুযোগ দেওয়া হলে মাছ চাষসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো।
বাসিন্দাদের দাবি, হাঁস-মুরগি, ছাগল ও ভেড়া পালন, দরজি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কারিগরি ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পুঁজি বা প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হলে তাঁরা নিজেরাই জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
প্রকল্পের বিধবা বাসিন্দা নিলুফা বেগমের ১১ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। অর্থাভাবে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। আগে অন্যের মৎস্য ঘের ও রাস্তার কাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতেন। অসুস্থতার কারণে কয়েকবার অস্ত্রোপচার হওয়ায় এখন ভারী কাজ করতে পারেন না।
তিনি বলেন, “সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। যদি ছাগল পালনের প্রশিক্ষণ দিয়ে কয়েকটি ছাগল দিত, তাহলে হয়ত কিছুটা উপকৃত হতে পারতাম।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বৃদ্ধ আক্ষেপ করে বলেন, “একটা পুকুর আছে, আমরা সেখানে মাছ চাষ করি। আগের ইউএনও স্যার লোকজন নিয়ে মাছ ধরতে এসেছিলেন। নিজেদের বাচ্চাদের খেতে না দিয়ে বড় মাছগুলো তাঁকে দিয়েছিলাম। বিদ্যুতের জন্য অনেক অনুরোধ করেছিলাম। তিনি ব্যবস্থা করতে চাইলেও আজও বিদ্যুৎ পাইনি।”
শুধু লালুয়া বাগালি নয়, উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের গিলাবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের আটটি ঘরেও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। সেখানকার দুটি ঘরে কেউ থাকেন না।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় কয়রায় কয়েক ধাপে ২৩৯টি ঘর নির্মাণ করে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের দেওয়া হয়। এসব ঘর নির্মাণে বরাদ্দ ছিল ৬ কোটি ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। লালুয়া বাগালির ২৯টি এবং গিলাবাড়ির আটটি ঘর ২০২২-২৩ অর্থবছরে নির্মিত হয়।
আমাদী, কয়রা সদরসহ অন্যান্য এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পে খোঁজ নিয়ে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ না নেওয়া, যাতায়াতের দুরবস্থা ও ঘরের প্লাস্টার খসে পড়ার মতো সমস্যার কথা জানা গেছে। কর্মের অভাবে অনেকে স্বপ্নের ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘর নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার সম্ভাব্যতা ও বসবাসের উপযোগিতা যথাযথভাবে যাচাই না করায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে মানুষের জীবিকা, যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ পানি ও বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এসব সুবিধা নিশ্চিত না করে শুধু খাস বা পরিত্যক্ত জমিতে ঘর নির্মাণ করলে সেখানে মানুষের স্থায়ী বসবাস নিশ্চিত করা কঠিন। পরিকল্পনাহীনভাবে ঘর নির্মাণ করে দেওয়াকে কার্যকর পুনর্বাসন বলা যায় না; এতে শুধু সরকারি অর্থ অপচয় হয়।
খুলনা পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির কয়রা জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোঃ মাহফুজুর রহমান খান বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পটির বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো লিখিত আবেদন আসেনি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন, “কয়রার অধিকাংশ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। তবে লালুয়া বাগালির ঘরগুলোর জমির দলিল এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। এ কারণে বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।”
সদ্য যোগদান করা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শ্রাবনী বিশ্বাস বলেন, “বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। দলিল হস্তান্তরের সর্বশেষ অবস্থা খোঁজ নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
খুলনা গেজেট/এএজে

