খুলনা গেজেট : ক্ষমতার নয়, মানুষের পক্ষে

নিয়াজ মাহমুদ

‘একজন সাংবাদিক যখন কোনো ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করেন, তিনি শুধু নিজের কৌতূহল মেটান না; তিনি সমাজের পক্ষ থেকে জবাবদিহি দাবি করেন। আবার কোনো সাধারণ মানুষের বঞ্চনার কথা তুলে ধরলে তিনি তার কণ্ঠকে বৃহত্তর সমাজের সামনে পৌঁছে দেন। এই দুই দায়িত্বের মাঝখানে সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পছন্দ, রাজনৈতিক বিশ্বাস কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রভাব যত কম থাকবে, সাংবাদিকতা তত বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে।’

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় আস্থার সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক মেরূকরণ, পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি, করপোরেট স্বার্থ এবং তথাকথিত নিরপেক্ষতার আড়ালে সত্যকে আড়াল করার প্রবণতা, সব মিলিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা আজও বড় প্রশ্নের মুখে। এমন বাস্তবতায় কিছু সংবাদমাধ্যম তাদের অবস্থান, সাহস ও পেশাগত নৈতিকতার কারণে আলাদা হয়ে ওঠে। খুলনা থেকে প্রকাশিত ‘খুলনা গেজেট’ তেমনই একটি নাম।

একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবে যাত্রা শুরু করে পাঁচ বছরের পথ পেরিয়ে প্রিন্ট সংস্করণে প্রবেশ এবং সেখানেও এক বছর অতিক্রম করা, এটি নিছক একটি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব পরিচয় নির্মাণের গল্প। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঢাকার বাইরে থেকেও যে জনস্বার্থকেন্দ্রিক, সাহসী ও প্রভাবশালী সাংবাদিকতা করা সম্ভব খুলনা গেজেট সেই সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।

একসময় সংবাদমাধ্যমের শক্তি বলতে মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বোঝানো হতো। ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিস্তারে সেই বাস্তবতা বদলেছে। এখন পাঠকের কাছে পৌঁছাতে রাজধানীতে বসে থাকা অপরিহার্য নয়; জরুরি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা, পেশাদারিত্ব এবং সংবাদে মানুষের আস্থা। খুলনা গেজেট সেই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে খুলনার মাটি থেকে বৃহত্তর পরিসরে নিজের পরিচয় তৈরি করেছে।

আমার কাছে খুলনা শুধু একটি শহর নয়, ভালোবাসার একটি নাম। আমার সাংবাদিকতা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কেটেছে এই শহরে। মানবজমিন-এর হয়ে যখন খুলনায় সাংবাদিকতা করেছি, তখন শহরটির সঙ্গে তৈরি হয়েছিল গভীর এক সম্পর্ক।

সাংবাদিক হিসেবে কোনো একটি শহরের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলে সেই শহরের মানুষ, তাদের আনন্দ-বেদনা, প্রত্যাশা, সংকট ও সংগ্রামও পেশাগত দায়বদ্ধতার অংশ হয়ে যায়। সেই সূত্রেই খুলনা গেজেটের সঙ্গে আমারও একটি আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মাঝে মাঝে এই সংবাদমাধ্যমে লিখেছি, আমার নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এজন্য খুলনা গেজেট কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে একজন সাংবাদিক হিসেবে খুলনা গেজেটকে দেখার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

খুলনার সাংবাদিকতা সহজ নয়। একটি অঞ্চলের সংবাদমাধ্যমকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়িক ও নানা ধরনের প্রভাব মোকাবিলা করতে হয়। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হলে চাপ আসতে পারে। ব্যক্তিগত সম্পর্কও কখনো কখনো পেশাগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এসবের মধ্যেও সাংবাদিকতার মূল কাজটি ধরে রাখা এটাই আসল পরীক্ষা।

খুলনা গেজেটের পথচলায় এই পরীক্ষার নানা দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাজনৈতিক আন্দোলন, ক্ষমতার পালাবদল, সরকারের বিতর্কিত নীতি কিংবা ক্ষমতাবানদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা যে সাহস দেখিয়েছে, সেটি প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর সময়ে প্রশ্ন তুলতে পারা এবং অস্বস্তিকর বিষয় সামনে আনার মানসিকতা একটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না।

একটি সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত পরীক্ষা তখনই হয়, যখন ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। যে দল আজ বিরোধী, কাল সে ক্ষমতায় আসতে পারে। যে ব্যক্তি আজ ক্ষমতাবান, কাল তিনি ক্ষমতার বাইরে থাকতে পারেন। কিন্তু সাংবাদিকতার নীতি বদলে গেলে চলবে না।

বিরোধী দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কলম শক্ত থাকবে, ক্ষমতাসীনদের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও সেই কলম একইভাবে শক্ত থাকতে হবে। নিজের পছন্দের রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের ভুলও সংবাদে আসতে হবে। ‘আমাদের লোক’ আর ‘ওদের লোক’ এই বিভাজন দিয়ে সাংবাদিকতার নৈতিকতা নির্ধারণ করা যায় না।

সত্যের কোনো দল নেই। এই জায়গাতেই খুলনা গেজেটের সামনে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সুযোগ। প্রিন্ট সংস্করণে যাত্রা শুরুর এক বছর পেরিয়ে গেছে। অনলাইন থেকে প্রিন্টে বিস্তৃতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করা মানে শুধু প্রতিদিন কাগজ ছাপা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও বড় দায়িত্ব, আরও কঠিন সম্পাদনাগত সিদ্ধান্ত এবং পাঠকের কাছে আরও বেশি জবাবদিহিতা।

প্রিন্ট সংস্করণে খুলনা গেজেটের সামনে তাই প্রশ্ন হবে, তারা কতটা ভালো সংবাদ ছাপছে, তার পাশাপাশি কতটা স্বাধীনভাবে সংবাদ ছাপতে পারছে। কতটা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করছে, কতটা তথ্য যাচাই করছে এবং ক্ষমতাবানদের সামনে কতটা নির্ভয়ে প্রশ্ন তুলছে।

জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাও নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই সময়ে সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ক্ষমতা থেকে পেশাগত দূরত্ব বজায় রাখা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সাংবাদিকতার অবস্থান পরিবর্তিত হলে পাঠকের আস্থা নষ্ট হয়।

সংবাদমাধ্যমের কাজ সরকারকে খুশি করা নয়, আবার বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করাও নয়। কাজ হলো, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, তথ্য যাচাই করা এবং জনস্বার্থের বিষয় সামনে আনা।

সাংবাদিকতা শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক অবস্থান। একজন সাংবাদিক যখন কোনো ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করেন, তিনি শুধু নিজের কৌতূহল মেটান না; তিনি সমাজের পক্ষ থেকে জবাবদিহি দাবি করেন। আবার কোনো সাধারণ মানুষের বঞ্চনার কথা তুলে ধরলে তিনি তার কণ্ঠকে বৃহত্তর সমাজের সামনে পৌঁছে দেন। এই দুই দায়িত্বের মাঝখানে সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পছন্দ, রাজনৈতিক বিশ্বাস কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রভাব যত কম থাকবে, সাংবাদিকতা তত বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে।

তবে ‘মানুষের পক্ষে’ থাকা মানে জনতুষ্টির সাংবাদিকতা নয়। জনগণ যা শুনতে চায়, শুধু তা বলাই সাংবাদিকতার কাজ নয়। প্রয়োজনে জনগণের অস্বস্তিকর সত্যও সামনে আনতে হবে। কোনো খবর জনপ্রিয় হবে কি না, সেটি সাংবাদিকতার প্রধান বিবেচনা হতে পারে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত খবরটি সত্য কি না, জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ কি না এবং যথেষ্ট যাচাইয়ের পর তা প্রকাশ করা হচ্ছে কি না। এ কারণেই একটি সংবাদপত্রের প্রকৃত শক্তি তার ছাপাখানায় নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতায়।

কাগজের একটি সংখ্যা একদিন পুরোনো হয়ে যায়। কিন্তু পাঠকের মনে একটি সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে যে আস্থা তৈরি হয়, সেটিই দীর্ঘস্থায়ী সম্পদ। সেই আস্থা একদিনে তৈরি হয় না; ধারাবাহিক সততা, তথ্যনিষ্ঠতা এবং সাহসী সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। খুলনা গেজেটের সামনে এখন সেই আস্থাকে আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে।

আমি চাই, খুলনা গেজেট বড় হোক, তবে শুধু আকারে নয়, মানে। প্রভাবশালী হোক, তবে ক্ষমতার কাছে নয়, সত্যের পক্ষে। জাতীয়ভাবে পরিচিত হোক, তবে নিজের শিকড় খুলনার মানুষের কাছে আরও গভীরভাবে প্রোথিত রেখে।

ঢাকার বাইরে খুলনাঞ্চলের শক্তিশালী দৈনিক সংবাদপত্র হিসেবে খুলনা গেজেটের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। তারা চাইলে আঞ্চলিক সাংবাদিকতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাইয়ের শক্তিশালী সংস্কৃতি, তরুণ সাংবাদিকদের বিকাশ এবং সর্বোপরি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা অটুট রাখা।

আমার প্রত্যাশা খুব সরল ডান নয়, বাম নয়; সরকার নয়, বিরোধী দলও নয় খুলনা গেজেটের একমাত্র পক্ষ হোক সত্য এবং খুলনার মানুষ।

খুলনার মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বার্থের প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমটির কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হোক। একজন কৃষকের ন্যায্য দামের প্রশ্ন, একজন শ্রমিকের অধিকার, একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, একজন রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার কিংবা একজন সাধারণ নাগরিকের প্রশাসনিক হয়রানি, এসব প্রশ্নে সাংবাদিকতার শক্তি মানুষের পাশে দাঁড়াক। তাহলেই একটি সংবাদপত্র শুধু সংবাদপত্র থাকবে না; হয়ে উঠবে জনজীবনের জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

খুলনা গেজেট ইতিমধ্যে একটি পথ পেরিয়েছে। সামনে আরও দীর্ঘ পথ। সেই পথে সাফল্যের সঙ্গে যেমন আসবে নতুন পাঠক, তেমনি আসবে নতুন চাপ, নতুন প্রলোভন এবং নতুন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত নিজেদের নৈতিক অবস্থান। কারণ সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মালিকানা নয়, তার অবস্থান।

আর সেই অবস্থান যদি হয় সত্যের পাশে, মানুষের পাশে, তাহলে খুলনার মাটি থেকে উঠে আসা একটি সংবাদপত্রও জাতীয় সাংবাদিকতার বিবেকের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

শুভকামনা খুলনা গেজেট। আগামী দিনের যাত্রা হোক আরও শক্তিশালী, আরও প্রভাবশালী। তবে সেই প্রভাব যেন ক্ষমতার করিডরে নয়, মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। সাহস যেন কখনো পক্ষপাত না হয়, নিরপেক্ষতা যেন কখনো সত্যকে আড়াল না করে এবং সাংবাদিকতা যেন কখনো মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে না যায়।

সাহস, সততা ও পেশাগত নৈতিকতার ভিত্তিতে খুলনা গেজেটের এই অভিযাত্রা পৌঁছে যাক শতবর্ষের আলোয়।

বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক জর্জ অরওয়েলের বহুল উদ্ধৃত কথাটি তাই আজও প্রাসঙ্গিক-“Journalism is printing what someone else does not want printed; everything else is public relations.”

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন