খুলনা গেজেটের প্রতিষ্ঠা এবং কিছু কথা

মিনু মমতাজ

“খুলনা গেজেট মূলত উদ্যোগী, সৎ, বস্তুনিষ্ঠ, উদার মনোভাবাপন্ন, দেশপ্রেমিক, উদ্দীপ্ত ও সর্বোপরি পরিশ্রমী এক দল তরুণের মহান প্রচেষ্টা। সকল প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে, তীক্ষ্ম ধীশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এবং সজাগ নিয়ন্ত্রণে পত্রিকাটি এখন অনেকেরই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের তীব্র প্রচেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম ও আপোশহীন লড়াইয়ের পদযাত্রায় আমিও তাদের সাথে একত্রিত হতে পেরেছি, সেজন্য পরম করুনাময় আল্লাহপাকের কাছে শতকোটি শুকরিয়া জানাই।”

২৭ আগস্ট ২০২৫ দৈনিক খুলনা গেজেট পাঠকের ঘরে ঘরে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও ২০২০ সালের ১৩ জুলাই অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসাবে তার কার্যক্রম শুরু হয়। এটি অত্যন্ত আশার এবং উদ্দীপনার বিষয়। যদিও আমি গেজেটের থেকেও বেশী ঘনিষ্ঠ গাজী আলাউদ্দিন নামে এক সত্য সৈনিক, বস্তুনিষ্ঠ, জীবন ঘনিষ্ঠ ছোট ভ্রাতৃপ্রতিম মানুষটির সাথে। বহু আগে আলাউদ্দিন যখন দৈনিক প্রবর্তনে বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ করতো তখন আমি টুকটাক লেখা দিতাম। বিশেষ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে লিখতে বরাবর আমার ভালো লাগে। উপরন্তু সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় তখন আমি লিখতাম। অবশ্য সেগুলো বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় ছাপা হতো। দৈনিক কোনো পত্রিকায় সাহিত্য বিষয়ক লেখার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। সেভাবে সাহিত্য পাতা খুলনায় তখন বেরুতোও না। দৈনিক জন্মভূমিতে কিছু কবি সাহিত্যিক লিখতেন। দৈনিক পূর্বাঞ্চলে তেমন একটা সুযোগ ছিল না। সিন্দাইনী ভাই মাঝে মধ্যে লেখা চাইতেন। এই ছিল খুলনার কবি সাহিত্যিকদের লেখা প্রকাশের বাতায়ন।

উপরন্তু সবচাইতে বেশী ভুগতে হতো সংগঠনের অনুষ্ঠানের নিউজ প্রকাশনা নিয়ে। টাকা-পয়সা ছাড়া নিউজ ছাপানো যেত না। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এমনিতে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পায় না। কবি-সাহিত্যিক- সংগঠকদের নিজেদের পকেটের অনুদানের উপরই অনুষ্ঠানগুলো হতো। সেক্ষেত্রে অনুষ্ঠানগুলোর নিউজ অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ছিল। ফলে সংগঠনগুলো সাংবাদিকদের পিছনে পিছনে ঘুরে একটা অলক্ষ্য ভাতা ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই নিউজগুলো পত্রিকার পাতায় দৃশ্যমান করাতো। এতে সংগঠনগুলোকে কিছুটা হলেও আর্থিক টানাপড়েনে পড়তে হতো। মনে পড়ে মরহুম সাংবাদিক আইফারের কথা, রূপসা নন্দিনীদের পক্ষকালব্যাপী একুশের বইমেলার নিউজগুলো নিজ দায়িত্বে দৈনিক পূর্বাঞ্চলে অরুণদাদা, অমীয় পাল সহ অন্যন্যদের সহযোগিতায় করে দিত। সেই সব সোনালি দিনগুলো আশ্চর্যভাবে আজও অনুপ্রাণিত করে। খুলনার সংগঠক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগীতশিল্পীরা মিলেমিশে দলমত নির্বিশেষে অনির্বচনীয় আনন্দ ভুবনে মেতে রইতেন। সে একসময় ছিল। এখন সে রামও নেই, অযোধ্যাও নেই। সাংস্কৃতিক আবহ এখন বিচিত্র বহুমুখী কালচারে দ্বিধাবিভক্ত।

তবে তার মধ্যে আশার কথা দৈনিক খুলনা গেজেটের সার্বজনীন মুখপাত্র হয়ে সকল পাঠকের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা। নীতি, আদর্শ, সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দিয়ে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

সারা বাংলাদেশকে খবরের আওতায় এনে বিভাগ, উপজেলা, থানা, ও মহানগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খবর তুলে ধরে সমৃদ্ধ খুলনা গেজেট এখন সর্বত্র জনপ্রিয়। দুর্যোগ, রাজনীতি, সামাজিক অবক্ষয়, বিনোদন, রাজধানীর সংবাদ, খেলাধুলাসহ বহু সংবাদে সমৃদ্ধ গেজেট এখন পাঠকদের মনোরঞ্জনে সদা সচেষ্ট। আমার বাসাতেও দৈনিক খুলনা গেজেট প্রথম থেকেই রাখা হতো। উল্টেপাল্টে দেখতাম। ভাবতাম, একদিন দৈনিক গেজেটে লেখা দেব। ব্যস্ততার কারণে আর দেওয়া হয়নি। তবে আমার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক নিউজগুলো আলাউদ্দিনকে দিলে ও ছাপিয়ে দিত। এটাই গেজেটের বৈশিষ্ট্য। আলাউদ্দিনকে বিগত দিনে এই নিউজ প্রেক্ষিত লেনদেনের বিরুদ্ধে বহুত সচেষ্ট থাকতে দেখেছি, এখনো আছে।

ঘটনা প্রবাহে হঠাৎ করেই ২০২৬ সালে ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ ১লা বৈশাখের বিশেষ সংখ্যায় ‘বৈশাখী বাতায়নে বসেছি সংগোপনে’ শিরোনাম আমার অনেক বড় একটা লেখা ছাপা হয়। এর কিছুদিন পর ২৫ এপ্রিল ২০২৬-এ সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে শনিবারের সাহিত্যপাতা আঠারোবাঁকিতে আমি যোগদান করি।

সেই থেকে খুলনা গেজেটের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করে চলেছি। ভালোই লাগে। সারা জীবন সাহিত্য নিয়ে আমার চলাচল। সেই যখন সত্তর দশকে ফাতিমা হাইস্কুলে ক্লাশ এইট-নাইনে পড়ি তখন কিশোর বাংলা নামে একটি সাহিত্য পত্রিকায় ছদ্মনামে লিখতাম। ছদ্মনামটি এখনো আছে। পরবর্তীতে খুলনা লেখিকা সংঘ, সাহিত্য পরিষদ, সাহিত্য মজলিশ, কবিতালাপ প্রভৃতি সাহিত্য সংগঠনগুলোতে কাজ করতে করতে সাহিত্যের বহু অলিগলিতে জড়িয়ে পড়ি।

পরবর্তীতে রূপসা নন্দিনী, অবিনশ্বর, খুলনা বনলতা প্রভৃতি জাতীয় পত্রিকা ও সংগঠনের সাহিত্য সংগঠক এবং সম্পাদক হিসেবে বহু অভিজ্ঞতা অর্জন করি। যা আমাকে ২০০২ সালে তন্ময় প্রকাশনী নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। যেখান থেকে অদ্যাবধি ৪৬ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এই সমস্ত দুর্লভ অর্জনের মধ্য দিয়েই গেজেটের আঠারোবাঁকিতে দায়িত্ব নেওয়ার জোর পেয়েছি। মনে করি, এটুকু হয়ত আমার পড়ন্ত জীবনের শেষ রোদ্দুরের আত্মতৃপ্তি হবে।

যাই হোক, আমার সঙ্গে আমার ছেলে তনু এবং তনুর বাবা অধ্যাপক আমিন মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ সাহেব যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। সাহিত্য পাতার সজ্জা বিন্যাসে শাওন এবং পরামর্শে আলাউদ্দিন যথেষ্ট তৎপর থাকে। এছাড়াও গেজেটের অন্যান্য সংশ্লিষ্টজনরা আমাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। সবাইকে বর্ষপূর্তির এই শুভ লগ্নে কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাই।

খুলনা গেজেট মূলত উদ্যোগী, সৎ, বস্তুনিষ্ঠ, উদার মনোভাবাপন্ন, দেশপ্রেমিক, উদ্দীপ্ত ও সর্বোপরি পরিশ্রমী একদল তরুণের মহান প্রচেষ্টা। সকল প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে, তীক্ষ্ম ধীশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এবং সজাগ নিয়ন্ত্রণে পত্রিকাটি এখন অনেকেরই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের তীব্র প্রচেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম ও আপোশহীন লড়াইয়ের পদযাত্রায় আমিও তাদের সাথে একত্রিত হতে পেরেছি, সেজন্য পরম করুনাময় আল্লাহপাকের কাছে শতকোটি শুকরিয়া জানাই। আল্লাহ পাক আমাদের সকলের এই প্রচেষ্টা সফলতা দান করুন, আমিন।

লেখক : সাহিত্য সম্পাদক, খুলনা গেজেট।

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন