তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও হাসিনার প্রস্থানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাঁক

পলাশ রহমান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু দৃশ্য থাকে, যেগুলো শুধু ঘটনা নয়— সেগুলো ইতিহাসের ভাষা। তারেক রহমানের ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ঠিক তেমনই এক দৃশ্য, যেখানে সময় নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছে ক্ষমতার অস্থায়িত্বের। যে মানুষটিকে এক সময় রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে রাজনীতির বাইরে ছুড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল, আজ তিনি ফিরেছেন জনসমর্থনের বিস্ফোরণে। আর যিনি ক্ষমতার শীর্ষে বসে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি আজ ক্ষমতাচ্যুত ও দেশের বাইরে। ইতিহাসের এই নির্মম পরিহাস এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

ঢাকার রাজপথে তারেক রহমানকে ঘিরে যে জনস্রোত দেখা গেছে, তা নিছক দলীয় শক্তি প্রদর্শন নয়। এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, বাকরুদ্ধ সমাজ এবং ভোটাধিকারহীনতার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের প্রকাশ। বহু বছর ধরে যারা দেখেছে ক্ষমতা কীভাবে একদলীয় নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়, তারাই আজ এই প্রত্যাবর্তনে একটি সম্ভাবনার ছবি দেখছে— সব হারিয়েও ফেরা যায়।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনী ভাষণ। বহু প্রতীক্ষিত সেই বক্তব্যে ছিল না প্রতিশোধের আগুন, ছিল না হুংকার। বরং ছিল সংযত শব্দ, গোছানো চিন্তা ও কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা। উত্তেজনার বদলে তিনি যে ইতিবাচক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী সুর। দীর্ঘ নির্বাসনের পরও এমন পরিমিত ভাষা অনেকের কাছেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ইঙ্গিত।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পরিণতি এক গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে বিরোধী মত দমন, নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ— এসব অভিযোগ তার শাসনামলকে ঘিরে দেশ-বিদেশে বিস্তর সমালোচনা তৈরি করেছে। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে মামলা, গ্রেপ্তার ও প্রশাসনিক শক্তি ছিল নিয়মিত অস্ত্র। তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে বারবার।

আজ সেই বাস্তবতায় দৃশ্যপট উল্টে গেছে। তারেক স্বদেশে, হাসিনা নির্বাসনে। ক্ষমতার মসনদে বসে যিনি নিজেকে অপরিহার্য ভাবতেন, ইতিহাস তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই পালাবদল প্রমাণ করে— ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, আর অহংকার রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

জনআলোচনায় ধর্মীয় ব্যাখ্যাও জায়গা করে নিচ্ছে। কোরআনের সেই আয়াত— সম্মান ও অসম্মান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দেন— এই রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন অনেকে। যদিও রাজনীতি মানুষের সিদ্ধান্তেই পরিচালিত হয়, তবু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সীমাহীন ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের পতনের পথ তৈরি করে।

তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রত্যাশার পাহাড়। জনগণের আবেগ যেমন তীব্র, তেমনি দায়িত্বও ভারী। প্রতিশোধের রাজনীতিতে না গিয়ে যদি তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পথে এগোন, তবে এই প্রত্যাবর্তন ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখতে পারে। অন্যথায়, জনতার আবেগ দ্রুতই হতাশায় রূপ নিতে পারে— বাংলাদেশের রাজনীতি সে অভিজ্ঞতা বহুবার দেখেছে।

আজকের বাংলাদেশ একটি বার্তা স্পষ্টভাবে পাচ্ছে— দমন-পীড়ন যত দীর্ঘই হোক, রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন অসম্ভব নয়। তবে সেই প্রত্যাবর্তনের মূল্যায়ন হবে কাজ দিয়ে, ভাষণ দিয়ে নয়। “একেই বলে কর্মফল”— এই কথাটি সামাজিক মাধ্যমে যতই জনপ্রিয় হোক, বাস্তব রাজনীতিতে কর্মফল নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত ও আচরণ।

তারেক স্বদেশে, হাসিনা নির্বাসনে—এই বাস্তবতা কেবল একটি শিরোনাম নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণ, যেখানে নতুন বন্দোবস্তের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো—এই সুযোগ কি গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে, নাকি পুরনো চক্রই নতুন মোড়কে ফিরে আসবে? ইতিহাস অপেক্ষা করছে, আর জনগণ তাকিয়ে আছে তাদের ভাগ্য বদলের আশায়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন