সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা কয়রা উপজেলা এলাকা। একদিকে নদী, অন্যদিকে সুন্দরবন, তার পরেই বঙ্গোপসাগর। সাথে রয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনা, নদীঘেরা জনপদ ও উপকূলীয় মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অপরূপ লিলাভূমি কয়রায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার রয়েছে অপার সম্বাবনা।
নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে চিত্রল হরিণের দল। জঙ্গলের গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে বেড়ায় বানর। নদীর পানিতে কখনো দেখা মেলে কুমিরের, কখনো ভেসে ওঠে শুশুক। সুন্দরী, গরান, কেওড়া, গেওয়া, পশুর ও গোলপাতাসহ ম্যানগ্রোভ বনের নানা প্রজাতির গাছের সমাহারে জায়গাটি যেন সুন্দরবনেরই একটি অংশ।
এমনই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা কয়রা উপজেলার ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের শাকবাড়িয়া নদীর তীরের কেওড়াকাটা। এখানে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণে অর্থ বরাদ্দের পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি।
কয়রায় পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশীর গোলখালী এলাকায় পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। একই অর্থবছরে খুলনা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে দুই কিস্তিতে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয়।
কিন্তু গোলখালীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করতে গেলে বন বিভাগের আপত্তি দেখা দেয়। নির্ধারিত স্থানটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতাভুক্ত হওয়ায় সেখানে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমতিতে স্থান পরিবর্তন করা হয়। সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের কেওড়াকাটায় পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। স্থান পরিবর্তনের পরও কেটে গেছে প্রায় তিন বছর। কিন্তু এখনো শুরু হয়নি নির্মাণ কাজ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর ওপারে সুন্দরবনের ভেতরে রয়েছে কেওড়াকাটা নামের একটি খাল। সেই খালের নাম থেকেই নদীতীরবর্তী এ এলাকার নাম দেওয়া হয়েছে কেওড়াকাটা। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যর এমন সমন্বয় পর্যটকদের জন্য এলাকাটিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
কয়রা গ্রামের বাসিন্দা সাংবাদিক ফরহাদ হোসেন বলেন, তিন বছর নদীর চরের বাগানে কেওড়াকাটা পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের খবর শুনে তাঁরা আনন্দিত হয়েছিলাম। প্রশাসনের লোকজন এসে জায়গা পরিদর্শন করে লাল পতাকাও টানিয়ে গিয়েছিলেন। তবে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
সরদার নাজমুস সয়াদাত বলেন, বাইরে থেকে অনেক মানুষ সেখানে ঘুরতে আসেন। তাঁরা নদীর পাড়ে বসে কিংবা নৌকায় করে সুন্দরবনের দৃশ্য উপভোগ করেন। পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হলে পর্যটকেরা আরও বেশি সময় সেখানে কাটাতে পারবেন। তাঁর মতে, পর্যটনকেন্দ্র হলে স্থানীয় মানুষের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
কয়রার পর্যটন সম্ভাবনা শুধু সুন্দরবনকেন্দ্রিক নয়। উপজেলায় রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এর মধ্যে রয়েছে মসজিদকুঁড়ের ঐতিহাসিক নয় গম্বুজ মসজিদ, রাজা প্রতাপাদিত্যের বাড়ি, খালে খাঁর ৩৮ বিঘা দিঘি এবং আমাদী বুড়ো খাঁ-ফতে খাঁর দিঘি উল্লেখযোগ্য।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে অবস্থিত উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় পর্যটনকেন্দ্রের প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে শুধু কয়রা নয়, আশপাশের এলাকাতেও পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে। সুন্দরবনের পাশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর গ্রামও পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, বন বিভাগের আপত্তির কারণে পর্যটনকেন্দ্রের স্থান নির্ধারণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হওয়ায় সময় লেগেছে। কেওড়াকাটা এলাকায় বন বিভাগের কোনো আপত্তি নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

