“বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে খুলনা সব দিক থেকে অবহেলিত। নতুন সরকার আমলে এ বিভাগীয় শহর থেকে একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীও নেই। নেই জাতীয় মানের পত্র-পত্রিকা। মাত্র ৪ পৃষ্ঠার যে সব পত্রিকা খুলনা থেকে প্রকাশিত হয় তা পাঠকদের সংবাদ জানার ক্ষুধা মেটাতে পারে না। তবে অনেক অনলাইন পত্রিকা রয়েছে। সেগুলির মানও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছতে পারেনি।”
গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, শিক্ষিত এবং অধিকার-সচেতন করতেও প্রয়োজন স্বাধীন গণমাধ্যম। বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলনে গণমাধ্যম সব সময় জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কিছু পত্রিকা এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তবে স্বাধীনতার পর আওয়ামী সরকার আমলে বাকশালের নামে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করে কয়েকটি পত্রিকা রেখে বাকি পত্রিকাগুলো বন্ধ করে দেয়ার ভুল উদ্যোগ নেয়া হয়। পরবর্তীতে সে উদ্যোগ সফল না হলেও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর যুগপৎ বেসামরিক ও সামরিক শাসনামলে সরকারি হস্তক্ষেপ লক্ষিত হয়েছে। আমরা চাই গণমাধ্যমের ওপর যেন সরকারি হস্তক্ষেপ করা না হয়। আবার পত্রিকাগুলোও যেন স্বাধীনতা পেয়ে সততা ও দায়বদ্ধতার জায়গাটি ভুলে গিয়ে গণবিরোধী ভূমিকা পালন না করে। গণতন্ত্র, সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নিতে প্রকাশিত গণমাধ্যম যেন প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে খুলনা সব দিক থেকে অবহেলিত বলে প্রতীয়মান হয়। এখানে না আছে টেলিভিশন সেন্টার, না আছে বিমান বন্দর। নতুন সরকার আমলে এ বিভাগীয় শহর থেকে একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীও নেই। নেই জাতীয় মানের পত্র-পত্রিকা। মাত্র ৪ পৃষ্ঠার যে সব পত্রিকা খুলনা থেকে প্রকাশিত হয় তা পাঠকদের সংবাদ জানার ক্ষুধা মেটাতে পারে না। তবে অনেক অনলাইন পত্রিকা রয়েছে। সেগুলির মানও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছতে পারেনি। অথচ খুলনায় অনেক শিল্পপতি এবং সফল ব্যবসায়ী রয়েছেন। রয়েছেন সক্রিয় সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবী। কিন্তু বিভাগীয় শহর থেকে একটি ভালো মানসম্পন্ন দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের দিকে তাদের মনোযোগ আছে বলে মনে হয় না। পত্রিকা প্রকাশের দিকে তাঁদের মনোযোগ নেই। খুলনার অধিকাংশ পত্রিকায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় না। সৃষ্টিশীল মৌলিক প্রবন্ধও ছাপা হয় কদাচিৎ।
কেবল পত্রিকা প্রকাশনায় যে খুলনা পিছিয়ে আছে এমন না। এ বিভাগীয় শহরে সৃষ্টিশীল প্রকাশনা জগৎও দুর্বল। বিভাগীয় শহর হলেও এখানে বই প্রকাশ করে এমন পাঁচ-দশটি ভালো প্রকাশকের নাম বলা যায় না। ফলে খুলনার লেখক সমাজকে বই লিখলে হয় নিজের টাকা দিয়ে খুলনার কোনো প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপতে হয়। আর তা না হলে তাদেরকে রাজধানীতে গিয়ে প্রকাশক খুঁজতে হয়। আবার যে সব প্রিন্টিং প্রেস থেকে খুলনার লেখকদের অনেকে বই প্রকাশ করেন, ওই প্রেসগুলোর অনেকগুলোরই পেশাদার প্রুফ রিডার নেই। নেই মানসম্পন্ন সৃষ্টিশীল প্রচ্ছদশিল্পী। ফলে লেখকরা নিজের চেষ্টায় কষ্ট করে নিজের টাকায় অনেকে বই ছাপলেও তার মান নান্দনিক হয় না। এত কষ্ট করে প্রতিকূল পরিবেশে কয়জন লেখক ভালো মানের লেখালেখি করতে পারেন? পত্রিকার জগতেও একই রকম দুর্লতা রয়েছে। এর মধ্যে যে কয়েকটি পত্রিকা বের হয় তার মধ্যে খুলনা গেজেট পাঠকদের কিছুটা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনলাইনের পাঠক বৃদ্ধি পাওয়ায় এমনিতেই প্রকাশিত পত্রিকার ক্রেতা ও পাঠকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। তারপরে যদি মানসম্পন্ন পত্রিকা বের না হয়, তাহলে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো কীভাবে পাঠকদেরকে আকর্ষণ করবে?
পত্রিকায় পাতায় যদি লেখকদেরকে বেশি করে সম্পাদক মহোদয়গণ জায়গা দিতে পারতেন, তাহলে নতুন লেখক সৃষ্টি হতো। উদীয়মান লেখকগণ লিখতে উদ্বুদ্ধ হতেন। খুলনা থেকে প্রকাশিত অনেক পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় কলাম লেখার জায়গা দেওয়া হয় না। আবার যে পত্রিকাগুলো কিছু জায়গা কদাচিৎ বরাদ্দ করেন, সেখানেও দেখা যায় পাঁচশ’ বা ছয়শ’ শব্দের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে লেখকরা লেখালেখিতে উৎসাহিত হচ্ছেন না। লেখকদেরকে ঢাকার পত্রিকার মতো সম্মানী দেওয়া হয় না। এর ফলে সৃষ্টিশীল লেখালেখির জগৎ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে। লেখকদেরকে উৎসাহ না দিলে তারা কীভাবে ভালো লেখা লিখবেন? তবে এর মধ্যেও সংখ্যায় কম হলেও কিছু লেখক নিজের উদ্যোগে লেখালেখি করে চলেছেন। তাদের এমন চর্চার প্রশংসা করা উচিত।
খুলনা গেজেট প্রথমে অনলাইন পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। পরবর্তীতে পত্রিকাটি পাঠকদের অনুরোধে প্রিন্ট ভার্সনে যায়। আমার পর্যবেক্ষণে খুলনা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর মধ্যে খুলনা গেজেট প্রথম সারিতে অবস্থান কোরে নিয়েছে। এর বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনা পাঠকদের প্রশংসা পেয়েছে। কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব এ পত্রিকায় কলাম লিখেছেন এবং লিখছেন। আমি নিজেও এ পত্রিকায় কয়েকবার লেখা জমা দিয়েছি এবং সে লেখাগুলো প্রকাশিত ও বহুল পঠিত হয়েছে। খুলনা গেজেট পত্রিকায় আমি সাক্ষাৎকারও দিয়েছি। পত্রিকাটির ক্রমাগতভাবে পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ২৭ আগস্ট পালিতো হতে যাচ্ছে দৈনিক খুলনা গেজেটের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আমি খুলনা গেজেট-এর প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক, লেখক, সংবাদকর্মীসহ এ পত্রিকা পরিবারের সকল সংবাদকর্মীকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। কারণ, তাঁদের নিরন্তর পরিশ্রমেই পত্রিকাটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে উন্নতি করছে। আমার অনুরোধ থাকবে, পত্রিকাটি যেন আগামীতে তাদের পৃষ্ঠাসংখ্যা বৃদ্ধি করেন। তারা যেন তাদের পরিশ্রম অব্যাহত রেখে খুলনা গেজেটকে একটি জাতীয় মানের প্রথম শ্রেণির পত্রিকায় রূপান্তরিত করতে পারেন। আমি পত্রিকাটির সার্বিক সাফল্য কামনা করি।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
খুলনা গেজেট/এএজে

