নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু : এক অন্তবিহীন বিতর্কের অপর নাম

মজিবুর রহমান

স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ছিলই, স্বাধীন ভারতেও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে সমানে বিতর্ক চলছে। ভারতের স্বনামধন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে তিনিই বোধহয় সবচেয়ে ক্যারিশম্যাটিক, রহস্যময় ও বিতর্কিত চরিত্র। তাঁর কর্মকাণ্ড ছিল এক দুঃসাহসিক অভিযানের মতো। তিনি এমনকিছু ঘটিয়েছেন, যা অন্যান্য খ্যাতনামা রাজনীতিবিদদের ভাবনার মধ্যেও কখনও আসেনি। এজন্যই তিনি অনন্য, অত্যন্ত আকর্ষণীয়, স্পেশাল। তাঁকে নিয়ে বাঙালির আবেগ ভিন্ন মাত্রার। তাই তাঁর সম্পর্কে দুজন বাজে কথা বললে দশজন তার তীব্র বিরোধিতা করে। বর্তমান নিবন্ধে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ঘিরে ঘটা কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনার উল্লেখ করা হলো।

সুভাষচন্দ্র রেভেনশা কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় (১৯০৯-১৩) সহপাঠীদের নিয়ে ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির দিন ১১ আগস্ট শহিদ দিবস হিসেবে পালন করার পরিকল্পনা করেন। ঠিক হয় ঐদিন তাঁরা অনশন করবেন। এ ব্যাপারে তাঁদের উৎসাহ ও পরামর্শ দেন ওই স্কুলের শিক্ষক বেণীমাধব দাস। বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয়ে বিতর্ক দেখা দেয় এবং বেণীমাধবকে বদলি করে দেওয়া হয়। সুভাষচন্দ্র ওই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯১৩ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ইংরেজ অধ্যাপক এডওয়ার্ড ফার্লে ওটেন পড়াবার সময় বিভিন্নভাবে ভারত ও ভারতবাসীদের নিন্দা করতেন। ওটেন সাহেবের এই আচরণের বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্র সহপাঠীদের নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। এর আগে বঙ্গ প্রদেশে এমন ছাত্র ধর্মঘটের বিশেষ নজির নজির ছিল না।

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ওটেন সাহেব ছাত্রদের হাতে নিগৃহীত হন। পরের দিনই অধ্যক্ষ হেনরি রশার জেমস সুভাষচন্দ্রকে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দুবছরের জন্য বহিষ্কার ঘোষণা করেন। এর ফলে তাঁর ছাত্রজীবন নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ‘বাংলার বাঘ’ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপে সুভাষচন্দ্র ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে স্কটিশ চার্চ কলেজে তৃতীয় বর্ষের বিএ ক্লাসে ভর্তি হন এবং ১৯১৯ সালে এখান থেকে দর্শনশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯২০ সালে সুভাষচন্দ্র আইসি এস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান নিয়ে উত্তীর্ণ হন। উল্লেখ্য, তখনকার দিনে ভারতীয়রা সহজেই বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার হতে পারলেও সিভিল সার্ভিসে পাস করা খুব কঠিন ছিল। সুভাষচন্দ্র কঠিন পরীক্ষায় কৃতকার্য হলেন কিন্তু মোটা মাইনের চাকরিতে যোগদান করলেন না। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করবেন না বলে তিনি ১৯২১ সালের এপ্রিলে আইসি এস থেকে পদত্যাগ করলেন। তিনি বললেন, “আমি এই শাসনযন্ত্রের অংশ হওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি না। এখন আমি দুই পথের সংযোগস্থলে উপস্থিত। এক্ষেত্রে কোনো মধ্যপথ আশ্রয় করিবার কোনো উপায় নাই।” তিনি ততদিনে মনে মনে নিজেকে দেশমাতৃকার সেবায় সঁপে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন!

২৮.১২.১৯২৮-১.১.১৯২৯ কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে মতিলাল নেহরুর সভাপতিত্বে ৪৩তম কংগ্রেস অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অভ্যর্থনা কমিটির অংশ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হন সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি এই বাহিনীকে সামরিক ধাঁচে সজ্জিত করেন। আগত প্রতিনিধি ও নেতৃবৃন্দকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় বাহিনীর অগ্রভাগে সর্বাধিনায়কের বেশে তিনি ঘোড়সওয়ার থাকেন। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সামরিক রূপ দেখে গান্ধীজি খুশি হননি।

১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে একটা মেয়াদ কাটানোর পর ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র পুনর্নির্বাচিত হোন, এটা গান্ধীজি চাননি। সুভাষচন্দ্র অবশ্য গান্ধীজির এরূপ মনোভাব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বিরুদ্ধে গান্ধীজির মনোনীত প্রার্থী হন পট্টভি সীতারামাইয়া। জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সুভাষচন্দ্র ১৫৮০-১৩৭৭ ভোটে জয়লাভ করেন। গান্ধীজির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব সুভাষচন্দ্রকে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেন। দলের মধ্যে একটা অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি এপ্রিল মাসে কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং মে মাসে কংগ্রেসের মধ্যেই একটা উপদল ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জুলাই মাসে কংগ্রেস হাইকমান্ড তাঁকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে অপসারণ করে এবং আগামী তিন বছরের জন্য তাঁর ওপর কংগ্রেসের যেকোনো নির্বাচিত পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই সময়ে সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে গান্ধীজির আচরণ সম্পর্কে ঐতিহাসিক মাইকেল এডোয়ার্ড তাঁর ‘দ্য লাস্ট ইয়ার্স অফ ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন, “গান্ধীজি এবার তাঁর অসহযোগিতার অস্ত্র ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নয়, কংগ্রেসের নিজের সভাপতির বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করেন। মিঃ বসু পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।”

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সুভাষচন্দ্র যুদ্ধে ব্যস্ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দেশের সমস্ত দলের এমন একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যাতে ইংরেজরা ভারত ছাড়তে বাধ্য হয় এবং ভারতের স্বাধীনতার অপেক্ষার অবসান ঘটে। এই লক্ষ্যে তিনি কংগ্রেসের গান্ধীজি, মুসলিম লীগের আলি জিন্না এবং হিন্দু মহাসভার সাভারকারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তবে কোনো লাভ হয়নি।

ভারতের প্রধান দলগুলোর নেতৃবৃন্দের অবস্থান দেখে হতাশ হয়ে সুভাষচন্দ্র সিদ্ধান্ত নেন যে, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সফল করতে বৈদেশিক সাহায্য নিতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি ‘শত্রুর শত্রু মিত্র’ ফরমুলা প্রয়োগ করেন। মিত্রশক্তির ব্রিটেনের বিরুদ্ধে অক্ষশক্তির জার্মানি ও জাপানের সাহায্য নেন। জাপানের হাতে বন্দী ভারতীয় সেনাদের নিয়ে গঠিত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিকে তিনি পুনর্গঠিত করেন, যা আজাদ হিন্দ ফৌজ নামে পরিচিত হয় এবং সেই সময়ে তাঁরও ‘নেতাজি’ উপাধিপ্রাপ্তি ঘটে।

অক্ষশক্তির সাহায্যপুষ্ট নেতাজির সমরাভিযানকে কংগ্রেস সমর্থন করেনি। এই যুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল মিত্রশক্তির জোটে। সেজন্য ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিও অক্ষশক্তির সঙ্গে নেতাজির হাত মেলানোর তীব্র সমালোচনা করে। সিপিআই-এর ‘পিপিলস ওয়ার’ পত্রিকায় নেতাজিকে ‘তোজোর কুকুর’ এবং ‘কুইসলিং’ বা ‘দেশবিরোধী শক্তির সহায়ক’ বলে গালমন্দ করা হয়। কখনও গাধার পিঠে তোজো এবং গাধার মুখের জায়গায় নেতাজির মুখ, কখনও নেতাজিকে বামন বানিয়ে তোজোর হাত ধরে হাঁটানো কার্টুন আঁকা হয়।

নেতাজির মৃত্যুরহস্য উদঘাটন করতে অন্তত তিনটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। ১৯৫৬ সালে গঠিত শাহনওয়াজ কমিটি এবং ১৯৭০ সালে গঠিত খোসলা কমিশন তাদের রিপোর্টে জানায় যে, ১৮.৮.১৯৪৫ তারিখে তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছে এবং রেনকোজি মন্দিরে তাঁর অস্থিভস্ম সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু ১৯৯৯ সালে গঠিত মুখার্জি কমিশন ২০০৫ সালে জমাকৃত প্রতিবেদনে পূর্বোক্ত দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর কথা স্বীকার করেনি। তবে নেতাজির অন্তিম পরিণতি কী হয়েছিল, সে ব্যাপারে কমিশন কিছু জানাতে পারেনি। এই রিপোর্ট অবশ্য তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাখ্যান করেছিল। ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে নেতাজিকে ‘মরণোত্তর ভারতরত্ন’ প্রদান করার কথা ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণায় জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার ফলে ঘোষণাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

অনেকেরই বিশ্বাস ছিল যে, ফৈজাবাদে বসবাসকারী ভগবানজি বা গুমনামি বাবা নামে পরিচিত রহস্যময় সাধু ছিলেন ছদ্মবেশী নেতাজি। ১৯৮৫ সালে ভগবানজির মৃত্যু হয়। কারো কারো মতে কথিত বিমান দুর্ঘটনার সময় নেতাজি জাপান থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন চলে যান। প্রধানমন্ত্রী জোসেফ স্টালিন তাঁকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করেন এবং সেখানে তাঁকে হত্যা করা হয়।

বিভিন্ন বিতর্ক ও রহস্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে মানুষের মাঝে প্রাণবন্ত করে রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। দু-চারজন বোকা ও বদমাশ ছাড়া এখন সকলেই স্বীকার করে যে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন একজন মহান দেশপ্রেমিক এবং আপসহীন জননেতা। যারা আগে নেতাজি সম্পর্কে বিদ্রুপ অথবা কটুক্তি করেছে পরে তাদেরকেও নেতাজির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখা গেছে। ভারতের অজস্র নেতার মধ্যে তিনিই একমাত্র ‘নেতাজি’ হয়ে রয়ে গেছেন।

লেখক : মুর্শিদাবাদের সাগরদীঘি হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন