‘বকো আর ঝকো কানে দিয়েছি তুলো, মারো আর ধরো পিঠ করেছি কুলো’ – বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল মাদকের নেশায় ভাসছে দীর্ঘকাল। এই মাদক সম্পর্কে বয়ান করতে গিয়ে আক্ষেপে কথাগুলো মনে এলো। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনে, সারা দেশ ছেয়ে গিয়েছিল মাদক জুয়া এবং ফটকাবাজির জালে। দেখার কেউ ছিল না। প্রত্যেকেই এ থেকে নিয়মিত বখরা পেত। ২০০৯ সাল থেকে ঘটনার সূত্রপাত। তখন যে শিশুটির বয়স ছিল ১০ বছর, সাড়ে ১৫ বছর পর লেডি হিটলার, খুনি হাসিনার দুঃশাসনের দেশে তার বয়স দাঁড়ায় ২৫/২৬ বছর এ। এ অঞ্চলে অবাধ জুয়া আর মাদকের আশ্রয়ে সে বড় হয়েছে। ওর কাছে মাদক অত্যন্ত সহজলভ্য এবং এর ব্যবহারও সুলভ। মাদকের যাত্রাপথ, মজুত এবং বিতরণ সবই ওর জানা। মাদক ব্যবসার সাথে যেসব কেষ্ট বিষ্টুরা জড়িত তাদের সংখ্যা অগণিত বলা চলে! একেবারে কম নয়। এখন যা বাংলাদেশকে আক্রান্ত করেছে।
দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল খুলনা মহানগরীকে গ্রাস করেছে, এর প্রসার একদিনে ঘটেনি। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে ধীরে ধীরে এর বিকাশ ঘটেছে। পতিত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৫ই শাখার কর্মীবাহিনী অবাধে এগুলো বিক্রি বিতরণ করতো। এর রমরমা ব্যবসা শিশু-কিশোর, ছাত্র, ব্যবসায়ী, খেটে খাওয়া দিনমজুর, ঠেলাগাড়ি রিকশা গাড়িওয়ালা সবাইকে আক্রান্ত করেছে। যা এখন সর্বগ্রাসী থাবা বিস্তার করে এ দেশের যুব তারুণ্যকে নেশায় বিভোর করে রেখেছে।
গত শনিবার, খুলনা গেজেট পত্রিকায় সেকেন্ড লিড, টপ নিউজ আকারে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল : ‘খুলনায় মাদক বিক্রি ১১৭ টি স্পটের তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে…’ – সংশ্লিষ্ট পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টারের প্রতিবেদনে বলা হয় – খুলনা মহানগরীর ৪৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকায়, মাদক বিক্রির পরিধি ও পরিসর বাড়ছে! মহানগরীর ৩১ টি ওয়ার্ডের সবখানেই সন্ধ্যার অন্ধকার নামার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাদক দ্রব্য দেদারসে বিকি কিনি চলে।
এ বেচা বিক্রির সাথে ২৭২ জন মাদক ব্যবসায়ী সক্রিয়ভাবে জড়িত বলে একটি গোপন জরিপে শনাক্ত করা হয়েছে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, খুলনা মহানগরী ১১৭ টি স্পটে মাদক বিক্রির তালিকা ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছে গেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মহানগরীর মাদক ব্যবসায়ীদের স্থায়ীভাবে প্রতিরোধের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা চেয়েছে। দীর্ঘদিনের জমে ওঠা মাদকাসক্তি এবং মাদক ব্যবসাকে যদি সরকারি কঠোর নির্দেশনার মাধ্যমে নির্মূলের নির্দেশ না দেওয়া হয়, তাহলে জাতিবিধ্বংসী এ ভয়াবহ কর্মকাণ্ড দেশ ও জাতির জন্য সমূহ বিপদ ডেকে আনবে।
খুলনা গেজেট পত্রিকার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৪ এ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আগে শ্রমিক লীগ ছাত্রলীগ যুবলীগ সহ ওই সংগঠনের বিভিন্ন শাখার দক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এ ব্যবসা চলছিল। ওরা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এ ব্যবসা প্রশাসন কিংবা আইন প্রয়গকারী সংস্থার চোখের সামনে চালিয়ে যাচ্ছিল। বিক্রেতাদের উৎসাহিত করতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং অঙ্গসংগঠন মিলে এই ব্যবসায় মোটা অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগও করেছে। ওই সব নেতারা স্ব স্ব এলাকায় নিজেদের তত্ত্বাবধানে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিক্রির জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং নিয়মিত মাশোহারা নিতেন। যেসব মাদকদ্রব্য মজুত ও বিক্রি করা হতো তার মধ্যে ছিল, – গাজা ফেন্সিডিল, ইয়াবা এবং কোডিন ফসফেট। নগরীতে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ লক্ষ টাকার মাদক বেচাকেনা হতো। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর পলাতক পরাজিত নিষিদ্ধ এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী সংগঠনের লোকজন পিছু হটেছে ঠিকই। রাতারাতি হাতবদল হয়েছে, গডফাদারও পরিবর্তন হয়েছে। এখন নতুন গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণে জমজমাট এ ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে।
ইতঃপূর্বে উল্লেখ করেছি, সাম্প্রতিক সময়ে, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর খুলনা, দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের বিভাগীয় শহর, মহানগরী খুলনায় এ ব্যবসার প্রসার রোধের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি নিখুঁত তালিকা পাঠিয়েছে। অপেক্ষা শুধু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের।
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলীয় জেলা সাতক্ষীরা ও যশোর এলাকা হতে পার্শ্ববর্তী দেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এগুলি মহানগরীতে পৌঁছাচ্ছে। চোরা কারবারিরা এগুলি বিনা বাধায় সড়ক ও রেলপথে নিয়ে আসে। দ্রব্যগুলো হচ্ছে ফেন্সিডিল ও ইয়াবা।
যাত্রী এবং পণ্যবাহী পরিবহনের অভ্যন্তরে গহীন দেশে রেখে ফেন্সিডিল ও ইয়াবা যশোরের পথের বাজার এবং খুলনার গল্লামারি জিরো পয়েন্ট দিয়ে মহানগরীতে প্রবেশ করে।
মাদকের ব্যবসার সাথে জড়িত চোরা কারবারিরা বেনাপোল থেকে আসা কমিউটার ট্রেনে ও এগুলি আনে এবং নগরীর শিল্প শহর দৌলতপুর এবং খুলনা রেলস্টেশনে নেমে যায়। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে পাঠানো তালিকায় উল্লেখিত উল্লেখযোগ্য স্পটগুলোর বিবরণ থেকে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, ওগুলো হলো – টুটপাড়া, গাছতলা, মহীর বাড়ি খালপাড় এলাকা, পাঁচ নম্বর ঘাট, গ্রীনল্যান্ড বস্তি, জোড়াগেট ১০ তলার পিছনে, ৪ ও ৬ নম্বর ঘাট এলাকা, হাসপাতাল রোড, নিক্সন মার্কেট, দারোগার বস্তি, বার্মা সেল রোডের পানির ট্যাংকের মোড়, পুরো নিরালা আবাসিক এলাকা, হাজী বাড়ির মোড়, সড়ক পরিবহন লীগের অফিসের পাশে, সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল, আটরা পালপাড়া, পীর খান জাহান আলী রাহমাতুল্লাহ ব্রিজ এলাকা, লবনচরা এলাকা, মুক্তা কমিশনারের বাড়ির পাশে স্লুইজ গেট, লবণচরা দারোগার লিজ এলাকা, মতিয়াখালী খালপাড়, মোহাম্মদ নগর, ইসলাম নগর এলাকা, জিরো পয়েন্ট, কৈয়া এলাকা, কৈয়া বাজার, খুবি ক্যাম্পাস, গিলাতলা, কুয়েত রোড, গাবতলা, বিদ্যুৎ স্টেশন গাব তলা, গাবতলা শ্মশান ঘাট, আলিম জুট মিল গেট সংলগ্ন এলাকা, সেনপাড়া দাউদের মাঠ, গাইকুড়, রায়ের মহল, ল্যাবরেটরি স্কুল এলাকা, মুন্সীপাড়া, গাইকুড় মিল্ক ভিটা এলাকা, আড়ংঘাটা প্রাইমারি স্কুল এলাকা, চিত্রালী বাজার, মানসী বিল্ডিং এলাকা, বঙ্গবাসী স্কুল রোড, প্লাটিনাম জুট মিল ২ নম্বর গেইট এলাকা, খালিশপুর জুট মিল গেট, রায়েরমহল বাজার, খালিশপুর রেল লাইন, আলামনগর বাজার এলাকা, হার্ড বোর্ড গেট, নিউ পিপলস কলোনি, বৈকালি বাজার, কাস্টম ঘাট, বয়রা বাজার এলাকা, দৌলতপুর পেট্রোল পাম্প, ইস্পাহানি কলোনি, মহেশ্বর পাশা কালীবাড়ি, পাবলা প্রভৃতি এলাকা।
বলা বাহুল্য, এসব এলাকায় ভাইরাস আকারে মাদকের দুর্বার রাজত্ব গড়ে উঠেছে! প্রশাসন সবকিছুই জানে কিন্তু কোথায় কি কারণে যেন করার কিছু নেই!
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কার্যালয়ের উপপরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ ধরনের একটি লম্বা তালিকা পাঠিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়েও এ ধরনের একটি তালিকা পৌঁছেছে। তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে মাদক স্পট গুলো চিহ্নিত করা হয় বলে সরকার প্রধানের কার্যালয়ে অভিহিত করা হয়। গেল জুলাই মাসের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেনারেল হাসপাতালের সুপার ডাক্তার রফিকুল ইসলাম গাজী ওই সভায় অবহিত করেন, মে মাসে ১৩৭ জনের মধ্যে ডোপ টেস্টে ৮ জনের পজিটিভ পাওয়া যায়। এরা অধিকাংশই মরফিন ও গাঁজা সেবি। কেএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন নগরীকে মাদকমুক্ত করার জন্য প্রতিদিনই অভিযান চলছে বলে জানালেন! এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীরা পলাতক থাকলেও তারা এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। নগরীতে মাদক-সেবিদের মধ্যে ইয়াবার চাহিদা বেশি বলে এই কর্মকর্তা অভিমত ব্যক্ত করেন।”
তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, খুলনা জেলার নয়টি উপজেলাকে কেন্দ্র করে। সেখানেও মাদকের ভয়াবহ বিস্তার। তদারকির কেউ নেই বললেই চলে। খুলনা জেলার উপকণ্ঠে অবস্থিত ডুমুরিয়া উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নে মাদকের ছোবলে উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা দিশেহারা। এ ব্যাপারে পুলিশের নজরদারি আরো বৃদ্ধি করা দরকার বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন।
বটিয়াঘাটা দাকোপ, ফুলতলা রুপসা, পাইকগাছা, কয়রা এলাকায়ও লুকিয়ে পালিয়ে ইয়াবা, হিরোইনের নৈরাজ্য গড়ে উঠেছে। ডুমুরিয়া থানা থেকেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে মাদক ব্যাপারে জিরো টলারেন্স তবুও কেন যেন সব জায়গায় বজ্র-আটুনী ফসকাগেরো অবস্থা চলছে। ডুমুরিয়া উপজেলার উত্তর জনপদে এবং সদরে বেশ কিছু এলাকায় মাদকের বিস্তার লাভের জন্য কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা মাদক কেনার পয়সা না থাকায় ছোটখাটো পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক অভিভাবকই এ ব্যাপারে দিশেহারা। সরকার যদি মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রাখে তাহলে হয়ত মাদকের আস্তে আস্তে কমে যেতে পারে। তবে এ ব্যাপারে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। মনিটরিং জোরদার করতে হবে। কথাগুলো আমরা যেন ভুলে না যাই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

