বিজ্ঞান শিক্ষকের সংকট, পিছিয়ে পড়ছে গ্রামের শিক্ষা

স্বপন বিশ্বাস

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এখন আর বিলাসিতা নয়, বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ও এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি। কৃষি, চিকিৎসা, শিল্প, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের প্রয়োগ। পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও মহাকাশ গবেষণায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান শিক্ষকের সংকটের চিত্রটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ৭৭ হাজার ৭৯৯টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে রসায়নে ৫ হাজার ১২১টি, পদার্থবিজ্ঞানে ৫ হাজার ৫৭৮টি, জীববিজ্ঞানে ১ হাজার ৩৩৪টি এবং গণিতে ৯২১টি পদ শূন্য। এই চার বিষয়ে মোট শূন্য পদ ১২ হাজার ৯৫৪টি। বাকি ৬৪ হাজার ৮৪৫টি শূন্য পদ অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে। সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি শূন্য পদ মানে একটি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক-সংকট, একজন শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা এবং কোথাও কোথাও একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হওয়া। বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এর প্রভাব আরও গভীর। শহরের শিক্ষার্থীদের অনেকের বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন কিংবা নানা ধরনের শিক্ষা সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু গ্রামের একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিদ্যালয়ই একমাত্র ভরসা। সেই বিদ্যালয়ে যদি পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের শিক্ষক না থাকেন, তাহলে সে শিক্ষার্থী বিজ্ঞান শিখবে কীভাবে? বিজ্ঞান কোনো মুখস্থনির্ভর বিষয় নয়। বিজ্ঞানের শিক্ষা প্রশ্ন করতে শেখায়, পর্যবেক্ষণ করতে শেখায়, পরীক্ষা করতে শেখায় এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়। একটি পরীক্ষাগারে শিক্ষক ছাড়া যেমন ব্যাবহারিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ, তেমনি বিজ্ঞান শিক্ষক ছাড়া বিজ্ঞান শিক্ষাও অনেকটা প্রাণহীন।

শুধু পদ পূরণ করলেই হবে না-
বিজ্ঞান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু নিয়োগ দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিজ্ঞান শিক্ষাকে শিক্ষার্থী ও মেধাবী তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কেন বিজ্ঞান পড়বে? বিজ্ঞান পড়ে তার সামনে কী সম্ভাবনা রয়েছে? একজন মেধাবী তরুণ কেন বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসবে? এসব প্রশ্নের উত্তরও রাষ্ট্রকে দিতে হবে। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন পেশা নির্বাচন করে, তখন সে আয়, মর্যাদা, কর্মপরিবেশ, গবেষণার সুযোগ এবং পেশাগত উন্নতির বিষয় বিবেচনা করে। বিজ্ঞান বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করেও যদি একজন শিক্ষক অন্য সবার মতো একই কাঠামোর মূল্যায়ন পান এবং তার বিশেষ দক্ষতার কোনো স্বীকৃতি না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে মেধাবীদের বিজ্ঞান শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তাই বিজ্ঞান শিক্ষকদের আলাদা মূল্যায়ন ও প্রণোদনার ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, বিজ্ঞান মেলা ও প্রকল্পভিত্তিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞান শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে হবে-
বিজ্ঞান শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অর্থ শুধু বেশি বিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিজ্ঞানচর্চার আগ্রহ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর বিজ্ঞান ক্লাব গড়ে তোলা যেতে পারে। নিয়মিত বিজ্ঞান মেলা, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, উদ্ভাবনী প্রকল্প, কুইজ ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা দরকার। শিক্ষার্থীরা যেন শুধু পরীক্ষার জন্য সূত্র মুখস্থ না করে, বরং নিজের চারপাশের সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজতে শেখে— সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যদি স্থানীয় কৃষির সমস্যা নিয়ে গবেষণা করে, পানির বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করে, সৌরশক্তির ব্যবহার নিয়ে প্রকল্প তৈরি করে কিংবা পরিবেশ রক্ষার কোনো কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করে, তাহলে সেটিই হবে প্রকৃত বিজ্ঞান শিক্ষা। এ জন্য বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানাগার গুলোকে কেবল তালাবদ্ধ কক্ষ হিসেবে রাখা যাবে না। সেখানে নিয়মিত ব্যাবহারিক ক্লাস নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, উপকরণ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক দিতে হবে।

গ্রাম যেন বিজ্ঞান শিক্ষায় পিছিয়ে না থাকে-
বাংলাদেশের উন্নয়নের বড় একটি সম্ভাবনা রয়েছে গ্রামে। কৃষির আধুনিকায়ন, খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সংরক্ষণ, ক্ষুদ্র শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি— সব ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান প্রয়োজন। অথচ গ্রামের শিক্ষার্থীরাই যদি বিজ্ঞান শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হবে। একজন শহুরে শিক্ষার্থী আর একজন প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থী একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেয়। কিন্তু তাদের শেখার সুযোগ যদি সমান না হয়, তাহলে ফলাফলকে কীভাবে সমতার প্রতিফলন বলা যাবে? তাই গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নতুন প্রতিষ্ঠান নয়, আগে শিক্ষক সংকট দূর হোক-
শিক্ষার মান উন্নয়নে নতুন প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকই যদি না থাকে, তাহলে শুধু ভবন নির্মাণ করে শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব নয়। একটি বিদ্যালয়ে সুন্দর ভবন আছে, কম্পিউটার ল্যাব আছে, বিজ্ঞানাগার আছে, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের শিক্ষক নেই। এই বাস্তবতা আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। তাই শিক্ষা খাতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি বড় অংশ হওয়া উচিত, প্রথমে শিক্ষক, তারপর অবকাঠামো।

মেধাবীদের বিজ্ঞান শিক্ষকতায় আনতে হবে-
বিজ্ঞান শিক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি একজন ভালো শিক্ষক। একজন দক্ষ বিজ্ঞান শিক্ষক শিক্ষার্থীর চোখে নতুন পৃথিবী খুলে দিতে পারেন। তিনি শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি কৌতূহল তৈরি করেন। তিনি শেখান, কোনো কিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে প্রশ্ন করতে হয়, প্রমাণ খুঁজতে হয় এবং যুক্তি দিয়ে সত্য যাচাই করতে হয়। এমন শিক্ষক তৈরি করতে হলে মেধাবীদের এই পেশায় আনতে হবে। আর মেধাবীদের আনতে হলে বিজ্ঞান শিক্ষকতার মর্যাদা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে, কীভাবে বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতায় উৎসাহিত করা যায়। কীভাবে তাদের গবেষণার সুযোগ দেওয়া যায়। কীভাবে একজন বিজ্ঞান শিক্ষককে শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক না বানিয়ে বিজ্ঞানচর্চার একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে গড়ে তোলা যায়।

এখনই অগ্রাধিকার দেওয়ার সময়-
আমরা যদি আগামী দিনের বাংলাদেশকে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে বিজ্ঞান শিক্ষাকে আর সাধারণ কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি। তাই এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান শিক্ষক নিশ্চিত করা, বিজ্ঞান শিক্ষকদের বিশেষায়িত মূল্যায়ন, বিজ্ঞানাগার কার্যকর করা, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করা এবং মেধাবীদের বিজ্ঞান শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষক শূন্যতার তথ্য আমাদের সামনে যে বাস্তবতা তুলে ধরছে, সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শিক্ষক সংকটের সমাধান করতে হবে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনায় এবং বিষয়ভিত্তিক অগ্রাধিকারের মাধ্যমে। আজ যে গ্রামের শ্রেণিকক্ষে একজন বিজ্ঞান শিক্ষক নেই, সেখানে হয়ত বসে আছে আগামী দিনের একজন বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক কিংবা উদ্ভাবক। কিন্তু তার সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে একজন ভালো শিক্ষক প্রয়োজন। বিজ্ঞান শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিজ্ঞান শিক্ষককে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। গ্রামের শ্রেণিকক্ষে বিজ্ঞান শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। আর শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শুধু সনদধারী মানুষ দিয়ে গড়ে উঠবে না; গড়ে উঠবে বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, দক্ষ ও উদ্ভাবনী প্রজন্মের হাতে। সেই প্রজন্ম তৈরির প্রথম দায়িত্বটি আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর। আর সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম শর্ত— প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় শিক্ষক।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন