ঈদুল ফিতর : ধর্মীয় উৎসব থেকে সামাজিক সম্প্রীতি

মোঃ রাসেল হোসেন

বছর ঘুরে আবারও ঈদ এসেছে। ঈদ মানে খুশি, সব মানুষের একসঙ্গে খুশি। এটি কেবল সর্বজনীন উৎসবই সম্ভব। যদিও প্রায় সব উৎসবেরই অনেকগুলো পর্ব থাকে। কোনো কোনো পর্ব একান্তই থাকে কিছু মানুষের জন্য, সবার জন্য নয়। কিন্তু বিশেষ ওই পর্বের পর উৎসবের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। সেখানেও নানা পর্বের নানা ধরনের আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতা থাকে।

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। এ কথা আমরা সবাই জানি। ঈদের সামাজিক অর্থ উৎসব আর আভিধানিক অর্থ পুনরাগমন বা বারবার ফিরে আসা। তাই প্রতি বছরই মুসলমানদের জীবনের ফিরে আসে খুশির ঈদ। প্রথমটি উদ্যাপিত হয় দীর্ঘ ১ মাস সিয়াম সাধনার পর। যাকে আমরা বলি ঈদ-উল-ফিতর বা রোজার ঈদ, আর অন্যটি আত্মত্যাগের কোরবানির ঈদ বা ঈদ-উল-আজহা। এই দুইটি ঈদই হলো মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশে ঈদের দিন দুইটি খুবই জাঁকজমকের সাথে উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মে যে সব প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপিত হয় সেগুলির মধ্যে ঈদুল ফিতর হচ্ছে কনিষ্ঠতম। এ মহান পুণ্যময় দিবসের উদ্যাপন শুরু হয় আজ থেকে মাত্র ১৩৮০ সৌর বছর পূর্বে। ইসলামের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মদীনাতে হিজরত-এর অব্যবহিত পরেই ঈদুল ফিতর উৎসব পালন শুরু হয়।

হজরত আনাস (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়, নবী করিম (সাঃ) মদীনা আগমন করে দেখলেন মদীনাবাসীগণ দুই দিবসে আনন্দ-উল্লাস করে থাকে। মহানবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এ দিবসদ্বয় কি? ওরা বলল, জাহেলী যুগ থেকেই এ দুটি দিবসে আনন্দ-উল্লাস করে থাকি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “আল্লাহ তোমাদেরকে উক্ত দিবসদ্বয়ের পরিবর্তে উত্তম দুটি দিবস দান করেছেন। দিবসদ্বয় হলো ঈদুল আযহার দিবস ও ঈদুল ফিৎরের দিবস।” (সুনান আবূ দাউদ, কিতাবুল ঈদায়ন)।

ঈদুল ফিতর দ্বারা এ দিবসের নাম রাখার তাৎপর্য হলো আল্লাহ তাআলা এ দিনে তার রোজাদার বান্দাদের নিয়ামত ও অনুগ্রহ দ্বারা বারবার ধন্য করেন এবং তার ইহসানের দৃষ্টি বার বার দান করেন। কেননা মুমিন বান্দা আল্লাহর নির্দেশে রমজানে পানাহার ত্যাগ করেছেন আবার রমজানের পর তারই পানাহারের আদেশ পালন করে থাকেন।

প্রাক ইসলামী যুগে মদিনার আনন্দানুষ্ঠান হাদীসে এসেছে— ‘রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনাতে আগমন করলেন, তখন মদিনায় দুটো দিবস ছিল; যে দিবসে তারা (মদিনার লোকজন) খেলাধুলা করতো। রাসুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এ দুই দিনের তাৎপর্য কী?

মদিনাবাসীগণ বললেন, আমরা এ দুই দিনে (আনন্দ) খেলাধুলা করি। তখন রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা এ দুই দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটো দিন দান করেছেন। তার একটি হলো— ঈদুল আজহা ও অপরটি হলো ঈদুল ফিতর।’ (আবু দাউদ)।

সবাই এ দিন যার যার সাধ্যানুযায়ী ভালো পোশাক পরে। ঘরে ঘরে উন্নতমানের খাবারের আয়োজন করে। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাও এ আনন্দের অংশীদার হয়। দরিদ্র ও গরীবাও এ দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদা আনন্দের সাথে পালন করে। মুসলমানেরা এ দিন কৃতজ্ঞচিত্তে খুতবাসহ ঈদের দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। আত্মীয়-স্বজনের সাথে কুশল বিনিময় করেন। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই কোলাকুলিসহ সালাম ও শুভেচ্ছার হাত বাড়িয়ে দেয়।

ঈদ আমাদের মাঝে যে আসমানি বার্তার প্রগাঢ়তা আনে, তার বর্ণনা হাজার শব্দে লিখেও শেষ করা যাবে না। এখানে ফের ফিরে যেতে হয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের কাছে। সুরে-শব্দে তিনি গেঁথেছেন ঈদের মহিমাকে। বলেছেন- ‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে, তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।’

আহ্বান জানিয়েছেন-
‘যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী,
সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ’….
‘তোরে মারল’ ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা,
সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।’

ঈদের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রাম ও শহরের মানুষ নতুন পোশাক কেনে, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে এবং নানা রকম খাবার প্রস্তুত করে। বিশেষ করে সেমাই, পোলাও, কোরমা ইত্যাদি খাবার ঈদের দিনে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে পরিবারের কাছে ফিরে আসে। ফলে পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

সংস্কৃতির আলোচনার আগে সংস্কৃতি ও সভ্যতার মাঝে তফাৎ সুস্পষ্ট হওয়া আবশ্যক। একটা জাতির একাধিক কালচার থাকতে পারে কিন্তু একাধিক সিভিলাইজেশন থাকতে পারে না। তেমনি বহুজাতির এক সিভিলাইজেশন থাকতে পারে বটে কিন্তু এক কালচার থাকতে পারে না। কারণ কালচারের নিজস্বতা বা জাতীয়তা বা জাতীয় রূপ থাকতে হবে; পক্ষান্তরে সিভিলাইজেশনের কোনো জাতীয় রূপ থাকতে পারে না।

সাধারণত শিক্ষা-দীক্ষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে, দর্শন-সাহিত্যে, শিল্পে-বাণিজ্যে, কলা-কারিগরিতে মানুষের সামগ্রিক অগ্রগতির নামই সভ্যতা। মানবমনের ক্রমবিকাশের নিদর্শন এটি। তাই গভীরতা ও ব্যাপ্তীতে প্রসার লাভ সভ্যতার স্বভাব। বনের আগুনের মতো নিজের আলোকে ও দাহ্য শক্তিতে বিস্তার লাভই এর অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি। সভ্যতা ক্রমবিকাশমান। জ্ঞানের মতোই সে অক্ষয়, আগুনের মতোই সে অনির্বাণ।

অতীতের সভ্যতার সাথে কোনো একটা বিশেষ মানবগোষ্ঠীর নাম সংযুক্ত থাকার অর্থ এই নয় যে, ওই সভ্যতা শুধু ওই মানবগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বস্তুত ওইসব সভ্যতার ফল ওই মানবগোষ্ঠীর বাইরের লোকেরাও ভোগ করেছিল। প্রদীপ যার আঙিনায় জ্বলুক, পথচারীও সে আলোকে সুবিধা ভোগ করবে। ইসলামের সভ্যতাকে শুধুমাত্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পূক্ত করলে এর রাষ্টীয় সুযোগ সুবিধা অমুসলিমরাও গ্রহণ করছে প্রতিনিয়ত।

কবি নজরুল ইসলামের এ কবিতায় মানবতার জয়গানকেই উচ্ছকিত করা হয়েছে। ঈদ উৎসবের অন্যতম মূল উদ্দেশ্যও তাই। ধনী গরিব নির্বিশেষে ঈদ উদযাপন করবে সমভাবে— এটাই ইসলামের বিধান। গরিব, অসহায় ও নিঃস্বদের অভাব অনটন লাঘব হয়, তারা যেন উৎসবে শামিল হতে পারে, এ জন্য আল্লাহ ফিতরা আদায়ের বিধান দিয়েছেন, ধনীদের দিয়েছেন সাদাকা প্রদানের বিধান।

ঈদে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দুস্থদের পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়িত্বই নয়, এটা একজন মুসলিমের ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। ঈদের পবিত্র প্রেরণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— হিংসা ও বিভেদের রাজনীতি নয়, বরং ঐক্য ও সহমর্মিতার চেতনা দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সত্যিকার অর্থে মানবিক বাংলাদেশ।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন